সমালোচিত দশম নির্বাচনের মেয়াদ শেষপর্যায়ে; বিদায়ী ঘণ্টা কড়া নাড়ছে রাজনীতির দরজায়। কী হতে চলছে একাদশ সংসদ নির্বাচনে, নবম নাকি আবারো দশম সংসদ নির্বাচনের পথে হাঁটবে প্রতীক্ষিত নির্বাচন। সংসদ নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই অজানা নানা শঙ্কা ডালপালা মেলছে গণমানুষের মনে। ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচন বর্জনকারী বিএনপি কি ক্ষমতাসীনদের দাবি মেনে নিয়ে নির্বাচনে আসবে, নাকি আবারো নির্বাচন বয়কটের কথা ভাবছে? নাকি শেষ পর্যন্ত ভোটের লড়াইয়ে শরিক হবে? এসব না হলে তবে কি বিএনপিসহ সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচনের উদ্যোগ নেবেন ক্ষমতাসীনেরা, নাকি বিদ্যমান সংবিধানে বাতলে দেয়া পথেই থাকবেন?
গত ৬ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি’ শীর্ষক এক গণবক্তৃতার আয়োজন করা হয়। বক্তব্য রাখেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক আলী রিয়াজ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার বক্তব্যকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা যায়। তবে দেখার বিষয় হলো, সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলো ওই বক্তব্যকে কতটা গুরুত্ব দেয় এবং সঙ্কটকে কতটা উপলব্ধি করে।
আলী রিয়াজ বলেছেন, ‘অতীতে বাংলাদেশ যত ধরনের রাজনৈতিক সঙ্কট বা অনিশ্চয়তা মোকাবেলা করেছে, এখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি তার চেয়ে ভিন্ন আর গভীর। রাজনীতিতে যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে তা আসলে হাইব্রিড রেজিম বা দো-আঁশলা ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় দৃশ্যত গণতন্ত্রের কিছু কিছু উপাদান থাকলেও সেগুলো প্রধানত শক্তি প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে। ফলে রাষ্ট্রের নিপীড়ক যন্ত্রগুলো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে এবং তাদের একধরনের দায়মুক্তি দেয়া হয়। তিনি আরো বলেন, একসময় যে প্রাণবন্ত সিভিল সোসাইটি ছিল, এখন তার চিহ্ন পর্যন্ত অবশিষ্ট নেই। গত এক দশকে সিভিল সোসাইটির বিরুদ্ধে অব্যাহত প্রচারণা চালানো হয়েছে। নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেহেতু সব ধরনের জবাবদিহির ব্যবস্থা চূর্ণ করে ফেলাই হচ্ছে ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার উপায়।’
প্রশ্ন, বিএনপি কি নির্বাচনে আসছে? ক্ষমতাসীনেরা কি মেনে নেবে বিএনপির দাবি? সব দলের অংশগ্রহণেই কি হচ্ছে একাদশ নির্বাচন? এসব প্রশ্নের জবাব এখনো অজানা থাকায় নির্বাচনের আকাশ কুয়াশায় ঘেরা। সামনের দিনগুলোতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে বলা মুশকিল, কারণ এখন পর্যন্ত বড় দুই দল নিজেরা নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে।
অন্য দিকে ‘বিরোধী’ দলে থেকে মন্ত্রিত্ব পাওয়া জাতীয় পার্টি তো সুযোগের সদ্ব্যবহার করা আর কিছু পাওয়ার অপেক্ষায়। তরল পদার্থের মতো যে পাত্রে থাকে, দলটি সে পাত্রের আকার ধারণ করে। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির সভাপতি ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ একটি টিভি চ্যানেলে সাক্ষাৎকারে বলেনÑ
‘বেগম খালেদা জিয়া যে মাপের নেত্রী তার ভাগ্য আদালত কিংবা একটি নির্বাহী আদেশ বা কোনো কলমের খোঁচায় নির্ধারিত হতে পারে না। সে রকম চেষ্টা ওয়ান-ইলেভেনের সময়ও দেখা গেছে; কিন্তু তারা সফল হননি। তার মতো নেত্রীকে যখন রাজনৈতিক মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়, তখন বুঝতে হবে যে, বিএনপি বা ২০ দলীয় জোটকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার জন্য সরকারের সব কার্ড শেষ হয়ে গেছে। সরকার বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়েছে বলেই বেগম জিয়াকে জেলে পাঠিয়েছে; কিন্তু সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে বিএনপিই লাভবান হয়েছে। তার জনপ্রিয়তাও বৃদ্ধি পেয়েছে।’
রাজনীতির মাঠে অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি, সহিংসতার ব্যাপক বিস্তারের যেসব ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করছি, তা আগামীতে আরো বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকেই। রাজনীতিবিদদের কাছে দেশের চেয়ে দল বা ক্ষমতা বড় হয়ে উঠলে জাতীয় সঙ্কট ক্রমে ঘনীভূত হয়ে ওঠে। এমন অবস্থায় অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতার মাত্রা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা হয়। দেশে ক্ষমতাপ্রেমীদের চেয়ে দেশপ্রেমীদের প্রয়োজন বেশি। হিংসা-বিদ্বেষ, প্রতিশোধস্পৃহা ও ক্ষমতালিপ্সার কারণে অতীতে অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, সেগুলো থেকে শিক্ষা নিতে হবে রাজনীতিবিদদের।
সংসদ নির্বাচন নিয়ে এই শঙ্কা বা অনিশ্চয়তা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ধ্বনিত হচ্ছে বিদেশেও। যুক্তরাজ্য তাদের এক প্রতিবেদনে আগামী নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশে সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতির আশঙ্কা ব্যক্ত করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের তাগিদ দিয়েছে। আর প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজও ঢাকা সফরে এসে বলেছেন, ‘ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ, তাই ভারতও চায় বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকুক।’ তিনিও আগামীতে বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ওপর জোর দিয়ে গেছেন।
জনগণ ক্ষমতাসীনদের মুখে প্রতিনিয়ত শুনছে, আইন তার নিজের গতিতে চলে এবং আইনের ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। জনগণ সরকারের কথা শোনে; কিন্তু কতটা বিশ্বাস করে তা সরকার যেমন জানতে চায় না, জনগণও বলার পথ পায় না। বিএনপি নেত্রীকে বিভিন্ন মামলা দিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। বিষয়টি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। এটা সরকার যেমন জানে, তেমনি জানে সব রাজনৈতিক দলের লোকেরা।
নির্বাচন ঘিরে সৃষ্ট একধরনের অনিশ্চয়তা ও সঙ্ঘাতের আশঙ্কা সাধারণের। তবে রাজনৈতিক ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন। এখন যে পরিবেশ-পরিস্থিতি বিরাজমান, শেষ বেলায় সে রকম না-ও থাকতে পারে। হ
