উচ্চ আদালতের রায় ঘোষণায় আইনি বাধ্যবাধকতায় ২৮ বছর পর ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতাদের সাথে একাধিক বৈঠকে বসেছে। ওই বৈঠকে ছাত্র সংগঠনগুলোর কাছে লিখিত মতামত চাওয়া হয়। ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল কিন্তু পরিবেশ পরিষদে নেই এমন সংগঠন হিসেবে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের পক্ষ থেকেও ডাকসুর গঠনতন্ত্র ও নির্বাচনী আচরণবিধির বিষয়ে পরামর্শ দেয়া হয়। এই সংগঠন ২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সাথে দাবি আদায়ে সংগ্রাম করেছে। এ সংগঠনের শীর্ষ নেতারা ডাকসু নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন। ২৯ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় বেশির ভাগ ছাত্র সংগঠনের মতামত উপেক্ষা করে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তা ঢাবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, মূলত কোনো বিশেষ সংগঠনকে সুবিধা দিতে নেয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠেছে।
এতদিন পরিবেশ পরিষদের বৈঠকে নিয়মিত শিক্ষার্থীরা ভোটার এবং প্রার্থী হবেন, এ বিষয়ে সব সংগঠন একমত ছিল। ২১ জানুয়ারির পরিবেশ পরিষদের বৈঠকে একটি সংগঠনের শীর্ষ নেতা জানান, ভোটার এবং প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি বয়সের ফ্রেমে বাধাতে, যা তাদের সংগঠনে আছে। তখন সাংবাদিকেরা জানতে চান, হঠাৎ মত পরিবর্তন কেন? উত্তরে ওই ছাত্রনেতা বলেন, বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে। এ জন্য বিষয়টি তুলে ধরেছি। কিন্তু কোন দেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে, তা ওই নেতা বলতে পারেননি। এক সপ্তাহ পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় তার হুবহু সিদ্ধান্তই উঠে আসে। সুষ্ঠু আর গ্রহণযোগ্য ডাকসু নির্বাচনের বাধা হচ্ছেÑ ভোটার এবং প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে বয়সের সময়সীমা নির্ধারণ এবং হলে ভোটকেন্দ্র স্থাপন। এবারই প্রথম নেয়া হলো ডাকসুর ভোটার এবং প্রার্থী হতে সময়সীমার সিদ্ধান্ত।
যেসব শিক্ষার্থীর বয়সসীমা তফসিল ঘোষণার দিন পর্যন্ত ৩০ বছর অতিক্রম করেনি, তারাই ডাকসু নির্বাচনে ভোটার এবং প্রার্থী হতে পারবেন। এ নিয়ম আগে থাকলে মাহমুদুর রহমান মান্না কখনো ডাকসুর পরপর দুইবার ভিপি হতে পারতেন না। আর ডা: মুশতাক হোসেন কখনো ডাকসুর জিএস হতে পারতেন না। কারণ মাহমুদুর রহমান মান্না চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭২-৭৩ সালের জিএস ছিলেন। তিনি পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হয়ে ভিপি নির্বাচিত হন। অন্য দিকে ডা: মুশতাক হোসেন ছিলেন মেডিক্যালের ছাত্র। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগে ভর্তি হয়ে ১৯৮৯ সালে ডাকসুর জিএস নির্বাচিত হন।
এ ছাড়া যেসব ছাত্র খণ্ডকালীন চাকরিতে আছেন, তারাও ডাকসুর ভোটার হতে পারবেন না। ডাকসুর ভোটার এবং প্রার্থীর বয়সসীমা ৩০ হবে কি-না কিংবা এমফিলের শিক্ষার্থীরা ভোটার এবং প্রার্থী হতে পারবেন কি-না তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের ‘হ্যাঁ-না’ ভোট নেয়ার পদক্ষেপ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিলে তা হবে একটি যৌক্তিক পদক্ষেপ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে হলের সংখ্যা ১৯টি। দু-একটি ছাড়া বাকি হলগুলোতে কোনো নিয়ম মেনে শিক্ষার্থীদের কক্ষ বরাদ্দ দেয়া হয় না। বেশির ভাগ হলের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের হাতে। এসব হলে অনিয়মই নিয়ম। ছাত্রলীগের কথার বাইরে যাওয়ার সাহস ছাত্রদের তো দূরের কথা, স্বয়ং হল প্রশাসনের পর্যন্ত নেই। হল প্রশাসন কক্ষ বরাদ্দ দিলেও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা হল থেকে ওই সব শিক্ষার্থীকে বের করে দিয়ে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের বরাদ্দ দেন। এ ক্ষেত্রে সব বৈধ আবাসিক শিক্ষার্থীকে তাদের নিজ নিজ সিট ফেরত দেয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে।
ভোটকেন্দ্র হলে না করে একাডেমিক ভবনে করা উচিত। কারণ, হলের নিয়ন্ত্রণ প্রশাসনের হাতে নেই। ছাত্রলীগের হাতে। ছাত্রলীগকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো ক্ষমতা, সাহস, শক্তি আর সদিচ্ছা ঢাবি প্রশাসনের নেই। হলে বৈধ শিক্ষার্থীর চেয়ে অবৈধ, বহিরাগত ও অছাত্রের সংখ্যা বেশি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী চান একাডেমিক ভবনে ভোটকেন্দ্র হোক। ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল বেশির ভাগ ছাত্রসংগঠনই চায় হলের পরিবর্তে একাডেমিক ভবনে ভোটকেন্দ্র হোক। ১৯৭৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ডাকসু নির্বাচনে যে নজিরবিহীন ভোটডাকাতি হয়েছিল, এবারের ডাকসুর নির্বাচনে তার পুনরাবৃত্তি কেউ চান না। ডাকসু নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র হলে নাকি একাডেমিক ভবনে হবে; তা নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মতামতের ওপর ছেড়ে দেয়া উচিত। নিয়মিত শিক্ষার্থীরা হল এবং একাডেমিক ভবনের মধ্যে, যেখানে ভোট দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, সেখানে নিতে হ্যাঁ-না ভোটের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। হ
লেখক : ছাত্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যাল।
উচ্চ আদালতের রায় ঘোষণায় আইনি বাধ্যবাধকতায় ২৮ বছর পর ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল...
