বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী ১৯৯৯ সালে চারদলীয় জোটবদ্ধ হয়। তাদের মূল লক্ষ্য একসাথে আন্দোলন, একসাথে জাতীয় নির্বাচন ও একসাথে সরকার গঠন করা। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ২০০১ সালের ১ অক্টোবরে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতসহ চারদলীয় জোট অংশগ্রহণ করে এবং ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে না হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছিল।
জামায়াত মন্ত্রিপরিষদে স্থান করে নিতে সক্ষম হয়। দীর্ঘ পাঁচ বছর দক্ষতার সাথে তারা দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৬ সালে ক্ষমতার পালাবদলের পর জামায়াতসহ চারদলীয় জোটকে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। মইন উদ্দিন-ফখরুদ্দীনের আমলে জেল-জুলুম আর নির্যাতনের স্টিম রোলার চলতে থাকে তাদের ওপর। তারপর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। এই সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে পরবর্তীতে চারদলীয় জোটের আকার সম্প্রসারণ করা হয় এবং একসময় তা ২০ দলীয় জোটে রূপ নেয়। এই জোটেরও লক্ষ্য হচ্ছেÑ চারদলীয় জোটের মতো একসাথে আন্দোলন এবং একসাথে নির্বাচন ও সরকার গঠন করা। পরে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদের বিতর্কিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
এ নির্বাচনকে সামনে রেখে অনেক সহিংস-হানাহানির ঘটনাও ঘটে যায়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে জামায়াত ছাড়া অন্য দলগুলোর ময়দানে ভূমিকা পালনের মতো তেমন কোনো সাংগঠনিক শক্তি ও যোগ্যতা আছে বলে দৃশ্যমান হয়নি। এসব দলে খুব একটা নেতাকর্মী নেই। সুতরাং ওইসব দলের পক্ষে আন্দোলনকে বেগবান করা সম্ভব নয়। ইতঃপূর্বে ২০ দলীয় জোটের সব আন্দোলন ও কর্মসূচিতে জামায়াত নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ও পদচারণা ছিল সরব। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সম্পর্কটাও ছিল বরাবর অটুট। জামায়াত নেতাদের ফাঁসির সময় বিএনপির কোনো প্রতিক্রিয়া না থাকায় জামায়াতের অভিমান এবং সম্পর্কের অবনতি বা ফাটল ধরাটা অস্বাভাবিক নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের অবস্থান কী হবে তার আগে কৌশল হিসেবেই হয়তো তারা সিলেট সিটি নির্বাচনে নিজস্ব প্রার্থী দাঁড় করিয়ে ছিলেন। এ ক্ষেত্রে জামায়াতের এ সিদ্ধান্তকে অনেকেই প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখছেন। আবার অনেকেই ২০ দলীয় জোটের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টির আশঙ্কা করছেন। সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের একটি মন্তব্য জামায়াত-বিএনপির মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে দিতে পারে বলে অনেকের ধারণা। আবার অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, প্রতিটি দলের নীতি, আদর্শ, উদ্দেশ্য ও স্বকীয়তা আছে। তারা তা সময় মতো কাজে লাগানোর চেষ্টা করা দোষের কিছু নয়। সেদিক বিবেচনায় জামায়াতের ভূমিকা সঠিক বলে কেউ কেউ মনে করছেন।
জামায়াতে ইসলামী বিএনপির দীর্ঘ দিনের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে আদর্শিক কোনো মিত্র নয়, এটাও ঠিক। আদর্শগতভাবে জামায়াত একই সাথে ইসলামি দল এবং রাজনৈতিক দল। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে তারা ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উভয় কর্মসূচিই পালন করে থাকেন। ২০ দলীয় জোটের শরিক দল হলেও জামায়াতের নিজস্ব কিছু চিন্তাধারা ও কর্মসূচি আছে। তারা জোটের সাথে সমন্বয় করে নিজেদের সাংগঠনিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছেন দীর্ঘ দিন ধরে। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে দূরত্ব যাতে তৈরি করা না হয়, তা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনার দরকার।
সব সিটিতে নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীকে জামায়াত সমর্থন দিয়ে কাজ করেছে। শুধু সিলেট সিটিতে জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে জোটের সমর্থন চেয়েছিল বলে জানা যায়। কিন্তু তা দেয়া হয়নি।
সাম্প্রতিককালে বিএনপি-জামায়াতের সম্পর্কের বিষয়ে কেউ কেউ বলছেন, আওয়ামী লীগের সাথে জামায়াতের ‘আঁতাত’ চলছে। সত্যিকার অর্থে আছে কিনা এবং নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ছাড় দেবে কিনা তা একজন জামায়াত নেতার কাছে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি নাকচ করে দেন। এসব বদনাম ঘাড়ে নেয়ার চেয়ে জামায়াত বিএনপির সাথে কৌশলে সমঝোতার মাধ্যমে জোট ঠিক রেখে দেশের কল্যাণে কাজ করা উচিত।
লেখক : প্রবাসী রাজনৈতিক গবেষক
বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী ১৯৯৯ সালে চারদলীয় জোটবদ্ধ হয়। তাদের মূল লক্ষ্য একসাথে আন্দোলন, একসাথে জাতীয় নির্বাচন ও একসাথে সরকার গঠন করা। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ২০০১...
