আমরা জানি, প্রত্যেকটা দেশে একে কটা আর্থিক বছর নির্ধারণ করা থাকে। এই আর্থিক বছরে সরকার তার দেশের ব্যয় ও আয়ের হিসাব করে থাকে। সরকার দেশের উন্নয়নের জন্য ব্যয়টাকে মুখ্য হিসেবে ধরে। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের আর্থিক বছর শুরু হয় ১ অক্টোবর থেকে, ভারতের আর্থিক বছর ১ এপ্রিল থেকে। বাংলাদেশের আর্থিক বছর শুরু হয় জুলাই মাসে আর শেষ হয় জুনে। অর্থবছর শুরুর পর থেকে বিভিন্ন দফতরে টাকা ছাড় আর বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করতে বছরের ৯ মাস কাটে ঢিলেঢালাভাবে। বাকি তিন মাস চলে কর্মযজ্ঞ। আর সেই তিন মাস হলো এপ্রিল, মে জুন। আমাদের জানা আছে, এপ্রিলের ১৪ তারিখ থেকে বাংলা নববর্ষ শুরু হয়। আর বৈশাখ মানেই ঝড়। আবহাওয়া পরিবর্তনের সাথে সাথে তালমিলিয়ে এ বছর পয়লা বৈশাখ থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে আর সেটা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা শহরে বৃষ্টি হলেই ঢাকা শহর আর ঢাকা শহর থাকে না এটি ‘আমাদের ছোট নদী’তে পরিণত হয়। একটু বৃষ্টি হলেই ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা বেড়ে যায়, আর এর সাথে যুক্ত হয়েছে উন্নয়নের নামে রাস্তাঘাট খোঁড়াখুঁড়ি ও জনসাধারণের ভোগান্তি। সেই সাথে আমাদের ঠিকাদারদের হীন মানসিকতা। আমাদের ঠিকাদারেরা বর্ষায় কাজ করতে ভালোবাসে। তবে কেন এই তিন মাসে (এপ্রিল, মে, জুন) কাজ করে তা নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন থাকতে পারে।
বাংলাদেশে প্রথম পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) খাতে উড়াল সেতু নির্মিত হয় গুলিস্তান-সায়েদাবাদ উড়াল সেতু। প্রকৌশল বিভাগের অদতার জন্য বৃষ্টি হলে সড়কপথের মতো উড়াল সেতুতে পানি জমে। আমার মনে হয়, এটা বিশ্বের প্রথম যেখানে উড়াল সেতুতে পানি জমে।
সরকারের একশ্রেণীর লোক যাদের ন্যূনতম নৈতিকতাবোধ নেই তারা নিজেদের পকেট মোটা করার জন্যই মূলত অর্থবছরের শেষ তিন মাস কর্মযজ্ঞ চালায় পুরোদমে। শুষ্ক মওসুমে কাজ করার কোনো খোঁজ ছিল না তাদের। ঢাকা শহরে এক রাস্তা তিন-চার বার খোঁড়াখুঁড়ি হয়। মাসের প্রথমে আসে ওয়াসা, তার কিছু দিন পর বিটিআরসি, আর তারও পরে গ্যাস ট্রান্সমিশনের কাজ। আর মাঝে মাঝে ভালো রাস্তা কিছুটা সংস্কার করতে সড়ক বিভাগের আগমন ঘটে। গোটা ঢাকা শহরে ওয়াসা পাইপলাইনের কাজ শুরু করেছে এপ্রিল মাসে। অর্থবছরের শেষ ক’দিনে যেভাবে পারে অব্যয়িত টাকা খরচ করতে চায়। সরকার ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন নিয়ে মহাব্যস্ত। রাজধানীর ফার্মগেট থেকে শুরু করে মতিঝিল,বাসাবো এলাকাজুড়ে সম্পূর্ণ ভালো রাস্তায় নতুনভাবে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ চলছে। আমার মতে, সরকার যদি এ রাস্তাগুলোতে খরচ না করে গ্রামাঞ্চলের রাস্তাঘাটগুলোর সংস্কার করত তাহলে জনসাধারণ এটাতে উপকৃত পেত। ঢাকা সিটি করপোরেশনের বরাদ্দ করা টাকা খরচের জন্যই কি এক কাজ দু’বার করা! এ যেন এক মুরগি পুনরায় জবাই করা!
ওয়াসা, গ্যাস ট্রান্সমিশন ও বিটিসিএলের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য সরকারের পলিসিমেকারদের আরো দায়িত্ববান ও নৈতিক হতে হবে। প্রতিটি কাজকে নিজের ভেবে করতে হবে। প্রয়োজনে এই তিন বিভাগের মধ্যে একটি কমিশন গঠন করা যেতে পারে। তাহলে হয়তো সরকারের ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধন হবে। সরকার প্রতিটি অর্থবছরের শুরুতে একটি বার্ষিক পরিকল্পনা করে থাকে যাকে বলা হয় বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা, সংেেপ এডিপি। সরকার এডিপি খাতে প্রতি বছর অনেক টাকা বরাদ্দ রাখে। এ বছর এটা এক লাখ কোটি টাকার ওপরে। কিন্তু দেখা যায়, সরকারের বিভিন্ন দফতর বছরের ৯ মাস পার হওয়ার পরও অগ্রগতির হার ৩০-৩৫ শতাংশ। অপর দিকে বাকি তিন মাসের মধ্যে অগ্রগতির হার বেড়ে দাঁড়ায় লেটার মার্কের উপরে অর্থাৎ ৮০ শতাংশের বেশি। এটা উন্নয়নের কোন ধারাতে পড়ে তা জানা নেই। এবার আসি সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা শহরের কিছু চিত্র নিয়ে। ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্র মতিঝিল। মতিঝিলের ঠিক অদূরে কমলাপুর-মুগদা এলাকা। কমলাপুরের টিটি পাড়া থেকে বাসাবো পর্যন্ত রাস্তাটির সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ চলছে। কিন্তু ল করলাম রাস্তার মাঝখানে সিমেন্ট দিয়ে যে বিভাজন করা আছে সেটি অত্যন্ত মজবুত এবং ভালো আছে। তার পরও কেন একটা ভালো জিনিসকে নষ্ট করছে সেটা বোধগম্য নয়।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? এ প্রশ্নের উত্তর অনেক আছে। তার মধ্যে একটি হলো বর্তমান অর্থবছর পরিবর্তন করে বাঙালি ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে ১৪ এপ্রিল থেকে অর্থবছর চালু করা। আমরা কি পারি না নিজেদের সংস্কৃতি অনুসারে অর্থবছর নির্ধারণ করে দেশাত্ববোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করতে!হ
