হিজড়া শব্দটি উর্দু। এর উৎস আরবি ‘হিজর’ শব্দ থেকে। আর হিজড়া তাদেরই বোঝানো হয়, যারা পুরুষ থেকে মহিলায় রূপান্তরকামী। উপমহাদেশে বহু বছর হিজড়াদের কোনো স্বীকৃতি ছিল না। প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত কামসূত্র বইগুলোতেও হিজড়াদের তৃতীয়া প্রকৃতি বলে সম্বোধন করা হয়েছে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ এদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০১৪ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। অথচ কুরআন এবং হাদিসের কোথাও তৃতীয় লিঙ্গের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। শান্তি এবং মানবতার ধর্ম ইসলাম সব মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেছে। ইসলাম হিজড়াদের ওপর কোনো অবিচার করেনি বরং দুনিয়ার শাসকগোষ্ঠীরা আল্লাহ তায়ালার আইনকে বাদ দিয়ে নিজেদের মনগড়া আইন দিয়ে হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি দিয়েছে।
হিজড়াদের পক্ষে বা বিপক্ষে লেখা নিবন্ধের মুখ্য উদ্দেশ্য নয়; সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে হিজড়াদের সম্পর্কে গঠনমূলক বিশ্লেষণ করাই নিবন্ধের মূল উদ্দেশ্য। সমাজের অন্য দশটি মানুষের জীবনের মতো হিজড়াদের জীবন পরিচালিত হয় না। একজন হিজড়া একাকী চলাফেরা করার সময় একশ্রেণীর বিকারগ্রস্ত মানুষ যে ভাষায় তাদেরকে সম্বোধন করে তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। শারীরিক ত্রুটির কারণে হিজড়াদেরকে সমাজ থেকে বের করে দেয়া সমীচীন নয়। কারণ, হিজড়ারাও আমাদের মতো মানুষ। তারা অন্যায় যদি করে তার প্রতিকার আমরা চাইতে পারি, কিন্তু লাগামহীনভাবে তাদের সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে বিতাড়িত করতে পারি না। জন্মগত শারীরিক ত্রুটির কারণে যারা হিজড়া তাদের কথা না হয় বাদ-ই দিলাম। কিন্তু কৃত্রিম উপায়ে যারা হিজড়াতে পরিণত হচ্ছে তাদের ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত আসা প্রয়োজন। কারণ, এক শ্রেণীর অসাধু মানুষ বারো কিংবা তেরো বছরের ছেলেদেরকে ফুঁসলিয়ে হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিকে নিয়ে পুরুষাঙ্গ কেটে ওষুধ খাইয়ে আকৃতি বিকৃতি করে ইনজেকশন দিয়ে বা অপারেশন করে স্তন বড় করে হিজড়ায় পরিণত করছে। হিজড়ায় রূপান্তরিত হওয়া মানুষগুলো পরে ইচ্ছে করলেও আর বাড়িতে ফিরে যেতে পারছে না। ইসলামের দৃষ্টিতে অঙ্গহানি শুধু নাজায়েজ তা কিন্তু নয় বরং মারাত্মক অপরাধও বটে। কারো জটিল কিংবা দুরারোগ্য ব্যথা হলেও ধার্মিক অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া অঙ্গ কাটার অনুমতি দেয়নি ইসলাম। তা ছাড়া একজন সুস্থ মানুষকে অঙ্গহানি করে অসুস্থ বানানো, সমাজ ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা অমার্জনীয় অপরাধ। এটা হিজড়া সম্প্রদায়ের অনুধান করা প্রয়োজন।
হিজড়াদের বিষয়ে নানা কথা নানা প্রশ্ন প্রতিনিয়তই শোনা যায়। বিশেষ করে রাস্তাঘাটে, যানবাহনে তাদের চাঁদা দাবি এবং বাসায় বাসায় জোরপূর্বক ঢুকে বাচ্চা-শিশুদেরকে কোলে নিয়ে নাচানাচি এবং ২-১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা এবং চাঁদা দিতে বিলম্ব করলে তাৎক্ষণিক অশ্লীল ভাষায় গালাগাল, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি, এমনকি কাপড়চোপড় খুলে ফেলাসহ হেন কোনো অপকর্ম নেই, যা তারা করে না। হানা দেয়া বাসার মালিক বা গৃহিণীদের কাছে বাস্তবে তাদের দাবিকৃত অর্থ থাকুক বা না থাকুক ধারকর্য করে হলেও তাদের দাবিকৃত অর্থ অবশ্যই দিতে হবে, নতুবা কোনোভাবেই মুক্তি নেই। এটা যে কত বড় বাস্তবতা এবং কত নির্মম নির্যাতন তা ভুক্তভোগী পরিবার ব্যতীত আর কাউকে বলে বোঝানো যাবে না। কয়েকদিন আগে আমার পরিচিত একটি পরিবার হিজড়াদের উৎপাতের কথা আমাকে জানিয়ে বলেছেন, তাদের শিশুকে চাঁদা না দিলে তুলে নিয়ে যাওয়ার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে। অবশেষে বাধ্য হয়ে দুই হাজার টাকা দিয়ে বিদায় করা হয়েছে। বাংলাদেশ মানবাধিকার সূত্রে জানা যায়, সারা দেশে হিজড়ার সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। আর কৃত্রিম হিজড়ার সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। ১৯৮০ সালের দিকে ভারতীয় হিজড়ারা যখন বাংলাদেশে প্রবেশ করে তখন থেকেই হিজড়াদের উৎপাত শুরু হয়েছে। সমাজসেবা অধিদফতরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ৬০ হাজার হিজড়া রয়েছে। তার মধ্যে রাজধানী ঢাকায় বাস করে ১৫ হাজার হিজড়া। পরিবার-পরিজনের সাথে বসবাস করে পাঁচ হাজার হিজড়া। ঢাকায় হিজড়াদের কমপক্ষে ১০টি সিন্ডিকেট রয়েছে। হিজড়াদের মধ্যে আসল ও নকল দুটোই আছে। হিজড়াদের উৎপাতের ব্যাপারে পুলিশের কাছে নালিশ করেও খুব একটা সুফল পাওয়া যায় না। চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে এমন কোনো অপকর্ম নেই যা তারা করেনি। মানুষকে জিম্মি করে জোর করে অর্থ হাতিয়ে নিলেও প্রতিরোধের কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। তাদের অত্যাচারে দেশের মানুষ বিরক্ত ও উদ্বিগ্ন। এদের দৌরাত্ম্য যেভাবে বাড়ছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে মানুষের দুর্ভোগ কোন স্তরে গিয়ে পৌঁছবে তা আল্লাহ মালুম। বখশিশের নামে তারা দিনদুপুরে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করছে। রাস্তাঘাট, পার্ক কিংবা শপিংমল, এমনকি বাসাবাড়িতেও মানুষ হিজড়াদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। মানসম্মানের ভয়ে হাজারো মানুষ চাঁদা দিতে বাধ্য হচ্ছে। এককথায় হিজড়াদের অত্যাচারের কথা লিখলে সমাপ্তি টানা যাবে না।
তারা বিকৃত আচরণ, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি এবং চাঁদাবাজির মতো ভয়ঙ্কর অপরাধ করেও কিভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে, তা বোধগম্য নয়! দেশের সন্তানতুল্য নাগরিকদের জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। হিজড়াদের প্রতি সবার সহানুভূতি যেমন কাম্য তেমনি সঙ্ঘবদ্ধ হিজড়াদের উৎপাতের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে একশ্রেণীর মানুষ যেমন বিনা পুঁজিতে আয় করেছে তেমনি হিজড়ারাও বিনা পুঁজিতে নিজেদের পকেট ভারী করছে। হিজড়ারা যাতে সমাজ ও রাষ্ট্রের বোঝা না হয়ে কর্মগুণে দেশ উন্নয়নের শরিক হতে পারে সেজন্যে রাষ্ট্রকে সবার আগে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আয়া, পিয়ন, ঝাড়দার প্রভৃতি নানা কাজের কর্মচারী হিসেবে তাদের নিয়োগ দিলে তাদের উৎপাত কিছুটা হলেও কমবে। হিজড়াদের প্রতি অবহেলা কিংবা ঘৃণার চেয়ে ভালোবাসা ও ¯েœহ দরকার। তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করা মোটেও কাক্সিক্ষত নয়। যেকোনো মুসলমানকে গালি দেয়া যেমন অন্যায় তেমনি হিজড়াদেরও গালি দেয়া অন্যায়। আমরা মনে করি রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রকৃত হিজড়াদের কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারলে হিজড়াদের উৎপাত থেকে দেশের মানুষ যেমন রক্ষা পাবে তেমনি হিজড়াদের জীবনেও শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করবে। হ