বাজারব্যবস্থার সাথে আমরা আমৃত্যু জড়িত। একটি শিশু জন্মের পর তার প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা থেকে শুরু করে একজন মানুষের মৃত্যুর পরও তার দাফনকার্য সম্পন্ন করার জন্য কিছু পণ্য কিনতে হয়। তাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমরা সবাই ক্রেতা। আমরা ক্রেতা হিসেবে যেসব বিক্রেতার কাছ থেকে পণ্য বা সেবা কিনি, সেসব বিক্রেতাও কোনো-না-কোনোভাবে ক্রেতা। যে ক্রয়-বিক্রয়ব্যবস্থা আমাদেরকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে, আমরা ক্রেতা হিসেবে সে সম্পর্কে কতটুকু সচেতন? ২০১৭ সালে একটি পত্রিকায় প্রকাশিত একটি কলামে আমেরিকায় নব্বইয়ের দশকের একটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়। ঘটনাটি এমন, ১৯৯৪ সালে ইসা লিসবেক নামের এক মার্কিন নারীর শরীরে ম্যাকডোনাল্ডসের ৫০ সেন্টের কফি পড়ে পুড়ে যাওয়ার ঘটনায় ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে ছয় লাখ ডলার। শুধু স্বাভাবিক তাপমাত্রা থেকে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কফি দেয়ার অভিযোগে এই জরিমানা। আমাদের দেশের ক্রেতাদের বিভিন্ন পণ্য কিনে প্রতারিত হওয়ার ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। ভেজাল পণ্য বিক্রয়, মিথ্যা বিজ্ঞাপন, পণ্যের গায়ে এমনভাবে শর্ত দেয়, যা চোখেই পড়ে না। মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রয়, পণ্যের গায়ে থাকা মূল্য কেটে অতিরিক্ত মূল্য সংযোজন করা বা অতিরিক্ত মূল্যে পণ্য বিক্রয়। এ ছাড়াও বিভিন্ন খাবার হোটেলে বাসি খাবার, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রস্তুতকৃত খাবার পরিবেশনসহ আরো অনেকভাবে প্রতারিত হয়ে থাকেন ক্রেতা বা ভোক্তারা। এতে ক্ষুণœ হচ্ছে ভোক্তা অধিকার। এর ফলে উন্নত জীবনযাত্রার মান ধরে রাখা সম্ভব নয়। এর জন্য ভোক্তা সচেতনতা আর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অভাব অনেকাংশে দায়ী। কিন্তু এভাবেই কি প্রতারিত হতে থাকব? অসচেতনতা থেকে মুক্তির জন্য দরকার ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে জানা।
ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে জানার আগে আমাদের জানতে হবে ভোক্তা কে বা কারা। জাতীয় ভোক্তা অধিকার আইন অনুযায়ী, যিনি সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করে বা সম্পূর্ণ বাকিতে পণ্য বা সেবা কেনেন অথবা আংশিক মূল্য পরিশোধ করে বা আংশিক বাকিতে পণ্য বা সেবা কেনেন অথবা কিস্তিতে পণ্য বা সেবা কেনেন অথবা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পণ্য কেনাবেচা করেন তিনি ভোক্তা। ভোক্তা অধিকার একটি মৌলিক অধিকার, যা কিনা সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৬ থেকে ৪৭ (ক)-এ নিশ্চিত করা আছে। সরকার ২০০৯ সালে ভোক্তা অধিকার আইন পাস করে। যেখানে খাদ্য, চিকিৎসা, পণ্য, ওষুধ ও সেবা খাতের ভোক্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। এ আইনের আওতায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন সরকারের একটি প্রাধিকার কর্মসূচি। এ আইনের অধীন ২০০৯ সালে Quasi Judiciary বা আধা বিচারিক সংস্থা হিসেবে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর প্রতিষ্ঠিত হয়। যারা আইনানুসারে সার্বক্ষণিক ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে থাকেন। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে জেলা ও অধীনস্থ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এই কাজগুলো করেন। দায়িত্বরত কর্মকতারা কিছু মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে অপরাধীদের বিচারকার্য পরিচালনা করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ করে থাকেন। ভোক্তা অধিকারবিরোধী কার্য বা অপরাধগুলো হলোÑ নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বা সেবা বেচাকেনার প্রস্তাব করা। জেনেশুনে ভেজাল পণ্য কেনাবেচার প্রস্তাব করা। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক কোনো নিষিদ্ধ দ্রব্য কোনো খাদ্যপণ্যের সাথে মেশানো ও বিক্রি করা। মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতাকে প্রতারিত করা। প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রয় ও সরবরাহ না করা। ওজনে, বাটখারা বা ওজন পরিমাপক যন্ত্রে কারচুপি করা। পরিমাপে, দৈর্ঘ্য পরিমাপক ফিতা বা অন্য কিছুতে কারচুপি করা। কোনো নকল পণ্য বা ওষুধ উৎপাদন করা। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি করা।
নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো কাজ করা, যাতে সেবাগ্রহীতার নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে। অবৈধ প্রক্রিয়ায় পণ্য উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাত করা। অবহেলা, দায়িত্বহীনভাবে সেবাগ্রহীতার অর্থ বা স্বাস্থ্যহানি ইত্যাদি ঘটানো। পণ্যের মোড়ক ব্যবহার না করা বা পণ্যের মোড়কের গায়ে খুচরা বিক্রয়মূল্য, মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ ইত্যাদি লেখা না থাকা।
আইনানুগ বাধ্যবাধকতা অমান্য করে দোকান বা প্রতিষ্ঠানের সহজে দৃশ্যমান কোনো স্থানে পণ্যের মূল্যতালিকা লটকিয়ে প্রদর্শন না করা। আইনানুগ বাধ্যবাধকতা অমান্য করে সেবার মূল্যতালিকা প্রদর্শন না করা। এগুলো ভোক্তা অধিকারবিরোধী কাজ। অধিকার সম্পর্কে জেনে বা না জেনে আমরা প্রায় সবাই উল্লিখিতভাবে প্রতারিত হয়েছি এবং প্রতিনিয়ত হচ্ছি। যারা নিজেরা ভোক্তা, কিন্তু ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে জানেন না, তারা নিজেদের সচেতনতার অভাবে প্রতারিত হচ্ছেন। কিন্তু যারা অধিকার সম্পর্কে জেনেও প্রতারিত হয়েছেন এবং হচ্ছেন, তার অন্যতম কারণ হলোÑ প্রতারকদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নেয়া। এবার আসি প্রতারিত হলে ভোক্তাদের কী করণীয়Ñ কোনো পণ্য বা সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতারিত সংক্ষুব্ধ ভোক্তা ভোক্তা অধিকার আইন ২০০৯-এর ধারা ৭৬ (১) অধীন এ অধিদফতরে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। অভিযোগের ভিত্তিতে সত্যতা প্রমাণিত হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় আদায় করা জরিমানার ২৫ শতাংশ অভিযোগকারীকে তাৎক্ষণিকভাবে দেয়া হয়। এই আইনের অধীনে সর্বনি¤œ ৫০ হাজার টাকা থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হয়। তাহলে বোঝা গেল, প্রতারিত ভোক্তা খরচের ভয়ে মামলা করবে না; এমন কোনো কারণ নেই।
কেননা, ভোক্তা অধিকার আইন এমন একটি নিয়ম রেখেছে, যেখানে মামলা করলে খরচ নয়; বরং আয় হয়। এখন আমরা যারা ভোক্তা, প্রতিনিয়ত নানা-কৌশলে প্রতারিত হচ্ছি, শুধু ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে জেনে একটু সচেতন হলেই আমরা এর মোকাবেলা করতে পারি। ফলে বিক্রেতারাও প্রতারণা করার সুযোগ পাবে না। প্রত্যেক মানুষের সচেতনতাই পারে উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করতে। হ
লেখক : শিক্ষার্থী, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়