‘রাজনীতি’ শব্দটি বহুল আলোচিত এবং সর্বমহলে পরিচিত। এটি সমাস সাধিত শব্দ। এর অর্থ হলোÑ ‘নীতির রাজা’। রাজারনীতি নয়। সুতরাং সেদিক থেকে বলা যায়, রাজনীতিবিদ তিনিই হবেন অথবা রাজনীতি করার অধিকার কেবল তারই রয়েছে, যিনি ‘নীতির রাজা’ হতে পারবেন। রাজনীতি মানুষের জন্য। মানুষের মৌলিক চাহিদা (অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা) নিশ্চিত করা, সমাজে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা রাজনীতির অন্যতম শিক্ষা। রাজনীতির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হতে হবে সমাজ, দেশ ও রাষ্ট্রের কল্যাণ সাধন। মানবিক ও নৈতিক গুণাবলিসম্পন্ন, সৎ, যোগ্য, শিক্ষিত, আধুনিক তথা যুগোপযোগী, বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তিরাই রাজনীতির অঙ্গনে থাকা উচিত। অসাধু, চোর, বাটপার, দুর্নীতিবাজদের রাজনীতিতে শোভা পায় না। কারণ, রাজনীতির উদ্দেশ্যই হলোÑ দুষ্টের দমন, শিষ্টের লালন। আর অসৎ লোকেরা রাজনৈতিক ক্ষমতা বজায় রাখলে এর বিপরীত অবস্থা দেখা যাবে। তখন সমাজে নৈরাজ্য দেখা দেবে। পদে পদে মানুষের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হবে। অপরাধ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বাড়বে। আইনের শাসন থমকে যাবে। অপরাধীর বুক ফুলিয়ে চলার সুযোগ সৃষ্টি হবে। পশুর সাম্রাজ্য কায়েম হবে। নেতৃত্ব নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। গোটা সমাজব্যবস্থা এক ধরনের বিবদমান অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে থাকবে।
পৃথিবীব্যাপী সুশৃঙ্খল সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে রাজনৈতিক ধারণা সৃষ্টি হয়েছে।
রাজনীতির আদি সূতিকাগার হলো পরিবার। মানুষ পরিবার থেকে রাষ্ট্রের ধারণা পেয়েছে। তাই পরিবারকে বলা হয় small state ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে। পরিবারে স্বামী-স্ত্রী, মা-বাবা, ভাই-বোনসহ বিভিন্ন সদস্য। একটি গঠনমূলক, আদর্শ পরিবার পরিচালনার লক্ষ্যে একজনকে কর্তা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তার নির্দেশে পারিবারিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো। পরিবারের সবাই কর্তা হলে অথবা কর্তা না থাকলে কারো কথা কেউ শুনবে না। এমন চিন্তা থেকেই নেতা নির্বাচনে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। মানুষ সঙ্ঘবদ্ধ জীব। প্রাত্যহিক জীবনের নানামুখী কার্যক্রম সহজ ও গতিশীল করার লক্ষ্যে একাধিক পরিবার নিয়ে মানুষ গড়ে তুলেছে সামাজিক জীবনব্যবস্থা। আর সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যোগ্যতাভিত্তিক নেতা নির্বাচন করা হতো। অনুরূপ, গ্রামভিত্তিক সঙ্ঘবদ্ধ সমাজব্যবস্থা পরিচালনার বৃহত্তর লক্ষ্যে গঠিত হয়েছে রাষ্ট্র নামক সংগঠন। রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ (ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে) সমগ্র জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তার প্রতীক। রাষ্ট্র পরিচালিত হবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়, নির্বাচিত যোগ্য জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে। যারা হবেন নীতিবান, সত্য ও আদর্শের ধারক-বাহক। তাদের মাধ্যমেই জাতির আশা, আকাক্সক্ষার সামগ্রিক প্রতিফলন ঘটবে।
এতগুলো কথা বললাম, রাজনীতি ও রাজনীতিবিদ প্রসঙ্গে। কারণ, রাজনীতিবিদেরা দেশ ও জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করেন। আর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় এ কাজগুলো সম্পন্ন হয়। অনেক রাজনীতিবিদ আছেন যারা সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের কথা বলে রাতারাতি নিজেদের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটিয়ে থাকেন। নির্বাচনী ওয়াদা ও রাষ্ট্রীয় শপথ ভঙ্গ করে তারা মুখ বাঁচানোর জন্য কথায় কথায় বলে থাকেন রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই। তা সত্য, রাজনীতির শেষ কথা নেই। কারণ, রাজনীতি একটি পরিবর্তন ও গতিশীল বিজ্ঞানের নাম। কিন্তু মিথ্যা কথার শেষ আছে। মিথ্যা বা প্রতারণামূলক আচরণের স্থান রাজনীতির অভিধানে নেই। নির্লজ্জ মিথ্যাচার রাজনীতির বৈশিষ্ট্যের সাথে যায় না। রাজনীতিবিদ সম্মানীয় ব্যক্তিত্ব। তারা হবেন জাতির অভিভাবক, সংবিধান প্রণেতা। রাষ্ট্রের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরী। রাজনীতিবিদ জাতি-রাষ্ট্রের পরিচালক। রাষ্ট্রের শিক্ষানীতি, অর্থনীতি, স্বরাষ্ট্রনীতি, পররাষ্ট্রনীতি তথা সর্বোপরি পরিপূর্ণ রাষ্ট্রনীতি পরিচালনার দায়িত্ব রাজনীতিবিদের হাতেই ন্যস্ত। সুতরাং এ কথা সহজে অনুমেয়, দেশ পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত রাজনীতিবিদের চরিত্র কেমন হওয়া উচিত।
ইলেকট্রনিকস ও প্রিন্টমিডিয়ার বদৌলতে প্রায়ই দেখা যায়, একশ্রেণীর রাজনীতিকের হাতে দেশের জাতি গড়ার কারিগর নামে খ্যাত শিক্ষক সমাজ এবং পদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদেরও লাঞ্ছিত। দেখা যায় চপেটাঘাতের শিকার হয়ে কান ধরে উঠবস করতে। নিছক ব্যক্তিগত স্বার্থে আঘাত লাগলে এ জাতীয় নগ্ন আক্রমণ করেন কোনো কোনো রাজনীতিবিদ। জাতির জন্য এর চেয়ে লজ্জার আর কী থাকতে পারে। হ