প্রাসাদ কিংবা অট্টালিকা যাই বলি সবই নির্মাণশ্রমিকদেরই পরিশ্রমের ফল। নির্মাণশ্রমিকেরা এসব কাজ না করলে হয়তো পৃথিবীতে এত সুন্দর অট্টালিকা, প্রাচীনকালের তৈরি প্রাসাদ বা রাজমহল হয়তো কখনই দেখা যেত না। কিন্তু এই শ্রমিকদের যে নিরাপত্তা থাকা দরকার, সেটি ভেবেছি কি কখনো?
জোর দিয়েই বলা যায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে সারা দেশের নির্মাণশ্রমিকেরা। অন্যান্য দেশের চেয়ে আমাদের দেশে এদের অবস্থা খুবই নাজুক। তাদের যথার্থ নিরাপত্তা দেয়া হয় না। অথচ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিনের পর দিন বড় বড় ইমারত তৈরি করে যাচ্ছেন তারা। আর সেসব ইমারতে অতি স্বাচ্ছন্দ্যে ও নিরাপদে জীবনযাপন করে যাচ্ছেন ইমারত মালিকেরা। তার বিনিময়ে নির্মাণশ্রমিকেরা শুধু সামান্য পারিশ্রমিক পান, কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি তাদের সংসার জীবন এ সামান্য অর্থ দিয়ে চলে কি না ?
নির্মাণশ্রমিকদের আরো করুণ দশায় পড়তে হয় যখন তাদের কোনো কাজের নিশ্চয়তা থাকে না। তাদের কাজ যদি না থাকে তাহলে তারা অন্য কোনো কাজও করতে পারে না। দেশের বিভিন্ন স্থানে ভোর হলেই নির্মাণশ্রমিকেরা জটলা হয়ে বসে থাকেন। কেউ না কেউ এসে কাজে নিয়ে যাবেনÑ এমন আশাতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকেন নির্মাণশ্রমিকেরা। এ সময় যে স্থানে তারা জটলা হয়ে বসে থাকেন সে স্থান দেখতে যেন মনে হয় কোনো হাট বসেছে। আসলে এ হাট বা বাজারে শ্রম বিক্রি করা হয়। তাই অনেকেই এটিকে শ্রমের হাট কিংবা মানুষ বেচাকেনার হাট বলে থাকেন। কারণ, এ হাটে সারা দিনের জন্য একজন শ্রমিককে ২০০ কিংবা ৩০০ টাকা দিয়ে কিনে নেয়া হয়। মানে কাজ করানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। কাজের মজুরি বাবদ দিন শেষে হাতে তুলে দেয়া হয় এই পরিমাণ টাকা। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৪০০-৫০০ টাকাও পারিশ্রমিক দেয়া হয়।
সভ্য জগতে অনেক ধরনের বাজার আছে। তাই বলে শ্রমের বাজার আছে এমনটি কেউ হয়তো বিশ্বাসই করতে পারবেন না। কিন্তু আমাদের এ দেশে নির্মাণশ্রমিকদের অবস্থা এতটাই করুণ যে নিজের চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করতে চাইবেন না। যেখানে প্রত্যেক দিন সকালে শ্রমিক বেচাকেনা হয়ে থাকে।
এমনি কয়েকটি হাট রয়েছে সাভার, আশুলিয়া, কালিয়াকৈর, ধামরাই, গাজীপুর, শ্রীপুর, মাওনা, চান্দনা চৌরাস্তাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। এসব হাট বা বাজারে কাজের আশায় নির্মাণশ্রমিকসহ নানা শ্রমজীবী মানুষকে সকাল থেকে বসে থাকতে হয়। পরে কেউ শ্রমিক নিতে এলে তার সাথে বনিবনা হলে কাজে যোগ দেন তারা।
নির্মাণশ্রমিকেরা যাতে নিয়মিত কাজ এবং নিরাপত্তা পান সেজন্য সংশ্লিষ্ট মহলকে অবশ্যই নজর দিতে হবে। এ ছাড়া তারা নিজেরা যাতে কাজ পান সেজন্য নিজেদের দলগতভাবে থাকতে হবে। যারা নির্মাণকাজে শ্রমিকদের কাজ করাতে নিতে আসবেন তারা সে দলের সাথে যোগাযোগ করে নিতে পারবেন। সরকার ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও এ দিকে খেয়াল রাখতে হবে। যাতে তারা তাদের ন্যায্য অধিকার ও পাওনা ভোগ করতে পারেন। তা ছাড়া নির্মাণশ্রমিকদের নিয়ে দেশের সচেতনমহলকেও ভাবতে হবে। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও পাওনা নিয়ে যারা সংগ্রাম করে তাদেরও নির্মাণশ্রমিকদের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। তাদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য উৎসাহিত করতে হবে।
শ্রমিকদের দিয়ে যারা কাজ করান, তাদেরও নির্মাণশ্রমিকদের প্রতি মানবিক দৃষ্টি রাখতে হবে। এরা যেসব ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেন সেসব কাজের আগে অবশ্যই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নয়তো অনেক শ্রমিককে নিরাপত্তার অভাবে জীবন নষ্ট কিংবা পঙ্গুত্ববরণ করে পরিবারের বোঝা হয়ে থাকতে হবে। হ
E-mail : tuhinj786@gmail.com
