বর্তমান সময়ে পৃথিবীর দেশে দেশে নারী নির্যাতনের হার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। শুধু আমাদের দেশ নয়, বিশ্বব্যাপী নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। এখন কোনো জায়গায় নিরাপদ নয় নারী। সভ্যতাদর্পী পাশ্চাত্যেও নারী আজ অনিরাপদ। নানাভাবে হচ্ছেন বঞ্চিত ও নিগৃহীত। বহু দেশে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও নারীর প্রতি যৌন হয়রানির খবর প্রচার হচ্ছে। জাতিসঙ্ঘের মতো প্রতিষ্ঠানে যেখানে দৃশ্যত নারীর প্রতি দেখানো হয় সমতার পরাকাষ্ঠা, সেখানেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার লালসার শিকার হচ্ছেন অনেক নারী কর্মী। সম্প্রতি এই বিশ্বসংস্থার অভ্যন্তরীণ এক জরিপে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়। আমাদের দেশে সংবাদপত্রে প্রায় প্রতিদিন ধর্ষণের তথা নারকীয় পন্থায় নারী নিপীড়নের খবর পাওয়া যায়। ফেনীর সোনাগাজীর নুসরাত জাহান রাফির সাম্প্রতিক সময়ে করুণ মৃত্যুর পর দেশজুড়ে চলছে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা। নারীর প্রতি সহিংসতাÑ একটির পর একটি ঘটনা, কোনোটারই যেন রাশ টানা হয় না।
গত পাঁচ বছরে (২০১৪-১৮) ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের অপচেষ্টা এবং ধর্ষণজনিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন অন্তত চার হাজার নারী ও শিশু। এ হিসাব দিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। ভুক্তভোগীদের মধ্যে যাদের বয়স জানা যায়, তাদের ৮৬ শতাংশই শিশু অথবা সদ্যতরুণী। ধর্ষণজনিত হত্যার শিকার নারীরাও প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হচ্ছেন তরুণী। এ দিকে পুলিশ সদর দফতরের হিসাবে, গত পাঁচ বছরে ১৯ হাজারের বেশি ধর্ষণের মামলা হয়েছে এ দেশে। ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ২০১৯ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত যৌন হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হন ২০১ জন নারী। তাদের মধ্যে মারা গেছেন ২৪ জন। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে যৌন হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হলেন ১৭৩ জন নারী এবং চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে হয়েছেন ২৮ জন। গত বছর যৌন হয়রানির শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন আটজন। গত তিন মাসে আত্মহত্যা করেছেন তিনজন। তবে প্রকৃত চিত্র আরো ভয়াবহ। লোকলজ্জার ভয়ে ধর্ষণের অনেক ঘটনা চেপে যান ভুক্তভোগী।
অ্যাকশন এইডের সর্বশেষ প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, যাত্রাপথে প্রায় ৮৮ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়, তাদের মধ্যে ৮৬ শতাংশ নারী গণপরিবহনে চালক ও সহকারীর দ্বারা হয়রানির শিকার হন। এ ছাড়া কর্মক্ষেত্রে প্রায় ৯৫ শতাংশ নারী এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ৯০ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়। সংবাদমাধ্যমে এসবের কিছু প্রকাশ পেলেও বেশির ভাগ ঘটনাই থেকে যাচ্ছে আড়ালে। যৌন হয়রানির বিষয়টি বর্তমানে এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, নারীরাও এটিকে স্বাভাবিকভাবে নিতে শুরু করেছেন। পথে চলতে গেলে যৌন হেনস্তা হতে হবে, মেনে নিয়েই নারীরা এখন পথে চলাচল করছেন।
আর যেসব ক্ষেত্রে নারীরা প্রতিবাদ করছেন কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা চাচ্ছেন, মামলা করছেন; সেসব ক্ষেত্রেও তারা কাক্সিক্ষত সহযোগিতা পাচ্ছেন না। আইন অনুযায়ী, ১৮০ দিনের মধ্যে রায় দেয়ার নিয়ম থাকলেও নানা কারণে মামলা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। কোনো কোনো মামলা চলে ১০-১৫ বছর। ২০০১ থেকে এখন পর্যন্ত যৌন নির্যাতনে দায়ের করা মামলার বিপরীতে রায় প্রকাশের হার মাত্র ৩ দশমিক ৬৬ ভাগ। সাজার হার দশমিক পাঁচ শূন্য ভাগ। একটি মামলার ক্ষেত্রে অগ্রগতি তত দিনই হয়; যত দিন বিষয়টি গণমাধ্যমে আলোচিত থাকে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ তনু হত্যা মামলা। এ ছাড়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অপরাধী অর্থ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে পার পেয়ে যাচ্ছে। এর ফলে ক্রমেই বাড়ছে ধর্ষণের মতো নারকীয় ঘটনা।
সব মিলিয়ে এখন দেশে নারীসমাজ ভয়াবহভাবে অনিরাপদ। ঘরের বাইরে তো বটেই, নারী এখন নিজের ঘরেও নিরাপদ নয়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চাইল্ড অ্যাডোলেসেন্ট অ্যান্ড ফ্যামিলি সাইকিয়াট্রির সহযোগী অধ্যাপক ডা: হেলাল উদ্দিন আহমেদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি চারজনের মধ্যে একজন কন্যাশিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়; যার মধ্যে ৭৫ ভাগ যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে পরিবারের ঘনিষ্ঠজন, বন্ধু বা আত্মীয়দের মাধ্যমে।
পর্যাপ্ত সুরক্ষার অভাব নারীর এগিয়ে চলার পথে বিরাট বাধা। নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের কাজটি বিরাট এক চ্যালেঞ্জ। এর উৎস পরিবার ও সমাজে বিদ্যমান নারীর প্রতি বৈষম্যের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে। মোকাবেলার জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও নিয়মিত কার্যক্রম প্রয়োজন। সরকারের সামনে বড় ও বহুমাত্রিক এক চ্যালেঞ্জের নাম নারী নির্যাতন। যৌন বা শারীরিক নির্যাতন, হয়রানি, হত্যা-অপহরণÑ এসবই নারীকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকিতে ফেলছে। এগুলোর প্রতিরোধ এবং প্রতিকার দু’টিই অপরিহার্য। সহিংসতা প্রতিরোধে সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি উন্নত করার লক্ষ্যে কাজ করা জরুরি। সমাজের মানসিকতা বদলে বিনিয়োগ দরকার। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে। রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজে নারীকে ব্যক্তি হিসেবে উপযুক্ত স্বীকৃতি ও সম্মান দিতে হবে। রাষ্ট্রকে এসব বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে দ্রুত স্থায়ী সমাধানের ব্যবস্থা করতে হবে। তবে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সবার অংশগ্রহণের বিকল্প নেই।
যৌন হয়রানি ও সহিংসতার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হচ্ছে। অনেক সময় রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার আশ্রয় নিয়ে কেউ যাতে যৌন বা অন্যবিধ হয়রানি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকে। যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন রোধে হাইকোর্টের রায়ের আলোকে আজো পূর্ণ আইন তৈরি করা হয়নি। এ বিষয়ে অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকে। যদি অবস্থার পরিবর্তন না হয়; তবে এক সময় হয়তো শিক্ষা, কর্মসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ কমে যাবে। এ জন্য আইনের আওতায় এনে দোষীদের কঠোর শাস্তি দেয়ার কোনো বিকল্প খোলা নেই। হ
লেখিকা : শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ
tannymony@gmail.com