ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস করার মাধ্যমে দেশের নানা শ্রেণী ও পেশার মানুষের মতামতকে উপেক্ষা করা হয়েছে। এই আইন নানামুখী বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই আইনে অপরাধীকে নয়, বরং অপরাধ কার্যের সাক্ষীকেই অপরাধী বানানো হয়েছে। সাজা নিয়ে রয়েছে নানা অসঙ্গতি। এই আইন সম্পর্কে শুধু দেশের মানুষ নয়, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এ বিষয়ে আইন প্রণেতাদের কিংবা ক্ষমতাসীন সরকারের বোধোদয় ঘটেছে কি-না তা আমরা জানি না।
দেশে ক্রমেই সাইবার অপরাধ বাড়ছে। আইনটি ‘ট্রায়াল ভার্সন’ হিসেবে দেখতে অনেক দেশই প্রস্তুত। তাই অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থাও এতে ‘নাক গলাচ্ছে’। তবে আইনটির গুণগত মান ও নৈতিক দিক নিয়ে দেশে-বিদেশে প্রশ্ন উঠেছে। এর থেকে লজ্জাজনক বিষয় জাতির জন্য আর কী হতে পারে? এ প্রসঙ্গে এই গল্পটা মানায়Ñ একজন ছাত্র যখন গোল্ডেন এ প্লাস পায়, তখন প্রতিবেশী তার সন্তানের জন্য ওই ছাত্রকে অনুকরণ করার চেষ্টা চালায়। আর বিপরীতটা হলে তথা ভালো ছাত্র হয়েও খারাপ ফলাফল করলে মুখের ওপর কটুকথা বলতেও দ্বিধা করে না।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এটি তথ্য অধিকার আইনের সাথেই যে সাংঘর্ষিক তাই নয়, আমাদের সংবিধানের মূল নীতিরও পরিপন্থী। সরকারের ভাষ্য, দেশের সরকারি অফিস-আদালত ও প্রতিষ্ঠান থেকে দুর্নীতি কমিয়ে আনতে সরকার সর্বদাই অঙ্গীকারবদ্ধ।’ কিন্তু আইনের ভাষা বলছে অন্য কথা। ‘দাফতরিক গোপনীয়তা লঙ্ঘন শাস্তিযোগ্য’ বলে বিবেচিত হলে ক্ষমতাসীনদের কিংবা সরকারের দুর্নীতির প্রসঙ্গ জনসমক্ষে আসবে কেমন করে? না কি আইনটি পাস হলে কোনো সরকারই দুর্নীতি করবে না! আইনটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করা সংবাদকর্মীদের জন্য একটি কাঁটাস্বরূপ। আজকাল সাংবাদিকেরা সাধারণ সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়েও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। যখন আইনটির প্রয়োগ শুরু হবে, তখন শুধু হয়রানি নয়, নির্যাতনেরও সম্মুখীন হবেন। সাংবাদিকেরা এমন পরিস্থিতিতে পড়লে সরকারের আর জবাবদিহি করতে হবে না! এই যদি হয় আইনটির মূল উদ্দেশ্য, তাহলে আমরা কোনো সময়ই দুর্নীতিরোধ করতে সক্ষমÑ এমন সরকার পাবো না। তখন কায়েম হবে দুর্নীতিবান্ধব সরকার।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় গণতান্ত্রিক সমাজে বাংলাদেশের যে ভাবমর্যাদা রয়েছে, সেটি বিনষ্ট হতে পারে। এই আইন দ্বারা কে কখন কার দ্বারা অকারণে নিগ্রহের শিকার হবে তা বলা মুশকিল। কেউ কেউ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে স্বাগত জানিয়েছেন; কিন্তু তারাও যে অনিরাপত্তার ফান্দে পড়ে বগা হয়ে কাঁদবেন না তার কোনো নিশ্চয়তা আছে কি?
বাংলাদেশে অনেক গুরুতর বিষয়েও এখনো কোনো আইন নেই। আবার ছোটখাটো বিষয়েও অনেক আইন আছে। আর এসব আইন রাষ্ট্রের সব মানুষের জন্যই করা হয়। ক্ষমতাসীনেরাও দেশের মানুষ, আমরাও (জনগণ) দেশের মানুষ। কিন্তু এ ধারণাকে পরিবর্তন করেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। কেননা, এ আইনের ধারাগুলো ক্ষমতাসীনদের অবারিত সুযোগ করে দেবে। সাধারণ জনগণকে ‘হাতে প্রাণ’ নিয়ে এ দেশে কথা বলতে হবে। দু’কথা ফেসবুকে লিখবেন তো পুলিশ আপনাকে, আমাকে, ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাবে। পুলিশকে সে সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। এ জন্য কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা লাগবে না। আর এতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ব্যাপক অপব্যবহার হবে তা এখনই বলা সম্ভব। আর যাদের শত্রু রয়েছে, সেই শত্রুরা এ আইনের সুযোগে সৎকেও জেলের ভাত খাইয়ে ছাড়বে। কী ভয়াবহ ব্যাপারই না হতে চলেছে বাংলাদেশে! হ
md.angkon12@gmail.com