রোগী এবং তার স্বজনেরা প্রায়ই আমাদের আদেশের সুরে বলেন, ‘আমার প্রেশারটা দেখেন তো।’ এটা আমাদের জন্য খুবই বিব্রতকর পরিস্থিতি!
আমাদের রোগীদের আবেগ অনুভূতির একটা বড় অংশ ফার্মেসি ব্যবসায়ীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। রোগীদের একটি বড় অংশ ফার্মেসি ব্যবসায়ীকে ডাক্তার বলে মনে করেন! ডাক্তার আর ফার্মেসি ব্যবসায়ীদের মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে বলে মনে করেন না তারা!
রোগ নির্ণয়ে ডাক্তারেরা রোগীর ইতিহাস শোনেন। শরীর পরীক্ষা করেন। সবশেষে প্রয়োজন অনুযায়ী টেস্ট করান। নিজেদের চোখ, হাত ও কান ব্যবহার করে ডাক্তারেরা প্রয়োজন মোতাবেক বিভিন্ন রোগীর শরীরে নানা সময়ে হাজার রকমের পরীক্ষা করে থাকেন। যে রোগীর ক্ষেত্রে যে পরীক্ষা দরকার চিকিৎসকেরা সেই রোগীর জন্য শুধু বাছাই করা পরীক্ষাগুলোই করেন।
এ হাজার ধরনের পরীক্ষার মধ্যে প্রেশার দেখা হচ্ছে একটি। ফার্মেসি ব্যবসায়ীর কাছে গিয়ে রোগী যখন সমস্যার কথা বলেন, তখন তারা সব সময়ই একটি কাজ করেন। প্রেশার দেখা। প্রেশার দেখা ছাড়া তারা আর কিছু জানেন না। তারা বলতে পারবেন না, প্রেশার কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী। এভাবে হাজারো প্রশ্ন চলে আসবে। তবু তারা তাদের কাছে একজন রোগী গেলে শুধু প্রেশার দেখেন। এভাবে তারা মানুষকে বোঝাতে চান, প্রেশার মাপা মানেই ডাক্তারি। ডাক্তারি মানেই প্রেশার মাপা! এভাবে তারাই একমাত্র ডাক্তার! বাইরে আর কোথাও যাওয়া দরকার নেই! তাই, এখন থেকে তাদেরই ভিজিট ফি দেয়া হোক! বাস্তবতার সাথে এর কোনো মিল নেই।
এ জন্যই রোগী ডাক্তারের সামনে হাজির হয়ে প্রায়ই বলেন, ‘আমার প্রেশারটা মাপেন তো।’ প্রেশার মাপা মানেই ডাক্তারি নয়। ডাক্তারি মানেই প্রেশার মাপা নয়! বরং ফার্মেসি ব্যবসায়ীরা নিজেকে ডাক্তার হিসেবে জাহির করতেই যেকোনো একজন রোগী পেলেই প্রেশার মাপেন। এতে রোগীদের ধারণা জন্মে, রোগ মানেই প্রেশার। অনেক রোগী আছেন, যারা কখনোই ডাক্তারকে বলেন না, ‘আমার প্রেশারটা দেখেন তো!’ কিন্তু দেখা যায় ডাক্তার একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর সেই রোগীর প্রেশার দেখছেন! তাই ডাক্তারকেই ডাক্তারি করতে দেন। রোগীর কাজ হচ্ছে নিজের অসুবিধার কথা ডাক্তারকে জানানো। অনেক সময় অনেক রোগীর স্বজন আদেশের সুরে ডাক্তারকে প্রেশার মাপতে বলেন! বরং এভাবে বলা যেতে পারে, ‘আমি আশঙ্কা করছি যে, আমার প্রেশার হয়তো অনেক বেশি হয়ে গেছে, যে কারণে আমার খারাপ লাগছে।’ কখনই আদেশের সুরে না বলা। নির্দ্বিধায় বলা যায়, এটা রীতিমত সৌজন্যতার খেলাপ।
ডাক্তারকে আপনার সমস্যা এবং কষ্টের কথা বলুন।
কখনোই বলা উচিত নয়, ‘আমার প্রেশারটা দেখেন তো।’
কারণ, আপনি কখনই নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারবেন না :
১. প্রেশার কাকে বলে? কত প্রকার ও কী কী? এর মধ্যে কোন প্রকারেরটা দেখতে হবে?
২. প্রেশার ছাড়া আর কী কী দেখা যেতে পারে? রোগীর কোন কোন ধরনের কষ্ট হলে প্রেশার দেখতে হয়? আর কী কী সমস্যা হলে প্রেশার না দেখে বরং অন্য বিষয়গুলো দেখতে হয়?
৩. সেগুলো বা সেগুলোর কোনোটা না দেখে কেন শুধু প্রেশারটা দেখতে হবে?
৪. প্রেশার দেখার পর ডাক্তার যদি আপনাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘প্রেশার তো দেখলাম, এখন কী করব?’ তখন আপনি ডাক্তারকে কি নির্দেশনা দেবেন?
৫. প্রেশারের মধ্যে কী সমস্যা আছে বলে আপনি মনে করেন যে কারণে আপনি ডাক্তারকে প্রেশার দেখতে আদেশ করলেন? তার সমাধান কী তাহলে?
দেখা যাবে আপনি এগুলোর কোনোটারই উত্তর দিতে পারছেন না!
রোগীর কাজ হচ্ছেÑ তার চলমান কষ্টের কথা ডাক্তারকে বলা। তারপর কী দেখতে হবে, নাকি কিছুই দেখতে হবে না; তা ডাক্তারই ভালো বুঝবেন!
রোগীর মর্জি মতো ডাক্তার চললে চিকিৎসাব্যবস্থা বলে কিছু আর বাকি থাকবে না। হ
লেখক : চিকিৎসক, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল
রোগী এবং তার স্বজনেরা প্রায়ই আমাদের আদেশের সুরে বলেন, ‘আমার প্রেশারটা দেখেন তো।’ এটা আমাদের জন্য খুবই বিব্রতকর পরিস্থিতি! আমাদের রোগীদের আবেগ অনুভূতির একটা বড়...
