প্রাইমারি স্কুলেপড়া একটি শিশুর ইচ্ছে থাকে, বড় হয়ে হয়তো সে হবে ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার। শুরু থেকে যখন পরীক্ষার ফলে জিপিএ ৫ পায় না, তখন তার চিন্তার পরিবর্তন হতে শুরু করে। কেমিস্ট্রির বোঝা হয়তো সে মাথায় নিতে পারে না, কিংবা ফিজিক্সের সূত্রগুলোও মনে থাকতে চায় না, আর উচ্চতর গণিত তো চলে যায় মাথার ওপর দিয়েই। এই বেচারা করবে কী তখন? আর্টস নিয়ে পড়ে, সে কি পারবে ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হতে? কমার্সে গেলেই বা কী হবে? এসব ভাবতে ভাবতেই সায়েন্স নিয়ে যখন জিপিএ ৪ পায়, তখন যেন ‘মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার’ মতো অবস্থা। ভালো কলেজগুলোও যেন ইদানীং কেমন হয়ে গেছে। রেজাল্টে কম পয়েন্ট পেলে ভর্তি করে না। বেচারার আর কী দোষ? আর্টস নিয়ে ভালো কলেজ থেকে যখন টেনেটুনে জিপিএ ৪ পায়, তখন যেন যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। সে যুদ্ধে না থাকে বন্দুক, না থাকে অস্ত্র। ভর্তি যুদ্ধেই যেন একটা ছাত্রের বা ছাত্রীর জীবনে পরাজয় চলে আসে। মা-বাবার শিখিয়ে দেয়া ইচ্ছার, ডাক্তার না হতে পারার ‘পরাজয়’, কিংবা ভালো একটি ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি না হতে পারার কথিত পরাজয়।
এতকিছুর ভিড়ে সে হয়তো ভুলেই গিয়েছিল যে, ক্লাস থ্রিতে সে একবার অঙ্কন প্রতিযোগিতায় জেলা পর্যায়ে প্রথম হয়েছিল। ষষ্ঠ শ্রেণীতে যে বছর বিভাগীয়পর্যায়ে দ্বিতীয় হয়েছিল, সে বছর ছিল তার আর্ট পেপারে শেষ তুলি। আজ আর তার হাতে তুলি উঠে না। ছোট-বড় বিভিন্ন বইতে কিসব যেন পড়ে। সে ঠিক বুঝতে পারে না কোথা থেকে শুরু করবে। তবে সে বুঝতে পারে, একটাই পথ খোলা। মফস্বলের একটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিসিএস ক্যাডার হতে হবে তাকে। তা-না হলে চাকরিও পাবে না, কারণ চাকরির বাজার খারাপ। আর্থিক সুবিধা থাকলে হয়তো প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ‘সেরা’ সাবজেক্টে পড়ত। বাবার সামান্য আয়ে এখন তা অসম্ভব।
এ রকম হাজারো ছেলে নষ্ট হয়ে যায় আমাদের সমাজে। দুর্ভিক্ষের সময় জয়নুল আবেদিনের আঁকা চিত্রের মূল্যায়ন ডাক্তারদের থেকে কম হয়নি। আমাদের দেশের শত শত প্রতিভা নষ্ট হয়ে যায় শুধু পরিবারের চাপে; হতে হবে ডাক্তার, না হয় ইঞ্জিনিয়ার। এ দেশের বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রীর নতুন বিষণœতার কারণ হচ্ছেÑ কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পাওয়া। যে বেচারার গানের গলা ভালো, তাকেও আজ সুরে সুরে সাধারণ জ্ঞান মুখস্থ করতে হচ্ছে। যে বেচারা কেমিস্ট্রিতে ভালো করার বিস্তর সম্ভাবনা রাখে, তাকে হয়তো ইউনিভার্সিটির অ্যাকাউন্টিং ডিপার্টমেন্টে পড়তে হচ্ছে। যে মেয়েটা জার্নালিজমের কোনো ধারণাই রাখতে চায় না, তাকেও আজ ইউনিভার্সিটিতে জার্নালিজমে পড়তে হচ্ছে। ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখা ছেলেটা একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে রোবট বানাতে স্পন্সর চাচ্ছে। মেডিক্যালে চান্স পাওয়া ছেলেটাও কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেছে। তবুও এবার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেয়া মেয়েটা বুয়েটের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। জানে না তার ভবিষ্যৎ কী?
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ দোষ দেয়া যায় না। কারণ কিছু সমস্যা স্কুলব্যাগে ভর্তি করে জীবনের প্রথম ক্লাসটা করতে হয়। এতে শিক্ষাটা উপভোগের বদলে চ্যালেঞ্জিং বেশি হয়ে যায়। সেখানে সফলতার চেয়ে বিষণœতা বেশি আসা এই সমাজে অস্বাভাবিক নয়। হ
লেখক : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, জেডএইচসিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়