অমর একুশে গ্রন্থমেলার আয়োজন থেকে শুরু করে সব কাজেই রয়েছে শুভ চিন্তার অফুরন্ত সমাহার। বইমেলার অপরিহার্য দুই সত্তা হচ্ছে প্রকাশক ও লেখক। তাদের মানস নিয়ে আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক হবে না বলে সবিনয়ে কয়েকটি কথা উপস্থাপন করাই আজকের এই কলাম লেখা।
প্রথমত, প্রকাশকদের কথাই বলা যাক। দীর্ঘ দিন ধরে অভিযোগ রয়েছে, আমাদের দেশের বেশির ভাগ প্রকাশক শুধু একুশে বইমেলাকে মুনাফা অর্জনের একটি মাধ্যম বলে মনে করেন। সাথে সাথে বঞ্চিত করেন লেখকদের। এ জন্য প্রকাশকরা সবসময় প্রকাশনাকে অলাভজনক খাত হিসেবে উপস্থাপন করতে পছন্দ করেন। কথাটি যে বেশির ভাগ সময় মতলবি, তা বলাই বাহুল্য। অথচ তারা বই প্রকাশ করছেন বছরের পর বছর ধরে। টিকে আছেন বহাল তবিয়তে।
প্রতিটি বই পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়া থেকে শুরু করে বই ছাপানো ও বিপণন প্রকাশকের আওতাধীন। তারা ইচ্ছে করলে কোনো নি¤œমানের বই পাঠকের কাছে অতি সহজে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারেন। করতে পারেন ব্যবসায় সফল। ইচ্ছে করলে মানসম্পন্ন কোনো বইয়ের বিপণন করতে পারেন ব্যর্থ। অনেক প্রকাশক নতুন লেখকের কাছে বই প্রকাশের নামে তুলে নেন মুনাফাসহ সব খরচ। আর টাকা নিয়ে কাঙাল হয়ে ঘোরেন প্রতিষ্ঠিত লেখকের দ্বারে দ্বারে। এরপর বই বিক্রি না হলেও প্রকাশকদের কোনো ক্ষতি নেই। যা বিক্রি হয়, তা প্রকাশকের জন্য সোনায় সোহাগা। লেখক থাকেন শূন্য হাতে। খাতা আর কলম নিয়ে। শেষ পর্যন্ত কয়েকটি ফটোসেশন আর অটোগ্রাফ দিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় বেচারা লেখককে। এতে বোঝা যায়, লেখকের লেখা আর বইয়ের মূল্যায়নের কোনো সঠিক মানদণ্ড আমাদের এখনো জানা নেই। অনেক সময় লেখা আর বই মূল্যায়নে আশ্রয় নেয়া হয় অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির।
এদিকে বেশির ভাগ লেখক চটকদার বই প্রকাশ করে সাময়িকভাবে পাঠককে মনোরঞ্জনে থাকেন সদা ব্যস্ত। তারাই সারা বছরই লেখেন ভূত, প্রেত আর দৈত্যদানবের গল্প। যার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত উদ্ভট। কোনো পরিশ্রমী পাঠকের চোখ এড়াবে না যে, বিষয়বস্তু হাস্যকর। ছোটদের বইয়ে এমন বেশি দেখা যায়। আর এতে চরমভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে শিশুমনে। অদূর ভবিষ্যতের বাস্তব জীবনের দিকনির্দেশনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে শিশুমানসে দানা বাঁধে অনীহা। এরপর বইমেলায় এসে তারা খুঁজতে থাকে দৈত্যদানব আর ভূত-পেতিœর বই। অনেক অভিভাবক এসব লেখককে আদর্শ গণ্য করে থাকেন। অথচ এসব লেখকই শিশুদের আদর্শ জীবন গড়ায় বিষফোঁড়া আর প্রতিবন্ধক হিসেবে শিশুর মনজগতে বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান। যার কারণে বাস্তবতার প্রতি শিশুরা থাকে বেখেয়াল। তাই বাস্তব জীবনের সূচনা পর্বেই তাদের জীবন বিনির্মাণে অভিভাবকদের পড়তে হয় বিপাকে।
অনেক প্রতিষ্ঠান এসব ভূত-পেতিœসর্বস্ব লেখকদের মূল্যায়ন বেশ গুরুত্বের সাথে। প্রত্যেক বছরই স্বর্ণপদক আর সব পুরস্কারের তকমা তাদের গলায় পরিয়ে দেয় ওই সব প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তারা যেসব বিষয়বস্তু নিয়ে শিশুদের আনন্দ দেয়ার চেষ্টা করেন, তা নিছক কল্পকথা ছাড়া আর কিছু নয়। যেখানে থাকে না বাস্তবতার ছোঁয়া।
যে মাতৃভাষার জন্য আত্মত্যাগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আমরা আজ বিশ্বব্যাপী পরিচিত। আর ভাষার মাস ঘিরে মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে যে গ্রন্থমেলার আয়োজন করা হয়; সেই মেলাকেন্দ্রিক বহু সেমিনারে কথায় কথায় বাংলা-ইংরেজির মিশেলে বক্তৃতা না করলে অনেক বিশিষ্টজনের মন ভরে না। এভাবে বলতে পেরে তারা তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন। ফলে নতুন প্রজন্ম নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি কতটুকু অনুপ্রাণিত হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা খুব বেশি অযৌক্তিক হবে কী? হ
লেখক : সাংবাদিক
অমর একুশে গ্রন্থমেলার আয়োজন থেকে শুরু করে সব কাজেই রয়েছে শুভ চিন্তার অফুরন্ত সমাহার। বইমেলার অপরিহার্য দুই সত্তা হচ্ছে প্রকাশক ও লেখক। তাদের মানস নিয়ে...
