প্লাস্টিক এক সময় ছিল মানুষের পরম বন্ধু, সময়ে। আর এই প্লাস্টিক এখন জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্লাস্টিক দূষণ ও তার ক্ষতিকর প্রভাব বিশ্বকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। এর মারাত্মক প্রভাব জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশকে বিনষ্ট করছে প্রতিনিয়ত। অপর দিকে, প্লাস্টিক ছাড়া আমাদের একটি দিনও চলে না। এর সহজলভ্যতা আমাদের সাথে এক নিবিড় বন্ধুত্ব তৈরি করেছে, যার কুফল ভোগ করছে পুরো বিশ্ব। সহজলভ্যতা ও টেকসই মানের কারণে প্লাস্টিক বর্তমানে পুরো বিশ্বে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। কাগজ ও চটের চেয়ে প্লাস্টিক টেকসই বেশি, তাই মানুষের এর প্রতি আকর্ষণ বেশি। প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েই চলেছে। ১৯৫০ সালে পুরো পৃথিবীতে প্লাস্টিকের উৎপাদন ছিল মাত্র ২ দশমিক ২ টন। ৬৫ বছর পর ২০১৫ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৪৪৮ মিলিয়ন টনে। পৃথিবীতে এখন প্রতি বছর মাথাপিছু ৬০ কেজি প্লাস্টিক ব্যবহার হয়। উত্তর আমেরিকা, পশ্চিম ইউরোপ ও জাপানের মতো শিল্পোন্নত অঞ্চলে এর পরিমাণ মাথাপিছু ১০০ কেজিরও বেশি। বেশি উন্নত দেশগুলোতেই প্লাস্টিকের ব্যবহার বেশি। প্লাস্টিক অপচনশীল বলে মাত্রাধিক ক্ষতি করছে আমাদের, যে বিষয়ে আমরা এখনো অসচেতন। প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার এখনই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব না হলে পরবর্তী প্রজন্ম আরো মারাত্মক দূষণের কবলে পড়বে। বাংলাদেশেও প্লাস্টিকের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। প্লাস্টিক পচে না এবং মাটি কিংবা পানির সাথেও মেশে না। এ কারণে এটি সামগ্রিক পরিবেশের জন্য বিরাট হুমকি। ওয়েস্ট কনসার্নের প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে পাঁচ লাখ টনেরও বেশি প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে রিসাইকেল হয় মাত্র ৯ দশমিক ২ শতাংশ। বাকি প্লাস্টিক কিছু জ্বালানি হিসেবে পুড়ে বায়ু দূষিত করে। কিছু জমা হয় দেশের নদনদী, খালবিল ও নর্দমায়। ফলে বিঘিœত হয় আমাদের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা। তাই প্লাস্টিকের প্রতিবন্ধকতার কারণে পানির চলাচলের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। বর্তমানে দেশে প্লাস্টিকের ব্যবহার বেশি এবং হাটবাজারে পলিথিনের যেন রাজত্ব। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী প্লাস্টিকের মোড়কে বাজারে সহজলভ্য। প্লাস্টিকের দূষণ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের অভাবে আমরা প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত প্লাস্টিক ড্রেন, নর্দমা, নদনদী ও খালবিলে ফেলে তা ভরাট করে ফেলছি। এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় তিন লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য নদীনালা, খালবিল ও উন্মুক্ত স্থানে ফেলা হচ্ছে। এর মধ্যে এক কোটি ৩০ লাখ টন প্লাস্টিক আবর্জনা সমুদ্রে পড়ে করছে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি। এতে প্রতি বছর ১০ কোটি সামুদ্রিক প্রাণী দূষণের শিকার হয়ে মারা যাচ্ছে। ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাই অবশ্য প্লাস্টিকের দূষণ থেকে বিশ্বকে বাঁচাতে প্লাস্টিক বর্জ্য পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার আমাদের গ্রহণ করতে হবে।
প্লাস্টিকের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে সমুদ্র একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, যদি প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ না করা হয়, তাহলে আগামী ১০ বছরে পৃথিবীর সমুদ্রগুলোতে প্লাস্টিকের পরিমাণ তিনগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের জন্য প্রণীত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বিশ্বের সমুদ্র স্তরের উচ্চতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, সমুদ্রে প্লাস্টিক ও অন্যান্য আবর্জনার পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া। প্লাস্টিকের পরিমাণ বৃদ্ধিতেও সাগরের পানির তাপমাত্রা ও দূষণ বাড়ছে বলে জানানো হয়। অনেক চেষ্টার পরও প্লাস্টিকের ব্যবহার কিছুতেই কমছে না। ইত্তেফাকের শেষ পাতায় এক প্রতিবেদনে পড়েছিলাম প্লাস্টিক রিসাইকেল করা নিয়ে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্লাস্টিক এমন এক রাসায়নিক পদার্থ, যা পরিবেশে পচতে কিংবা কারখানায় পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ করতে অনেক সময় লাগে। এগুলো পরিবেশে বর্জ্য আকারে জমা হতে থাকে।
হিসাব মতে, পরিবেশ থেকে মাত্র ৯ শতাংশ প্লাস্টিক পুনঃচক্রায়ন করা সম্ভব হয়। কিন্তু প্লাস্টিকের পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ করার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন কানাডার তরুণ বিজ্ঞানী মিরান্ডা ওয়াং। তিনি এবং তার প্রতিষ্ঠান ‘বায়োকালেকশন’ প্লাস্টিক দূষণের চিত্র বদলে দিতে চান। তারা এমন এক পদ্ধতি আবিষ্কার করার কথা বলছেন, যে প্রক্রিয়ায় বর্জ্য আকারে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্লাস্টিককে অতি সহজে পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ করা যাবে। এটি করা গেলে দূষণ থেকে আমরা রক্ষা পেতে পারি। প্লাস্টিক নষ্ট হতে প্রচুর সময় নেয়। এটি প্রথমে মাইক্রো প্লাস্টিকে রূপ নেয়। তারপর পানি, মাছসহ বিভিন্ন উপায়ে মানুষের দেহে প্রবেশ করে নানাবিধ রোগের সৃষ্টি করছে। প্লাস্টিকের ব্যবহারে সচেতনতা ও রিসাই্িক্লং বর্তমানে বিশ্বের কাছে একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবী নামক এই গ্রহের একজন বাসিন্দা হিসেবে আমাদের দায়িত্ব, আমরা যেন দেশ ও আমাদের পৃথিবী আগামী প্রজন্মের জন্য বসবাসের উপযোগী করে যেতে পারি। আমাদের কারণেই আজ প্লাস্টিক অন্যান্য প্রাণী ও মানব জাতির জন্য হুমকিস্বরূপ। হ
প্লাস্টিক এক সময় ছিল মানুষের পরম বন্ধু, সময়ে। আর এই প্লাস্টিক এখন জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্লাস্টিক দূষণ ও তার ক্ষতিকর প্রভাব বিশ্বকে নতুন...
