পঞ্চগড়ে কারা হেফাজতে আইনজীবী পলাশ কুমার রায়ের অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। কারাগার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হিসেবে বিবেচিত। অথচ সেখানে কেরোসিন বা পেট্রল কিভাবে যেতে পারে, কিভাবে তা দিয়ে গায়ে আগুন দেয়া সম্ভব, তা যথাযথ তদন্ত করে রহস্য উদঘাটন করা অত্যন্ত জরুরি। সম্প্রতি হাইকোর্টের নির্দেশে বিচারবিভাগীয় তদন্তের কথা বলা হয়েছে। সবার প্রত্যাশা, তদন্তে প্রকৃত তথ্য বের হয়ে আসবে। জেলখানায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে আইনজীবীর অপমৃত্যুর ঘটনায় মানবাধিকারের লঙ্ঘন হয়েছে বলেই আমরা মনে করি। এ থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে ভবিষ্যতে আরো বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এটি হত্যা, নাকি আত্মহত্যা তা উদঘাটন করা জরুরি। যদি এটি আত্মহত্যা না হয়ে অন্য কিছু হয়, তা হলে যারা জড়িত তদন্তের মাধ্যমে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
তরুণ আইনজীবী পলাশকে গত ২৬ এপ্রিল বিকেলে ঢাকা পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু সকালে হঠাৎ একটি টয়লেট থেকে তিনি অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় দৌড়ে বের হন। এ সময় কারারক্ষীরা তাকে উদ্ধার করে তার শরীরের আগুন নেভান। ততক্ষণে তার শরীরের ৪৭ শতাংশ পুড়ে যায়। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পরদিনই তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। ৩০ এপ্রিল চিকিৎসাধীন মারা যান তিনি।
বলা হয়ে থাকে, কারাগার বন্দীদের আটক বা আবদ্ধ রাখার স্থান। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, কারাগারে আসামিরা এখন কতটা নিরাপত্তাহীন? কারাগারে প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কারণ, কারাগারের স্লোগান হচ্ছেÑ ‘রাখব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ।’ নিরাপদ জায়গায় কিভাবে একজন বন্দী অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান, তা বোধগম্য নয়। কারাগারকে বলা হয় অপরাধ সংশোধনাগার। এখানে অপরাধীদের অপরাধ সংশোধন করতে বিভিন্ন কর্মসূচি নেয়ার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ঠিক এর উল্টো।
আইন ব্যবসায় একটি সম্মানজনক পেশা। একজন আইনজীবী আদালতে আইন কর্মকর্তা এবং বিশেষ অধিকারপ্রাপ্ত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তাদের ভূমিকা অপরিসীম। একজন আইনজীবীর কর্মকাণ্ড, দৃষ্টান্ত ও আদর্শ সমাজের ওপর অনেক বেশি প্রভাব ফেলে।
কোনো আইনজীবী যখন মামলা পরিচালনা করেন, তখন তিনি বিশেষ সুবিধা নিরঙ্কুশ ভোগ করেন। যদি কোনো আইনজীবী বিশ্বস্ততার সাথে মামলা চলাকালে কোনো বিবৃতি দেন, সেজন্য তিনি দায়ী হবেন না। তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা দায়ের করা যাবে না।
দেশের ছোট কারাগারগুলোতে বন্দীদের জায়গা সঙ্কুলান না হওয়ায় দুর্র্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মীদের ঠাসাঠাসি করে থাকতে হচ্ছে। অতিরিক্ত বন্দীর চাপে কারাগারগুলো শুধু নিরাপত্তা ঝুঁকিতেই পড়েনি, সেখানকার সার্বিক পরিবেশও এখন অত্যন্ত নাজুক।
বিখ্যাত দার্শনিক মিশেল ফুকো তার ‘ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ’ বইয়ে অপরাধীদের শৃঙ্খলা, সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও দর্শন, অপরাধীর স্বাভাবিকীকরণ এবং নিয়ন্ত্রিত শরীরে রূপান্তরের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এর বাইরে সমাজবিজ্ঞানী আরভিং গফম্যান থেকে শুরু করে এ কালের ডেভিড গ্যারল্যান্ড পর্যন্ত অনেকে কারা সংস্কৃতি, শাস্তি দর্শন বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। বাংলাদেশে কারাগারে যেসব অপরাধীকে সাজা ভোগের জন্য পাঠানো হয়, তাদের দৃষ্টিভঙ্গির রূপান্তর, কর্মদক্ষতা তৈরি, নিয়মানুবর্তিতা, চরিত্র ও আচরণ সংশোধনের মাধ্যমে আলোর পথ দেখানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হ
লেখক : আইনজীবী, বংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
পঞ্চগড়ে কারা হেফাজতে আইনজীবী পলাশ কুমার রায়ের অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। কারাগার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হিসেবে বিবেচিত। অথচ সেখানে কেরোসিন বা পেট্রল কিভাবে যেতে...
