নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের কঠোরতাকে পুঁজি করে প্রতিপক্ষকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে বহু মিথ্যা মামলা দায়ের করা হচ্ছে। আদালতে মামলা দায়েরের পর তদন্তের জন্য পাঠানো হলে মামলাটি আমলে নেয়ার সব প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করা হয়। আগে থেকেই শিখিয়ে-পড়িয়ে নেয়া লোকজন দিয়ে একতরফা জবানবন্দীর ব্যবস্থাও রয়েছে। ট্রাইব্যুনাল মামলাটি আমলে নিয়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার আগ পর্যন্ত আসামি জানতেও পারে না, প্রতিপক্ষ তার বিরুদ্ধে আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেছে। অথচ অপরাধ প্রমাণিত হলে এ মামলায় তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে।
কেস স্টাডি : ছোট্ট একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক প্রতিবেশী নারীর সাথে এক ব্যক্তির ঝগড়া হলো। সামান্য ঝগড়াঝাটির প্রকৃত ঘটনা আড়াল করে মনগড়া ঘটনা সাজিয়ে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করে ওই নারী। আদালত বাদিনীর জবানবন্দী গ্রহণান্তে ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য নিকটস্থ থানার ওসির ওপর তদন্ত দেন। ওসি তার তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন যে, তদন্তকালে বাদিনীর অভিযোগে বর্ণিত ঘটনাটি অর্থাৎ রাত ৯টার সময় তাদের বাড়িতে কোনো ঘটনা ঘটেনি। আসামি কর্তৃক বাদিনীকে ধর্ষণের চেষ্টা করার কোনো ঘটনাও ঘটেনি। তদন্তকালে প্রাপ্ত সাক্ষ্য, প্রমাণ, পারিপার্শ্বিকতা ও ঘটনাপ্রবাহে বাদিনীর আনীত ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন/২০০৩) আইনের ৯(৪)(খ) ধারার অভিযোগ প্রাথমিকভাবে সত্য নয় বলে প্রতীয়মান হয়।
এ খবর পেয়ে বাদিনী হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে আদালত চত্বরে। অতঃপর একজন আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করে ঘটনাটি দিয়ে আর কিভাবে ওই ব্যক্তিকে হয়রানি করা যায়, সে বিষয়ে পরামর্শ করেন। সে মোতাবেক ওসির তদন্ত প্রতিবেদন সত্য নয় মর্মে আদালতে নারাজি পিটিশন দাখিল করা হয়। শুরু হয় আদালত পাড়ায় দুই পক্ষের দৌড়ঝাঁপ। আসামি খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, নারী ও শিশু নির্যাতনে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব মামলার নারাজি পিটিশন মঞ্জুর করা হয়। সহজেই অনুমেয়, নারাজি গ্রহণ করা হলে বিচার প্রক্রিয়ায় পুনঃপ্রবেশ করতে হবে। কথিত আসামি পরে আইনি ঝামেলা এড়িয়ে চলার লক্ষ্যে বাদিনীর দালালদের সঙ্গে মামলা তুলে নেয়ার বিষয়ে আলোচনায় বসেন। অবশেষে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকার বিনিময়ে বাদিনী আসামির সঙ্গে সমঝোতায় উপনীত হয়। দালালেরা টাকা নেয়ার পর বাদিনীকে বলেন মামলা তুলে নেয়ার জন্য। সে মতে বাদিনী পরবর্তী তারিখে আদালতে এসে বিচারকের সামনে বলে, আসামির বিরুদ্ধে সে আর নারাজি দাখিল করবে না। এমনকি আসামির বিরুদ্ধে তার কোনো অভিযোগও নেই। অভিযোগটি ছিল সম্পূর্ণই ভুল বোঝাবুঝি। ব্যাস, সব অভিযোগের অবসান ঘটল, মামলাও সমাপ্ত হলো।
সারা দেশে এরকম বহু ঘটনাই ঘটছে, যেখানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের কঠোর বিধানের অপব্যবহার করে হয়রানিমূলক মামলা ঠুকে দেয়া হচ্ছে। দেশের ক্রমবর্ধমান নারী নির্যাতনের অপরাধগুলোর কঠোর শাস্তি বিধানের জন্য ১৯৮৩ সালে প্রথম নারী নির্যাতন (নিবর্তক শাস্তি) অধ্যাদেশ জারি করা হয়। পরে ১৯৯৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন (বিশেষ বিধান) আইন নামে একটি নতুন আইন প্রণয়ন করা হয় এবং এর মাধ্যমে ১৯৮৩ সালের অধ্যাদেশটি রহিত করা হয়েছে। পরে মামলা পরিচালনাকালে এ আইনেরও কিছু সীমাবদ্ধতা, অসঙ্গতি ও ত্রুটি-বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হওয়ায় ২০০০ সালে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’ নামে একটি পূর্ণাঙ্গ আইন পাস করা হয়। তা ছাড়া, ১৯৯৫ সালের ‘নারী ও শিশু নির্যাতন (বিশেষ বিধান)’ আইনটি বিলুপ্ত করা হলো। ২০০০ সালের আইনটিই বর্তমানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমনের জন্য প্রচলিত আইন হিসেবে বলবৎ আছে। এর পরে ২০০৩ সালে আইনটিতে সংশোধনী আনা হয়েছে।
এদিকে ধর্ষণচেষ্টার মিথ্যা মামলা প্রমাণিত হওয়ায় সম্প্রতি ঢাকার ৫ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল বাদিনী ফিরোজা বেগমকে এক বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন।
জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে চাচাত বোনের স্বামী গিয়াস উদ্দিন সহ তিনজনের বিরুদ্ধে আনা ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় আদালত এ রায় দিলেন। কারাদণ্ড ছাড়াও বাদিনীকে আরও বিশ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে এক মাসের সাজা দেন আদালত। তবে রায়ের পর ওই নারী আপিলের শর্তে জামিনের প্রার্থনা করলে বিচারক তা মঞ্জুর করেন। আদালত সূত্রে জানা যায়, জমিজমা নিয়ে বিরোধের জের ধরে আসামি ফিরোজা চাচাত বোনের স্বামীসহ তিনজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করে। পুলিশ ‘ধর্ষণের ঘটনা মিথ্যা’ মর্মে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে মিথ্যা মামলা করায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে। মিথ্যা মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়ে গিয়াস উদ্দিন মামলার বাদি ফিরোজার বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১৭ ধারায় মামলা করলে বিচার শেষে বিচারক এ দণ্ড দিয়েছেন।
এ ধারায় বলা আছে, যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কারো ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে তার বিরুদ্ধে এ আইনের অন্য কোনো ধারার অধীন মামলা বা অভিযোগ করার জন্য ন্যায্য বা আইনানুগ কারণ নেই জেনেও মামলা বা অভিযোগ দায়ের করে বা করায়, তাহলে মামলা বা অভিযোগ দায়েরকারী ব্যক্তি এবং যে অভিযোগ দায়ের করিয়েছে ওই ব্যক্তি অনধিক সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবে। উপধারা (২) মতে, কোনো ব্যক্তির লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনাল উপধারা (১)-এর অধীন সংঘটিত অপরাধের অভিযোগ গ্রহণ ও মামলার বিচার করতে পারবে।
সুতরাং মিথ্যা মামলা বা অভিযোগের শিকার হলে বিবাদি আইনের মধ্যে থেকেই আদালতে লিখিত পিটিশন দায়ের করার মধ্য দিয়ে প্রতিকার পেতে পারে। মিথ্যা মামলা বা অভিযোগের দায়ে অপরাধীর সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। নারী নির্যাতন ঠেকাতে আইনটি যথার্থভাবে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হোক, কোনো নিরপরাধ মানুষ হয়রানির শিকার না হোক সেটাই সবার প্রত্যাশা। ১৭ ধারার প্রতিকার কিভাবে ফলপ্রসূ করা যায় তা নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে।হ
লেখক : সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী
ংবৎধল.ঢ়ৎধসধহরশ@মসধরষ.পড়স,