আমার বাড়ি বৃহত্তর চলনবিল এলাকায়। সুযোগ পেলে বর্ষা মওসুমে নৌকাযোগে চলনবিল ঘুরে-ফিরে দেখি। এবার কোরবানির ঈদের ছুটিতেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু এবার চলনবিলের সৌন্দর্য দেখে যতটা আনন্দ পেয়েছি, চলনবিলে পানিশূন্যতা দেখে তার চেয়ে বেশি ব্যথিত হয়েছি। যে চলনবিলে বাঁশের লগির নাগাল পাওয়া কষ্টকর হয়ে যায়, সেখানে এবার নৌকা ঠেকে যাওয়ার উপক্রম।
এ বিলের ওপর নির্ভর করে একটি বিশাল জনপদ জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। চলনবিলের পানিতে বেড়ে ওঠে হাজারো কৃষকের স্বপ্নের আমন ধান। পানির অভাবে রোপণ করা আমন ধান সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারবে না। অপরিপক্ব ধান শুধু গরু-মহিষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। বিগত কয়েকটি বছরে এমন ঘটনার নজির পাওয়া গেছে। এমন খবরও মিলেছে, কৃষকেরা তাদের শত শত বিঘা জমির সোনালি আঁশ পাট জাগ দেয়ার পর্যাপ্ত পানি পর্যন্ত পাননি। নদী ও বিল আগেই পানিশূন্য হয়ে গেছে। চলনবিলে বর্ষা মওসুমে পানির স্রোতে পলি মাটি জমতে থাকে। এতে জমিগুলো উর্বর হয়। এ ছাড়া, কৃষকেরা শুধু চলনবিলের পানি দিয়ে সেচ কাজ চালিয়ে বোরো মওসুমে ধান চাষ করতে পারেন। কিন্তু সে সুযোগ এখন আর নেই।
একটা সময় চলনবিলে প্রচুর শাপলা ফুল ফুটত, শামুক, কাঁকড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির স্বাদু পানির মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে বিলজুড়ে কোথাও শাপলার দেখা মেলে না। অতিরিক্ত দমন ও কীটনাশকের আগ্রাসনে বিল থেকে শামুক, কাঁকড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির জীব হারিয়ে গেছে। আর প্রজনন মওসুমে মা মাছ ধরা ও পানি স্বল্পতার কারণে মাছের প্রজাতি হারিয়ে গেছে। মাছ ধরার সুযোগ হারিয়ে জেলেরা পেশা পরিবর্তন করতে শহরমুখী হচ্ছেন। নৌকা ও মাছ ধরার যন্ত্রপাতিগুলোও আর ব্যবহার করা হয় না। চলনবিল অঞ্চলে পাখি ও বন্যপ্রাণীরাও বিলুপ্তির পথে। শিকারিদের হিংস্র হাতের থাবায় তারাও কুপোকাত।
আমরা দেখেছি, এক সময় আষাঢ় মাসের অনেক আগেই চলনবিলের শাখা-প্রশাখাসহ ছোট-বড় নদ-নদীতে আগাম বর্ষার পানি চলে আসত। কখনো কখনো চলনবিলের পানিতে আমাদের বাড়ির উঠানে পানি উঠত। কিন্তু সে সময় চলে গেছে। কালের আবর্তে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন ও মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে সারা বছর চলনবিলের এ নদ-নদীগুলো শুকিয়ে থাকায় তা এখন গো-চরণ ভূমি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। লক্ষ করলে দেখা যাবে, এসব শাখা- প্রশাখা নদ-নদীতে এখন চাষাবাদ হচ্ছে। নদীগুলোর মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাঁধ দিয়ে সারা বছর মাছ চাষ করা হচ্ছে। পানিতে মাছ ভেসে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে চলনবিলের নদীগুলো দখল করে পুকুর বানিয়ে মাছ চাষ করা খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এভাবে নদীকে পুকুর বানাতে থাকলে চলনবিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ৪৭টি নদীই মরে যাবে। এ ছাড়া, অনেকে ফসলি জমি খনন করে বিরাট বিরাট পুকুর তৈরি করার কাজ শুরু করে দিয়েছে। এতে চলনবিল অঞ্চলে অচিরেই কৃষিকাজ বিলুপ্তি হতে পারে।
বর্ষাকাল শেষ হয়ে গেলেও চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় পানির দেখা মিলে না। নদীগুলোর পাড় অবধি পানিও নেই। স্রোতপ্রবাহ তেমন নেই বলে নদীতে মাছের দেখা মিলছে না। কিন্তু প্রশ্ন হতে পারেÑ কোন কারণে চলনবিলে এমন পানিশূন্যতা দেখা দিতে শুরু করেছে? এ বিষয়ে আমার উত্তর, এ বছর সারা দেশেই বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। অতিবর্ষা আমাদের জন্য ক্ষতিকর হলেও পর্যাপ্ত বর্ষা দরকার। প্রাকৃতিক নানা কারণের পাশাপাশি মনুষ্যসৃষ্ট কিছু কারণে বর্ষাকালে পর্যাপ্ত পানি বাঁধ, পুকুর ও সড়ক নির্মাণের কারণে পানি প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। চলনবিলে যেসব নদীপথ দিয়ে পানি প্রবেশ করে তার বেশির ভাগের মুখগুলো বাঁধ দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং এ সংখ্যা অনেক। যেখানে ব্রিজের দরকার সেখানেও বাঁধ নির্মাণ করে চলনবিলে পানি প্রবেশের পথকে বন্ধ করা হয়েছে। বিলের মধ্যে বরাবর অসংখ্য রাস্তা ও সড়ক গড়ে উঠেছে। এগুলো চলনবিল ভাগ করতে শুরু করে দিয়েছে। এক পাশের পানি অন্য পাশে যেতে পারছে না। চলনবিলে পুকুর তৈরির কারণেও পানি প্রবেশের পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
কৃষি ও মৎস্য সম্ভাবনার পাশাপাশি চলনবিল একাধারে একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকা। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে চলনবিল রক্ষার উদ্যোগ নিলে বর্ষা মওসুমে চলনবিল হতে পারে অপার সম্ভাবনাময় এক পর্যটন এলাকা। বিলে পর্যাপ্ত পানি থাকা মানে কৃষকের স্বপ্নপূরণ হওয়া, জেলের জাল ভর্তি মাছ পাওয়ার নিশ্চয়তা, জীব-বৈচিত্র্যের বিলুপ্তির হাত থেকে রেহাই পাওয়া, পরিবেশ অনুকূলে থাকা ইত্যাদি। অত্র অঞ্চলের মানুষদের বোধোদয় ঘটাতে হবে। কেন তারা কৃষি জমি নষ্ট করে পুকুর তৈরি করে, ইট ভাটা তৈরি করে চলনবিলকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছেন? নদী-নালা-বিল দখল করে পুকুর খননে নিরুৎসাহিত করতে হবে। আমি মনে করি, চলনবিল বাঁচলে একটি জনপদ বাঁচবে। আর তাই এ কথাটিকে মনে রেখে আজই আমাদের সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। হ
md.angkon12@gmail.com