আমাদের ভূখণ্ডে ব্রিটিশ রাজত্ব শেষ হয়েছে সেই ১৯৪৭ সালেই। যদিও এরপরে আমরা মূলত তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানিদের রাজত্বে ছিলাম। অবশেষে আমরা ১৯৭১-এ স্বাধীন হয়েছি। কিন্তু আজো কি আমরা ব্রিটিশদের প্রভাব থেকে বের হতে পেরেছি?
যদি তাকাই আমাদের আইন আদালতের দিকে, আমাদের স্বীকার করে নিতে হয় ব্রিটিশদের প্রভাব। আইন আদালতের ক্ষেত্রে আমরা এখনো সম্পূর্ণভাবে তাদের তৈরি করা আইনের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের মূল যে আইনগুলো তার প্রায় সবই ব্রিটিশ আমলে তৈরি করা। সেগুলোও আবার উনিশ শতকের। এমনকি আদালতের গঠনপ্রণালীও সেই আমলেরই। উপমহাদেশ যখন স্বাধীন হয়, তখন এ আইনগুলোকে নবগঠিত রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান গ্রহণ করে নেয়। আমরা যখন পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীন হই তখন রাষ্ট্রপতির Laws Continuous Enforcement Order ১৯৭২-এর মাধ্যমে আগের সব আইনকে আমাদের আইন হিসেবে বৈধতা দেয়া হয়। তাই ব্রিটিশ আমলের আইনগুলোই এখনো আমাদের আইনের মেরুদণ্ড।
ব্রিটিশেরা মনে করেন, এ আইনগুলো আমাদের প্রতি তাদের উপহার। কোডভিত্তিক এ আইনগুলোতে তারা সব ধরনের সম্ভাবনাকে যুক্ত করতে পেরেছেন।
তবে এ আইনগুলোকে তারা বানিয়েছিলেন সুকৌশলে আমাদের শোষণ করার জন্য। সম-অধিকারের কথা বলে স্বীয় কর্তৃত্ব কায়েম রাখাই লক্ষ্য ও প্রেক্ষাপট ছিল এসব আইনের উদ্দেশ্য। প্রত্যেকটা আইন খালি চোখে দেখলে খুবই সুন্দর। কিন্তু যখনই এসব আইন বানানোর পর দেখা হয়, তখন বুঝা যায়Ñ এগুলো আমাদের শোষণ করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। অথচ সেই আইনগুলো এখনো রয়ে গেছে। যেসব আইনের মূল ধারণাতেই শোষণ করার কৌশল, সেসব আইন দ্বারা জনগণের সেবা করা অসম্ভব।
আমাদের একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাব্যবস্থা দিয়েছেন ঠিকই, তবে তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশদের জন্য কেরানি সৃষ্টি করা। এ দেশের মানুষের মগজে তখন থেকেই প্রোথিত হয়ে গিয়েছিল যে, পড়ালেখার উদ্দেশ্য হলো সরকারি চাকরি করা। সরকারি চাকরির যে চাহিদা, তাতে স্পষ্টই বোঝা যায়, আমরা এখনো কতটা ব্রিটিশদের মানসিকতার প্রভাবাধীন।
ইংরেজি জানা লোকদের মনে করা হয় সবচেয়ে স্মার্ট, সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি। ব্রিটিশ আমলে যারা ইংরেজি জানতেন, তারা ব্রিটিশদের অধীনে চাকরি পেতেন। ফলে সেই সময় তাদের সবাই সমীহ করত। দুইবার স্বাধীনতার এত বছর পরে আজো একই অবস্থা।
আমাদের প্রশাসনও ব্রিটিশ প্রভাবের আওতামুক্ত নয়। ব্রিটিশ আমলে চলত, এখনো সেভাবেই চলছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে এখনো রয়ে গেছে ব্রিটিশ শাসনের প্রভাব।
এর থেকে মুক্তি পেতে আইনব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। এটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ। সব আইনকে ঢেলে সাজানোর মতো মেধা আমাদের দেশে আছে কি? দেশে পর্যাপ্ত গবেষণা নেই বা এর সুযোগও নেই। তবে এখন থেকে চেষ্টা করলে হয়তোবা একসময় আমরা সফল হতে পারি।
শুধু চাকরিকেই সফলতার মানদণ্ড না ধরে ব্যবসা-বাণিজ্যে উৎসাহ প্রদান করতে হবে। ইংরেজি জানা লোকেরাই সবচেয়ে শিক্ষিতÑ এই ধারণা পরিবর্তন করতে হবে।
শিক্ষাব্যবস্থাকে ও প্রশাসনকে ঢেলে সাজাতে হবে। সবকিছু করতে হবে আমাদের স্বকীয় ধ্যান-ধারণা ও নিজস্ব সংস্কৃতির আলোকে। হ
লেখক : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
