‘তিতাস একটি নদীর নাম। তার কূলজোড়া জল, বুকভরা ঢেউ, প্রাণভরা উচ্ছ্বাস। স্বপ্নের ছন্দে সে বহিয়া যায়। ভোরের হাওয়ায় তার তন্দ্রা ভাঙ্গে, দিনের সূর্য তাকে তাতায়; রাতে চাঁদ ও তারারা তাকে নিয়া ঘুম পাড়াইতে বসে, কিন্তু পারে না।’ কথাগুলো ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের শুরুতে লিখেছিলেন লেখক ‘অদ্বৈত মল্লবর্মণ’। বাংলা সাহিত্যে নদীকেন্দ্রিক উপন্যাসে নিম্নবর্গ মানুষের আখ্যানসমৃদ্ধ ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ অসাধারণ একটি সাহিত্যকর্ম। এ উপন্যাসে গ্রামের দরিদ্র মালোশ্রেণীর লোকজনের দুঃখ-দুর্দশার কাহিনী ফুটিয়ে তুলেছেন ঔপন্যাসিক। পরবর্তীকালে এ উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়।
এই একটি উপন্যাস লিখে অদ্বৈত মল্লবর্মণ যেমন আকাশচুম্বী খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, তেমনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সেই তিতাস নদীর তীরে বড় গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হওয়ার সাথে সাথে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়। আর আনন্দ, উল্লাস, উচ্ছ্বাস ও আশার শঞ্চার করেছিল। পরবর্তীকালে একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে তিতাস গ্যাস সেবার মাধ্যমে জনগণের মাঝে আস্থার জায়গা দখল করে। প্রায় ৬৪ বর্গকিলোমিটার ব্যাপী বিস্তৃত তিতাস নদীর উপকূলে প্রাপ্ত বাংলাদেশের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্রগুলোর অন্যতম এটি। দেশের বিজ্ঞজনের মতামতের ভিত্তিতে তিতাস গ্যাসক্ষেত্র নামে পরিচিতি লাভ করে এটি।
সেই তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিকে আজ কিছু দুর্নীতিবাজ অপ্রতিরোধ্য ও উৎসবমুখর আখড়ায় পরিণত করেছে। দুর্নীতিতে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী এতই সিদ্ধহস্ত ও শেয়ানা যে, গ্যাস বিক্রি বেশি দেখিয়ে আত্মসাৎ করাসহ সিন্ডিকেট করে বিল-ভাউচারে ভুয়া সঙ্কেত দিয়ে অবৈধ গ্রাহকের কাছ থেকে বিল আদায় করে থাকেন। ভুয়া সঙ্কেত হওয়ায় সেগুলো তিতাসের ব্যাংক হিসাবে পোস্টিং এবং লেজারে এন্ট্রি করা হয় না।
দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে জিনজিরা, ফতুল্লা, সোনারগাঁও, নরসিংদী ও গাজীপুর, এই পাঁচ এলাকায় এক লাখ ১৮ হাজার ৪৫৫টি অবৈধ চুলা বা সংযোগ চিহ্নিত করা হয়। প্রতি মাসে প্রতি চুলা বাবদ ৬৫০ টাকা হারে ওই গ্যাসের দাম হয় ৯২ কোটি ৩৯ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। এর মধ্যে আবাসিকে ডাবল চুলা ও বাণিজ্যিক শ্রেণীর গ্রাহকসমেত টাকার সংখ্যা প্রতি মাসে ওই সংখ্যার দ্বিগুণ হবে। যার এক পয়সাও সরকারি কোষাগারে জমা হয় না। এটি হলো একটি দিক। এ ছাড়া দুদকের অনুসন্ধানে শিল্পকারখানা, আবাসিকের আরো বহু দুর্নীতির দিক বেরিয়ে এসেছে; যেখান থেকে প্রতি মাসে শত কোটি টাকা উসুল করলেও সরকারের হিসাবে জমা হয় না। বহু বছর ধরে চলে আসা এসব দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়-আশয় সরকারের সংশ্লিষ্টরাও জানেন না, বোঝেন না।
আমাদের দেশে ইতঃপূর্বে আমরা সোনার খাদক দেখেছি; দেখেছি পাহাড়, নদী, কয়লা, বনজঙ্গল, ব্যাংকসহ গ্যাস খাদক। ঠিক কবে থেকে যে দুর্নীতি দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে; তা হয়তো গবেষণার বিষয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশে উন্নয়নের প্রধান এবং একমাত্র অন্তরায় হলো দুর্নীতি। সরকারি বিভিন্ন খাতে দুর্নীতি এখন অপ্রতিরোধ্য। শান্তি, সুশাসন, সমৃদ্ধি বাংলাদেশে যেন সোনার হরিণ।
দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান তার অসহায়ত্বের কথা বলেছিলেন ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার পর। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তিনি নিজের অসহায়ত্বের কথা বলেননি। পরে সংবাদমাধ্যমে তিনি বলেন, ‘১০০ বা ৫০০ রাজনীতিবিদদের যদি জেলে ভরতে পারতাম, তাহলে বোধহয় আমি সফল হতাম।’ তার এমন উপলব্ধি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, তাহলে সেটি কেন করেননি তিনি? কেন তার হাত-পা বাঁধা ছিল?
সব সময়ই গ্যাসের নতুন সংযোগে বা অবৈধ সংযোগ বৈধ করতে আবেদন করলে তা সহজে অনুমোদন পায় না। অদৃশ্য হস্তক্ষেপে গ্যাসের সংযোগ দেয়া হয়, কিন্তু অবৈধ সংযোগ খুব কমই বন্ধ বা বৈধ করা হয়। এর কারণ হিসেবে দুদক বলছে, বৈধ সংযোগের ক্ষেত্রে চক্র অর্থ হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ পায় না। একটি অবৈধ সংযোগ নিতে তিতাসের কর্মচারীদের ৪৫-৬০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। এ কারণে তারা অবৈধ সংযোগকে বৈধ করতে আগ্রহী নন। ভ্রাম্যমাণ আদালত অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলেও রাতের অন্ধকারে সেটি অর্থের বিনিময়ে পুনঃসংযোগ দেয়া হয়।
দুদকের প্রতিবেদনের তথ্যে, তিতাস গ্যাসে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয় অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিতাসে ৬ শতাংশ সিস্টেম লস হয় অবৈধ সংযোগের কারণে। এটা কোনো সাধারণ খবর নয়। ৬ শতাংশই সিস্টেম লস অনেক বড় খবর। ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলোতে বিশেষ করে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নরসিংদী, জিনজিরা, ফতুল্লা, সোনারগাঁও, নারায়ণগঞ্জে বিপুল অবৈধ গ্যাসলাইন সংযোগের তথ্য পাওয়া যায়। গৃহস্থালির চেয়ে শিল্পেই বেশি অবৈধ সংযোগ রয়েছে।
এ ছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, শিল্প শ্রেণীর গ্রাহকদের কম মূল্যে গ্যাস-সংযোগ দেয়ার নিয়ম থাকায় অনেক সময় অর্থের বিনিময়ে বাণিজ্যিক শ্রেণীর গ্রাহক যেমনÑ হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বেকারি, সুপারশপ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানকে শিল্প শ্রেণীর গ্রাহক হিসেবে সংযোগ দেয়া হয়। এ জন্যই তিতাসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী দীর্ঘ দিন ধরে অর্থের বিনিময়ে শিল্প এলাকায় পোস্টিং নিয়ে থেকে খুব সহজেই সিন্ডিকেট গড়ে দুর্নীতি করেন। অবৈধ সংযোগের পাশাপাশি মিটার টেম্পারিংয়ের মাধ্যমেও অসাধু কর্মকর্তারা ঘুষের বিনিময়ে গ্রাহকের প্রকৃত বিল গোপন করে থাকেন। এভাবে কোম্পানির কোটি কোটি টাকা লোকসান হয়। এ বিষয়ে কোম্পানির তদারকির অভাব রয়েছে বলে দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়।
সচেতন মহলের অভিমত, জ্বালানি খাতে লাগামহীন দুর্নীতি বন্ধ না করে শুধু দাম বাড়ানো অনাকাক্সিক্ষত। গ্যাসের দাম না বাড়িয়ে প্রিপেইড মিটার লাগালে অপচয় যেমন বন্ধ হতো, তেমনি আয়ও বাড়ত বহুগুণ। তাই সবার আগে গ্যাস অপচয় বন্ধ ও গ্যাস কোম্পানির কর্মকর্তাদের যোগসাজশে চোরা লাইনের চোরাকারবারি বন্ধ করতে হবে। এসব দুর্নীতির ব্যাপারে কখনোই যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয় না। অথচ কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই সরকার গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে। জনগণের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি না থাকলে সরকার যা খুশি তা করতে পারে। প্রতিবারই গণশুনানিকালে প্রমাণিত হয়েছে, গ্যাসের দাম বাড়ানোর যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ নেই। গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আগে গ্রাহক, বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের মতামত নিতে গণশুনানির ব্যবস্থা যেমন আছে, তেমনি গণশুনানি দরকার জনগণের আয়-ব্যয়ের ওপরও।
সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতার যে ঘোষণা দিয়েছে, তিতাসে ওই ঘোষণা বাস্তবায়নে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে বহুমাত্রিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে। জড়িতদের ছাড় দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত শূন্য সহিষ্ণুতার নীতি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিকে কার্যকরভাবে অনুসরণ করতে হবে। বিভিন্ন অনিয়মের সাথে জড়িত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
এসব সমস্যা ছাড়াও দরপত্রে অনিয়ম করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ, মালামাল ক্রয়ে দুর্নীতি, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা কর্তৃক সার্বক্ষণিকভাবে কোম্পানির গাড়ি ব্যবহার, জরিমানা, সংশোধিত বিল ও জামানত আদায়ে গ্যাস বিপণন নীতিমালা অনুসরণ না করা ইত্যাদি তিতাসের দুর্নীতির বড় খাত। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি সম্পর্কিত বিষয়গুলো ইতঃপূর্বে দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক বিবৃতি, নিরীক্ষা ও অডিট প্রতিবেদন পর্যালোচনার ভিত্তিতে তিতাসের দুর্নীতির উৎস ও ক্ষেত্র চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধে এখনই যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।হ
abunoman1972@gmail.com
‘তিতাস একটি নদীর নাম। তার কূলজোড়া জল, বুকভরা ঢেউ, প্রাণভরা উচ্ছ্বাস। স্বপ্নের ছন্দে সে বহিয়া যায়। ভোরের হাওয়ায় তার তন্দ্রা ভাঙ্গে, দিনের সূর্য তাকে তাতায়;...
