সরবে কোনো হত্যার ঘটনা ঘটালে কিংবা খারাপ কিছু করলে দেখা যায়, বোঝা যায়। কিন্তু দীর্ঘ দিন ধরে নীরবে কোনো প্রাণঘাতী কাজ করতে থাকলে তা সহজে মানুষ বুঝতে পারে না। যারা জনস্বাস্থ্য নিয়ে প্রকাশ্যে ছিনিমিনি খেলছে, তারা জঙ্গিদের থেকেও কম ভয়ঙ্কর নয়! জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি যেন ঠুনকো বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানহীন পণ্যে বাজার সয়লাব হওয়ার কারণে এমনটি ঘটছে। রমজান মাসে ফলমূল, তরল খাদ্য ও শাকসবজির চাহিদা বেশি থাকে। এর ওপর আবার জ্যৈষ্ঠ মাস। ফলে বাজার ভেজালমুক্ত রাখা অত্যন্ত জরুরি। বাজার, দোকান, সুপার শপ কোথাও ভেজালমুক্ত খাদ্যপণ্য মিলছে না। আগেকার দিনে মানুষকে বলতে শোনা যেত, কোন কোন খাদ্যে ভেজাল। আর এখন বলতে শোনা যায়, কোন কোন খাদ্য ভেজালমুক্ত। মাছ ও দুধে ফরমালিন। প্রায় সব ফলে দেয়া হচ্ছে কার্বাইডসহ নানা বিষাক্ত কেমিক্যাল। বিস্কুট, সেমাই, পাউরুটি, নুডলস ইত্যাদিতে মেশানো হচ্ছে কাপড়ের রঙ। শাকসবজিতে কীটনাশক। জিলাপি-চানাচুরে মবিল। মুড়িতে ব্যবহার হচ্ছে ইউরিয়া। চিনি, আটা ও ময়দায় ব্যবহার করা হচ্ছে বিষাক্ত চক পাউডার। শিশুখাদ্যের দুধও ভেজাল থেকে রেহাই পাচ্ছে না। অতিরিক্ত রেডিয়েশনযুক্ত দুধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই আমদানি করা হচ্ছে দেদার। দুধে ফরমালিন, সোডা, বরিক পাউডার ও মেলামিন মেশানো হচ্ছে। প্যাকেটজাত তরল দুধও নিরাপদ নয়। সয়াবিন তেলে অতিরিক্ত অ্যাসিটিক এসিড, পামঅয়েল ও ন্যাপথালিন মেশানো হচ্ছে। ছানার অতিরিক্ত পানির সাথে ভাতের মাড়, অ্যারারুট আর কেমিক্যাল মিলিয়ে তৈরিকৃত সাদা তরল পদার্থকে বানিয়ে দেয়া হচ্ছে ‘গাভীর দুধ’। কার্বাইড দিয়ে পাকানো হচ্ছে ফলমূল এবং সংরক্ষণে ব্যবহার করা হচ্ছে ফরমালিন। নোংরা পানি ব্যবহার করে ময়লা-আবর্জনাপূর্ণ স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে তৈরি করা হচ্ছে আইসক্রিম। মধুতেও ভেজাল দেয়া হচ্ছে। এখন খাঁটি মধু পাওয়া দুঃসাধ্য। মোড়কজাত ফলের জুসে বিষাক্ত রঙ ও কেমিক্যাল মেশানো হচ্ছে।
কোনো কিছুই ভেজালের ছোবল থেকে বাদ যাচ্ছে না। জীবন রক্ষাকারী পানিও আজ নিরাপদ নয়। শহর এলাকায় যত্রতত্র নকল কারখানা বানিয়ে পুকুর-ডোবা এবং ওয়াসার পানি কোনো রকমে ছেঁকে বাজারজাত করা হচ্ছে। সে পানিতে থাকছে আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম-লেড-ইকোলাই। এ ছাড়া এগুলো বিশুদ্ধ নামীদামি কোম্পানির সিলমোহর দিয়ে দেদার চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। দেশী-বিদেশী কোনো ফল কেনার আগে ক্রেতাকে কয়েকবার ভাবতে হচ্ছে। সব ফলেই মেশানো হচ্ছে বিষাক্ত কেমিক্যাল। অপরিপক্ব ফল পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইড এবং তা উজ্জ্বল করতে ক্ষারজাতীয় টেক্সটাইল রঙ ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি ইট, সিমেন্ট, রড থেকে শুরু করে ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিকসসামগ্রী যে মানসম্মত পাওয়া যাবে; তারও কোনো গ্যারান্টি নেই। শ্যাম্পু, ফেসওয়াশ, বডি লোশন, বডি স্প্রে, পারফিউম, পাউডার, ক্রিমসহ নানা প্রসাধনসামগ্রীতেও আজ ভেজালের জয়জয়কার। বেশির ভাগ পণ্যে এখন নিরাপত্তা আবরণ না থাকায় গ্রাহকেরা প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন। গবেষণায় ঢাকা শহরের বেশির ভাগ জারের পানিতে মলের জীবাণু পাওয়া গেছে। মেয়াদোত্তীর্ণ কাঁচামালে সুতা রাঙানোর বিষাক্ত রঙ, ভেজাল পাম তেল, সেন্ট, পচা ডিম ইত্যাদি মিশিয়ে ভিন্ন নামে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট থেকে প্রকাশিত ‘খাদ্যদ্রব্যে রাসায়নিক দূষণ ও জীবাণু সংক্রমণ বিষয়ক সমীক্ষা’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছেÑ ঢাকার প্রায় ৯০ শতাংশ পথখাবারেই ই-কোলাই, সারমোনেলা ইস্ট মোল্ডের মতো মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর জীবাণু পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে বেশির ভাগ পথখাবার স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে তৈরি হয় না। এগুলো স্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর। বাজারে চর্ব, চুষ্য, লেহ এমন পণ্য পাওয়া কঠিন; যেখানে ভেজাল ও বিষাক্ত উপাদান নেই। ভেজাল ও বিষে ভরা খাদ্যদ্রব্য খাওয়ার কারণে কিডনি ও লিভারে সরাসরি ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। বর্তমান সময়ে এমন পরিবার খুব কমই পাওয়া যাবে, যে পরিবারে কিডনি, লিভার কিংবা পেটের সমস্যাজনিত কোনো রোগী নেই। ভেজাল খাদ্য ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি করে। ভেজাল খাওয়ার কারণে শিশুদের হার্টের সমস্যা হচ্ছে এবং দৃষ্টিশক্তি কমে যাচ্ছে। গর্ভজাত মায়ের শিশুও বিকলাঙ্গ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। সারা দেশে মানহীন, অবৈধ, নকল খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যে সয়লাব হলেও বিএসটিআইর কোনো মাথাব্যথা নেই। অনেকে আবার বিএসটিআইর লোগো ছাপিয়ে নকল-মানহীন পণ্যের সাথে লাগিয়ে বাজারজাত করছে।
ভেজাল পণ্যে আক্রান্ত হয়ে ওষুধ খেলে সেখানেও ভেজাল। দেশজুড়ে অবাধে বিক্রি হচ্ছে নিম্নমানের নকল ও ভেজাল ওষুধ। এটা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রস্তুতকারক, প্রক্রিয়াজাতকারক, সরবরাহকারী সবাই এই ভেজাল প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত। ক্ষেত থেকে শাকসবজি তুলে অপরিষ্কার নালা-ডোবায় ধোয়া হচ্ছে। ফলে পানিতে থাকা জীবাণু শাকসবজিতেও ছড়িয়ে পড়ছে। পোলট্রিসহ পশু মোটাজাতকরণে অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়াও ব্যবহার করা হচ্ছে স্টেরয়েড-জাতীয় হরমোন। গোশত ও দুধের মাধ্যমে তা কোনো-না-কোনোভাবে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে।
ভেজালের এই দৌরাত্ম্য কি চলতেই থাকবে? শুধু মাঝে মধ্যে ভেজালবিরোধী অভিযান চালালে হবে না, নিয়মিত দেশব্যাপী অভিযান পরিচালনা করতে হবে। নকলবাজ কারখানা ও ভেজাল পণ্য বাজারজাতকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। খাদ্যনিরাপত্তা আইনের যথাযথ প্রয়োগ চাইবে। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, কিন্তু মানুষের দেহে নানা জটিল রোগ বাসা বাঁধছে। ভেজাল বন্ধে সরকারের সদিচ্ছা ও সচেতনতাই যথেষ্ট। প্রতি বছর প্রয়োজনের অতিরিক্ত তিন-চার গুণ ফরমালিন আমদানি করা হচ্ছে। এসব অতিরিক্ত ফরমালিন কোথায় যায়? এ দেশে ভেজাল কিসে নেই? দুঃখের সাথে বলতে হয়, পিএইচডির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশে ভেজাল দেখা যায়। এ দেশে শিক্ষা সনদ জাল করেও অনেকে অবাধে চাকরি করে যাচ্ছেন। এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তৎপর হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। ভুয়া ডাক্তার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে প্রতারণার ব্যবসায় চলছে ব্যাপক। সব ধরনের ভেজালের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করতে হবে। জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি এবং সবার সুন্দর জীবনের স্বার্থে ভেজালবিরোধী অভিযানে কর্তৃপক্ষকে আরো বেশি উদ্যোগী হতে হবে।হ
লেখক : শিক্ষার্থী, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
sadonsarker2005@gmail.com
সরবে কোনো হত্যার ঘটনা ঘটালে কিংবা খারাপ কিছু করলে দেখা যায়, বোঝা যায়। কিন্তু দীর্ঘ দিন ধরে নীরবে কোনো প্রাণঘাতী কাজ করতে থাকলে তা সহজে...
