একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়েছে। এতে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কতটুকু মজবুত ভিতে দাঁড়াবে; তা প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয়। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবীরা উন্নয়নের পক্ষে জনগণের রায়Ñ এমন কথা জোরেশোরে প্রচার করছেন। এটা অনস্বীকার্য, দেশে উন্নয়ন হয়েছে। তবে টেকসই উন্নয়নে এবারের নির্বাচন কতটুকু কার্যকর হবে, তা সামনের দিনগুলোতে তা স্পষ্ট হবে।
নির্বাচন নিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, এবারের নির্বাচন প্রমাণ করেছে, খালেদা জিয়ার ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। দেশে দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।
ড. কামাল হোসেন ও মির্জা ফখরুল ইসলাম ভোটবিপ্লব ও কেন্দ্র পাহারার ঘোষণা দিয়েছিলেন। পাহারা তো দূরের কথা, ঢাকা শহরের কেন্দ্রের কাছে তাদের কোনো নেতাকর্মী পাওয়া যায়নি। দূরদর্শী কৌশল, অর্থ আর পেশিশক্তির খেলা নির্বাচন। ঘরে বসে ভিডিও বার্তা দিয়ে আর যাই হোক, রাজনীতি চলে না। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক চালে বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্ট ধরাসায়ী। ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি নেতাদের দেখে এ কথা মনে হয়Ñ রোম যখন পুড়ছিল; নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। তেমনি সম্রাট নিরোর মতো দেশের মানুষ যখন তাদের ভোটাধিকার নিয়ে ভাবিত, বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট নেতাকর্মীরা তখন নিষ্ক্রিয় ছিলেন।
সারা দেশের ভোটের পরিস্থিতির ব্যাখ্যা করে সংবাদিকদের ড. কামাল হোসেন ক্ষোভের সাথে বলেন, স্বৈরাচার এরশাদের আমলেও এ রকম ভোট হয়নি। বিরোধীদের এজেন্ট দূরের কথা ভোটারদেরও কেন্দ্রে যেতে দেয়া হয়নি।
নির্বাচনে নৌকা আর ধানের শীষের প্রাপ্ত ভোটের পার্থক্য কি বিশ্বাসযোগ্য? ডিজিটাল যুগে অজপড়া গায়েও এখন ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে গেছে। মুহূর্তে যেকোনো সংবাদ পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের এপ্রন্ত থেকে ওপ্রান্তে। কে কি করছেন, বলছেন, তা আর গোপন থাকছে না। ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কি হয়েছে। তা দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট।
অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, প্রকৃতপক্ষে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়ে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়নি। সরকার হিসেবে শক্তিশালী হয়েছে মাত্র। এতে জিতেছে সরকার, হেরেছে বাংলাদেশ। পরাজিত হয়েছে জনগণ।
এদিকে নির্বাচনের ভোটগ্রহণ নিয়ে সন্তুষ্ট প্রকাশ করেছেন ভারত, চীন, নেপাল ও আইসি নির্বাচনী পর্যবেক্ষকেরা। তাদের বক্তব্য, সরকারি দলকে সন্তুষ্ট করলেও ভোটারদের সন্তুষ্ট করা আদৌ কি সম্ভব?
প্রধান নির্বাচন কমিশন নুরুল হুদা বলেছেন, ভোট নিয়ে তিনি তৃপ্ত সন্তুষ্ট। ভোটে কোনো অনিয়ম হয়নি। ভোটে তারা লজ্জিত নন, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে। সিইসির কাছে সাংবাদিকেরা জানতে চান, কেন্দ্রে ধানের শীষের কোনো এজেন্ট নেই কেন? জবাবে তিনি বলেন, ধানের শীষের এজেন্টরা কেন্দ্রে না এলে কী করার আছে। দায়িত্বশীল পদে থেকে সিইসির এমন বক্তব্য কারো কাছে কাক্সিক্ষত নয়।
অন্য দিকে, আওয়ামী লীগের ছাড় দেয়া ২২টি আসনে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। কৌতূহল উদ্দীপক হলোÑ যারা সরকারের সাথে সমঝোতা করে নির্বাচন করলেন, তারাই বর্তমান সংসদে বিরোধী দল।
প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, শক্তিশালী বিরোধী দল ছাড়া কী সরকারের জবাবদিহি থাকে? তা কি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা সুসংহত করবে? জবাব একটাইÑ গণতন্ত্রে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা অতি জরুরি। দুর্বল বা গৃহপালিত বিরোধী দল গণতন্ত্র বিকাশে অন্তরায়।
বাংলাদেশে গত এক দশকে এক ধরনের একটি ‘কর্তৃত্ববাদী’ শাসন ব্যবস্থার বিকাশ ঘটেছে। যা দেশে গণতান্ত্রিক ধারাকে হুমকিতে ফেলতে পারে, এমন শঙ্কা অনেকের। কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রের ক্ষমতার মূল উপাদানগুলো এমনভাবে বিন্যস্ত করা হয়, যাতে ক্ষমতাসীনদের দীর্ঘমেয়াদে শাসন ক্ষমতায় থাকার সহায়ক হয়। ফলে জনগণ সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়া থেকে আরো বিযুক্ত হয়ে পড়েন। গত একদশকে দেশের নাগরিকেরা আরো ক্ষমতাহীন হয়েছেন। দেশে রাজনীতিকে যেভাবে বিভাজিন করা হচ্ছে, তার মূল কারণ সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে না ওঠা। নির্বাচনের মাধ্যমে জনরায়ের প্রতিফলনে প্রাতিষ্ঠানিকতা তো দূরের কথা, বিকাশমান কোনো পথ এখনো নির্মিত হয়নি। হ
লেখক : সাংবাদিক