কোনো মতবাদ বা পক্ষ হেরে যাওয়া মানে সেই মতবাদ বা পক্ষের জনপ্রিয়তা বা গ্রহণযোগ্যতা নেইÑ বিষয়টি এমন নয়। আর পরাজিত মতবাদ বা পক্ষ একেবারেই পরিত্যাজ্য হয় না। সে জন্যই গণতন্ত্রে বিরোধী দল বা মতের গুরুত্ব রয়েছে। ভিন্ন মতের প্রতি সহিষ্ণুতা প্রদর্শন, শ্রদ্ধাবোধ ও তাকে মূল্যায়ন করা বড় মানসিকতার পরিচয়। গণতন্ত্রকামী মানুষ মানেই পরমত সহিষ্ণু, পরমত শ্রদ্ধাকারী ও মূল্যায়নকারী। গ্রহণ বা বর্জন ভিন্ন বিষয়। গণতন্ত্রে বিরোধী দল মূলত গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকারি দলের সাহায্যকারীর ভূমিকা পালন করে দেশ ও জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করতে কাজ করে। এ জন্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী মত বিশেষ গুরুত্ব পায়।
একপেশে আলোচনায় ত্রুটি ধরা পড়ে না, যতক্ষণ না ভিন্ন মত ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে সমালোচনাভিত্তিক ব্যাখ্যা না দেয়া হয়। ঠিক এ কাজটাই করে থাকে বিরোধী পক্ষ বা দল। যদি বিরোধী দল বলে কিছু না থাকে সেখানে সমালোচনা, ত্রুটি বা দুর্বলতা চিহ্নিতকরণ ও সংশোধন প্রস্তাব, এসব সম্ভব নয়।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অনেক রাজনৈতিক দল থাকবে, প্রত্যেক দলের দলীয় ম্যানিফেস্ট থাকবে, যেখানে জনকল্যাণ ও রাষ্ট্রীয় কল্যাণ সাধনে প্রতিযোগিতা ও অধিকতর গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে জনগণের সামনে পেশ করার কৌশলী পদক্ষেপ থাকবে। দু’টি জায়গায় তাদের ঐক্য থাকবে। দেশ ও জনগণের কল্যাণÑ এ দু’টি বিষয় মূলত অভিন্ন। এসব বিষয়কে বিভিন্নভাবে জনগণের কাছে তুলে ধরে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে প্রত্যেক দলই সাধ্যমতো তৎপরতা চালাবে এবং এর পরিবেশও থাকবে।
জনগণ তাদের বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেশের ও তাদের কল্যাণের জন্য যে পক্ষকে উপযোগী মনে করবে, তাদের হাতেই ক্ষমতা তুলে দেবেন। যদি ক্ষমতা পেয়ে অপব্যবহার করা হয় তখন জনগণই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আন্দোলন করে আবার ক্ষমতা কেড়েও নিতে পারেন। গণতন্ত্রের এই যে রূপ, তার মূলে হলো জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। যদি বিরোধী দল, গণতান্ত্রিক অধিকার ও জনমতের কোনো মূল্যায়ন না থাকে তাহলে কিভাবে রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হতে পারে? আর যে রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক নয়, সে রাষ্ট্রে জনমতেরই বা কী গুরুত্ব থাকতে পারে? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে আগে দলগুলোকে গণতান্ত্রিক হতে হবে। গণতন্ত্রের শিক্ষা নিতে হবে, বুঝতে হবে এবং গণতন্ত্রের চর্চা করতে হবে। জনগণের কাছে গণতন্ত্রের শিক্ষা তুলে ধরতে হবে। এর মাধ্যমে জনগণকে অধিকার ও ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন করে গণতন্ত্রমনা করে তুলতে হবে। এই দায়িত্ব রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানের।
জাতীয়তাবাদ নিয়ে কাড়াকাড়ি চলছে, বাঙালি নাকি বাংলাদেশী? স্বাধীনতার পর থেকে গণতন্ত্র নিয়ে জনগণের সাথে প্রহসন শুরু হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি যেন চলমান নাটক। কারণ, যে বা যারাই ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির কথা বলে, তারাই ধর্ম নিয়ে বেশি রাজনীতি করে, করছে। এমন একটা দল পাওয়া মুশকিল, যে দলে গণতন্ত্রের শিক্ষা আছে বা গণতন্ত্রের চর্চা হয়। উত্তরাধিকার সূত্রে কিংবা নামকাওয়াস্তে ভোটের মাধ্যমে দলের প্রধান হয়ে যাচ্ছেন। গণতান্ত্রিক দল হিসেবে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকা দরকার।
কিন্তু আমাদের দেশের একদল অন্য দলের কাছে দেশবিরোধী চক্র বলে পরিচিত। কোনো রাজনৈতিক দলের এমন একটা জনসভা পাওয়া যাবে না যেখানে বিরোধী পক্ষ বা পক্ষগুলোকে দেশবিরোধী, স্বাধীনতাবিরোধী, পাকিস্তান অথবা ভারতের দালাল বা অন্য কোনো বাক্য দিয়ে ঘায়েল করতে চেষ্টার ত্রুটি করে না। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও যদি কোনো দল পাকিস্তানের দালাল বা ভারতের দালাল হিসেবেই এ দেশে রাজনীতি করে, তাহলে বলতে হয় স্বাধীনতার পক্ষবর্তী দল কি আছে? নেই। মেধা বা বুদ্ধিভিত্তিক রাজনীতির চর্চা যখন না থাকে তখন প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য অস্ত্র আর গালি ছাড়া কিছুই থাকে না।
প্রত্যেক দলই নিজের কাজের বৈধতার জন্য জনগণের ‘ট্যাগ’ লাগায়। এটা প্রতারণা ছাড়া কিছু না। প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাজনীতির তুলনা করলে মানুষ হতাশা ছাড়া কিছুই পাবে না। দলগুলো যখন দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা করবে দেশের জন্য ও দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করতে এবং শোষক নয়, শাসকের ভূমিকা পালন করবে; তখনই একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সম্ভব।হ