সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানবপাচারের ঘটনা চোখে পড়ার মতো। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, নানা প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে সাগরপথে মানবপাচারের দুঃসহ খবর। মানবপাচারকারীদের সহজ শিকার বেকার যুবক-নারীরা। যখন তারা মানবপাচারের কবলে পড়েন, তখন বুঝে উঠতে পারেন না যে তাদের ভবিষ্যৎ কী! যখন বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা অতিক্রম করা হয়, তখনই তাদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন-নিপীড়ন নেমে আসে। নির্যাতন-নিপীড়ন বন্ধের শর্ত হয়ে দাঁড়ায়Ñ পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়। সোজা কথায় কাজ না হলে মৃত্যুর ভয় দেখানো। অনেক সময় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয়। যখন এ নির্মম পরিস্থিতির বিষয়টি পরিবার জানতে পারে, তখন বাধ্য হয়ে তাদের পাচারচক্রের অ্যাজেন্টদের চাহিদা মতো অর্থ দিতে হয়।
জীবন বাঁচাতে মানুষ কিনা করে! জমিজমা, ভিটেমাটি বিক্রি করে মুক্তিপণ দিতে হয়। এত কিছুর পরও কেউ কেউ দেশে ফিরতে পারেন না। মানবপাচারের এ ধরনের ভয়ানক পরিস্থিতি সত্যিই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সেই নীতিকথা, ‘লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।’ প্রশ্ন হলো, এ লোভের পথে তাদের নিয়ে যাচ্ছে কারা? নিঃসন্দেহে বলা যায়, সারা দেশে মানবপাচারকারীদের একটি চক্র রয়েছে। যারা সারা দেশ বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এ চক্র সাধারণ মানুষকে বিদেশে শ্রমের প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করে থাকে। পাচার চক্রের শিকার কেবল বেকার যুবক, কিশোর ও নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের নানা লোভে নেয়া হয়ে থাকে। অনেক পর্যটকও এই চক্রের ফাঁদে পা দিচ্ছেন। আবার অপহরণ করেও নিয়ে যাচ্ছে অনেককে। উদ্দেশ্য মুক্তিপণ আদায়।
২০১৫ সালে জাতিসঙ্ঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর) বাংলাদেশী মানবপাচারের একটি তথ্য দিয়েছিল। প্রথম তিন মাসে ২৫ হাজার বাংলাদেশী পাচারের শিকার হন। তথ্যটি কী আঁতকে ওঠার মতো নয়? এ সময় মৃত্যু হয়েছিল ৩০০ জনের। তাদের বেশির ভাগ ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যান। মুক্তিপণ না পেয়ে অনেককে হত্যা করা হয়েছিল। ২০১৩ সালে থাইল্যান্ড ও মালেয়শিয়ায় বাংলাদেশীদের গণকবরের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। মানবপাচার নির্দিষ্ট মওসুম বা সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সব সময় মানবপাচার চক্র সক্রিয়।
অভাবের তাড়নায় পরিবারে সচ্ছলতা আনতে অবৈধ পথে ঝুঁকি নিয়ে বেকার তরুণেরা পাচারের শিকার হচ্ছেন। তাদের সাথে যুক্ত হচ্ছেন খেটে-খাওয়া সাধারণ মানুষ। সহজ-সরল এসব মানুষ ফাঁদে পড়ার আগে বুঝতেই পারেন না, তারা পাচারকারী চক্রের জালে বন্দী হচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে অসচ্ছলতা যেমন কাজ করছে, তেমনি সচেতনতারও অভাব রয়েছে। মানবপাচার রোধে গ্রামাঞ্চলে আর্থিক কর্মকাণ্ড এবং তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে সরকারকে বিশেষ নজর দেয়া ছাড়া ভিন্ন কোনো পথ নেই।
অভিযোগ রয়েছে, সীমান্তবর্তী অনেক জনপ্রতিনিধির পাচার চক্রের সাথে যোগসূত্র রয়েছে। উপকূলবর্তী ও সীমান্ত এলাকায় পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য না থাকায় পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো খুব একটা হয় না। ফলে স্থানীয় অনেক জনপ্রতিনিধি মাদক চোরাচালান, মানবপাচারের মতো কাজে জড়িয়ে পড়েন। সীমান্তবর্তী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংখ্যা বাড়ানোর মাধ্যমে মানবপাচার কমিয়ে আনা সম্ভব।
আমাদের দেশ থেকে যেসব দেশে মানবপাচার হচ্ছে ওইসব দেশের সাথে এ বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করে মানবপাচার রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এ বিষয়ের সুষ্ঠু সমাধানের সুযোগ এখনই তৈরি করতে হবে। মানবপাচার রোধে সীমান্তবর্তী দেশগুলোর জলসীমায় যেন এ দেশের প্রশাসন বিশেষ অভিযান চালাতে পারে, তার জন্য দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি সুনিশ্চিত করা যায় কিনা ভেবে দেখা যেতে পারে। শুধু তাই নয়, যেসব দেশের মানুষ মানবপাচারের সাথে জড়িত তাদের আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনতে জাতিসঙ্ঘ, সার্কসহ অন্য আঞ্চলিক সহযোগী সংস্থাগুলোর সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে। হ
লেখক : ফ্রিল্যান্সার
md.angkon12@gmail.com
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানবপাচারের ঘটনা চোখে পড়ার মতো। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, নানা প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে সাগরপথে মানবপাচারের দুঃসহ খবর। মানবপাচারকারীদের সহজ শিকার বেকার...
