ইয়াবার আগ্রাসন রোধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে, সমগ্র বাংলাদেশ থেকে উচ্ছেদ করার চেয়ে বোধহয় বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের ৭১৬ কিলোমিটার সীমান্তে কড়া নজর রাখা এর চেয়ে অনেক সহজ। তা ছাড়া দেশের অন্তত ১৬ কোটি মানুষ যাকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে মনে করে, তাকে অভিযানের বাইরে রেখে দমনের নামে ইতোমধ্যে যে শতাধিক মানুষকে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়েছে, এ শ্রেণীর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা চুনোপুঁটি ভোক্তাদের দমন করে দেশ থেকে ইয়াবার ঘাঁটি নির্মূল করা অলীক স্বপ্ন বটে। মূল যদি থেকে যায়, তবে তা সুযোগ মতো আবার শাখা-প্রশাখা বিস্তার করবেই। কাজেই কোনো সমস্যার সমাধান যদি করতেই হয়, কিংবা এর সদিচ্ছা থাকে তবে তা সমস্যার মূলে বিনাশ করে তবেই সমাধান করা সম্ভব।
অনেক বড় বড় অপরাধের জন্ম দিয়েছে মাদক। সম্প্রতি গৃহীত এর বিরুদ্ধে সরকারের উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু যে উপায়ে মাদক নির্মূল করার পথে সরকার হাঁটছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। দ্রুত ট্রাইব্যুনাল গঠন করে মাদকের সাথে সংশ্লিষ্টদের দীর্ঘমেয়াদে শাস্তির বিধান করলে মাদকের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ সুগম হতো। প্রশ্ন জাগছে, মাদকের সমস্যা দেশে নতুন নয়। বহু বছরের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর অন্যতম এটি। সময়ের বিবর্তনে গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা ও সিসা এসবের আগমন ঘটেছে। হঠাৎ করে মাদকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের যুদ্ধংদেহী চেহারায় অবতীর্ণ হওয়ার কারণ কী? পরিস্থিতি কি একেবারেই নাগালের বাইরে?
কোনো গণমাধ্যম কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন ও প্রমাণ করতে পারেনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ফেনসিডিল, ইয়াবা কিংবা অন্য কোনো মাদকের উৎপাদন হচ্ছে। বরং সবাই একমত, ফেনসিডিল ভারত থেকে এবং ইয়াবা মিয়ানমার থেকে স্থল ও নৌপথে বন্যার পানির মতো বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে। এতদিন ফেনসিডিল কিংবা ইয়াবা শুধু নগরের পরিমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে এসব মাদকের ব্যাপক আগ্রাসন গ্রামেগঞ্জে এমনভাবে বিস্তৃত হয়েছে, যাতে গোটা সমাজব্যবস্থার শৃঙ্খলা কাঠামো ভেঙে পড়ার উপক্রম।
সমগ্র ভারতে যে ফেনসিডিল নিষিদ্ধ, কাশির ওষুধের নামে তা বাংলাদেশে আসছে। কিন্তু নেশার উপকরণ হিসেবে এটা ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, বাংলাদেশ সীমানার কিছু দূরেই ভারতীয় অংশে শত শত ফেনসিডিল তৈরির কারখানা চালু রয়েছে। বাংলাদেশকে ধ্বংস করার চক্রান্ত হিসেবে সীমান্ত পথে প্রথমে এসেছে মাদক। কিন্তু শুধু মাদক দিয়ে বাংলাদেশের তরুণ-যুব সমাজকে ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। কেননা, বাংলাদেশের পারিবারিক কাঠামো ও বন্ধন মজবুত রয়েছে অনেকটা। হয় মায়ের আঁচলে, নয়তো বোনের স্নেহে কিংবা স্ত্রীর ভালোবাসার চাঁদরে জড়িয়ে থাকা তরুণ-যুবাদের কেউ কেউ অসৎ সঙ্গ কিংবা ক্ষণিকের ভ্রান্ত মোহে মাদকের পথে বা বাড়ায় বটে; কিন্তু পারিবারিক ভালোবাসা তাদের সে ধ্বংসের পথ থেকে ফিরিয়ে আনে। যখন মনে হলো শুধু মাদক দিয়ে তরুণ-যুবাদের মেরুদণ্ডহীন করা যাবে না, তখন অন্য রকম মাদকতায়পূর্ণ সিরিয়াল নামক একজাতীয় উদ্ভট নাটকের প্রবেশ করানো হলো। ভারতীয় সিরিয়ালের প্রকোপ থেকে সমাজের নিম্নস্তর থেকে সর্বোচ্চ স্তরে পর্যন্ত অনেকে রক্ষা পায়নি। পারিবারিক অটুট বন্ধনের ভাঙন প্রবণতা প্রমাণ করেছে, মাদক দিয়ে ভারত যা পারেনি, সিরিয়াল দিয়ে তার চেয়ে অনেক বেশি পেরেছে। সামাজিকভাবে নারী-পুরুষের মধ্যে বন্ধনের যে গভীরতা ছিল, তাতে মাদক এবং সিরিয়ালের প্রভাবে দূরত্ব এসেছে। ভালোবাসার বন্ধনে লেগেছে ভাটার টান। কাজেই পরিবারের কোনো পুরুষ মাদকের পথে ঝুঁঁকলে তাকে ফেরাতে নারীর সংস্পর্শ আর কাজ করছে না। কেননা, দুই শ্রেণীই যে মাদকতার দুই মেরুতে অবস্থান করছে। কে কাকে শোধরায়? এতে পারিবারিক ছন্দপতনের ভয়াবহতা বৃদ্ধি পেয়েছে, সামাজিক শৃঙ্খলা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
রাষ্ট্র যদি এক হাতে বারের লাইসেন্স দেয় এবং অন্য হাতে ইয়াবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে নামে, কোনোকালেই বাংলাদেশ মাদকমুক্ত হবে না। যা নেশা ধরায় তার সবটাকেই মাদক হিসেবে গণ্য করে আইনের মাধ্যমে চিরতরে প্রতিরোধ করতে হবে। হ
raju69alive@gmail.com