‘মাছে ভাতে বাঙালি’ এ বিখ্যাত প্রবচনটি খাদ্য হিসেবে মাছের প্রতি আমাদের আকর্ষণ, প্রয়োজনীয়তা ও নির্ভরতার সূচক নির্দেশ করে। দেশের প্রাকৃতিক উৎসজাত এমন মাছ যেগুলো পূর্ণ বয়স্ক অবস্থায় সর্বোর্ধ্বে ৯ ইঞ্চি বা ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত আকারের হয়ে থাকে, সেগুলোকে দেশী ছোট মাছ বলে।
এ দেশের স্বাদুপানির ২৬০টি প্রজাতির মাছের মধ্যে বেশির ভাগই ছোট মাছ। তবে এর মধ্যে মাত্র ৫০ প্রজাতির ছোট মাছ কোনোরকমে টিকে আছে। বাকি সব মাছ প্রাকৃতিক আবাসস্থল ভরাট ও সঙ্কোচনসহ মনুষ্যসৃষ্ট নানা কারণে বিপদাপন্ন, বিপন্ন ও বিলুপ্তপ্রায়। দেশী ছোট মাছ সবার জন্য; বিশেষত, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য একটি সহজলভ্য পুষ্টির উৎস। ছোট মাছ উন্নতমানের প্রাণিজ আমিষ সরবরাহকারী। এ মাছে মানবদেহের জন্য উপকারী অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো অ্যাসিড আছে, যা দেহে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। এ মাছে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড রয়েছে, যা রক্তের অনুচক্রিকাকে জমাট বাঁধতে বাধা দেয় এবং ফুসফুসের প্রদাহ কমাতে সহায়তা করে।
ছোট মাছে কমবেশি প্রায় ৭২ শতাংশ পানি, ১৯ শতাংশ আমিষ, ৮ শতাংশ চর্বি, ০.১৫ শতাংশ ক্যালসিয়াম, ০.২৫ শতাংশ ফসফরাস এবং ০.১০ শতাংশ ভিটামিন এ, বি, সি ও ডি আছে। প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস থাকায় দৈহিক বৃদ্ধি, ক্ষয়পূরণ ও রোগ প্রতিরোধে ছোট মাছ অত্যন্ত কার্যকর। এটা অন্ধত্ব, রাতকানা, রক্তশূন্যতা, গলগণ্ড প্রভৃতি রোগ প্রতিরোধকারী। ছোট মাছের তেল কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি কমায়। গর্ভবতী, প্রসূতি ও দুগ্ধদানকারী মায়েদের রক্তশূন্যতা দূরীকরণে এ মাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভাবস্থায় শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধির (মস্তিষ্ক, চোখের গঠন, হাড় ও দাঁতের গঠন) জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। প্রচুর ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ বলে চোখের দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি এবং রাতকানা রোগ প্রতিরোধে সহায়ক।
ওজনানুপাতে সংখ্যায় বেশি হয় বলে ছোট মাছ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বণ্টনে সুবিধাজনক। ছোট ভাগায় বিক্রি হয় বলে স্বল্প আয়ের মানুষ কিনে পারিবারিক পুষ্টির চাহিদা মেটাতে পারে। ছোট, বড়, গভীর, অগভীর সবধরনের জলাশয় এমন মাছ চাষের উপযোগী।
ছোট মাছ অধিক ঘনত্বে এককভাবে চাষ করা যেমন লাভজনক, তেমনি রুই জাতীয় মাছের সাথে মিশ্রচাষ করাও লাভজনক। বিপন্নতার হাত থেকে দেশীয় মূল্যবান ছোট মাছ রক্ষার্থে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে তার মধ্যে ছোট মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও চাষের উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছোট মাছের কৃত্রিম প্রজনন নিয়ে সফল হয়েছেন, এমন বিজ্ঞানীদের মধ্যে নোবিপ্রবির শিক্ষক ড. শ্যামল কুমার পাল অন্যতম।
প্রতি বছরই মাছের জাত বিলুপ্ত হচ্ছে। এসব মাছের জাত সংরক্ষণের এখনই উদ্যোগ না নিলে বর্তমানের ২৬০ জাতের মিঠা পানির মাছও বিলুপ্ত হতে থাকবে। সবার উচিত আমাদের দেশীয় মাছ রক্ষায় এগিয়ে আসা এবং এর সংরক্ষণে সচেতনতা গড়ে তোলা। হ
লেখক : ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
