একসময় লেখকসমাজের সব আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতা এবং লিটলম্যাগ। সময়ের পরিক্রমায় সোশ্যাল মিডিয়া সেই অবস্থায় পরিবর্তন এনেছে। আগে লেখকসমাজের প্রতিবাদী অংশ লেখালেখি করে জেল-জুলুম-নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। এখনো সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখার কারণে অনেকেই জেল-জুলুমের শিকার হচ্ছেন। দেশে দেশে লেখকেরা সোশ্যাল মিডিয়ায় সাহিত্যকর্ম পোস্ট করছেন। কবিতা বা নিবন্ধ লিখে পোস্ট করায় অনেক কবি জেল খেটেছেন, নিগৃহীত হয়েছেন। বিভিন্ন দেশের আধিপত্যবাদী শক্তি নিজেদের হীনস্বার্থে সোশ্যাল মিডিয়া সাময়িকভাবে বন্ধ বা ব্যবহার সীমিত করছে।
কিছু দিন আগে ইসরাইলের একটি আদালত দেশটিতে বসবাসরত এক আরব কবিকে সহিংসতায় উসকানি দেয়া এবং ফেসবুকে কবিতা পোস্ট করার ‘অপরাধে’ দোষী সাব্যস্ত করেছেন। ৩৬ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি কবি দারিন তাতোর ২০১৫ সালে ফেসবুকে তিনটি পোস্ট দেন। এর মধ্যে একটি ছিল তার নিজের লেখা কবিতা ‘রেজিস্ট মাই পিপল, রেজিস্ট দেম’। বাংলা করলে দাঁড়ায়Ñ প্রতিরোধ করো, আমার জনগণ, ওদের প্রতিরোধ করো। কবিতাটি তিনি স্বকণ্ঠে আবৃত্তি করে ইসরাইলি দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের পাথর ছোড়ার একটি ভিডিও সংযুক্ত করে পোস্ট করেছেন। তখন থেকে এই তরুণী আরব কবিকে তেলআবিবের একটি ফ্ল্যাটে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। বন্দী অবস্থায় তাকে ফোন, ইন্টারনেট ব্যবহার করতে দেয়া হয়নি। কয়েক মাস আগে ইসরাইলের নাজারেথ জেলার একটি আদালত ‘ফেসবুকে কবিতা পোস্টের মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদ উসকে’ দেয়ার অভিযোগে কবি তাতোরকে নতুন করে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন। অনেক সাহিত্য সমালোচক ফিলিস্তিনের প্রখ্যাত কবি মাহমুদ দারবিশের প্রতিচ্ছায়া দেখছেন দারিন তাতোরের মধ্যে। ২০১৫ সালে ফেসবুকে পোস্ট করা তার কবিতাটি শৈল্পিক বিবেচনায় আরব বিশ্বে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কবিতাটি ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী সবার মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছে।
লেখকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘পিইএন’ ওই রায়ের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, ‘কবি দারিন তাতোরকে তার কবিতা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের কারণেই টার্গেট করা হয়েছে। তাতোর সেই কাজটাই করেছেন, যেটি লেখকরা প্রতিদিন করে থাকেন, আমরা প্রতিদিন আমাদের শব্দ দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ জানাই।’
কবি দারিন তাতোর তার কবিতা এমন সময় লিখেছেন, যখন জেরুসালেমে ইহুদিদের সাথে স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনিদের উত্তেজনা চলছিল। ইসরাইলি আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, ‘কবিতাটির বিষয়, এটি যে পরিবেশ-পরিস্থিতিতে প্রকাশ করা হয়েছে; তাতে সহিংসতার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।’ কবি দাবি করেছেন, ‘পুরো কবিতাটি ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। এখানে সহিংসতার কোনো ডাক নেই। এখানে সংগ্রামের কথা আছে, যাকে ‘সহিংসতা’ বলে ভুল বোঝানো হচ্ছে।’ কবিতাটিতে দারিন তাতোর নিজভূমে পরবাসী জনগণকে জাগরণের মন্ত্রে দীক্ষা দিয়ে জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন, ‘প্রতিরোধ করো/হে জনতা, প্রতিরোধ করো ওদের/প্রতিরোধ করো দখলদারদের দস্যুতা/এবং অনুসরণ করো শহীদদের কাফেলা।’ কবিতাটিতে বারবার উচ্চারিত হয়েছে, ‘রেজিস্ট মাই পিপল, রেজিস্ট দেম...’।
তার অন্য পোস্টে ছিল ইসরাইলি পুলিশের গুলিতে আহত এক ফিলিস্তিনি নারী, যার হাতে ধরা একটি ছুরি, এর ক্যাপশন ছিলÑ ‘আমিই পরবর্তী শহীদ।’
দখলদার ইসরাইলের আদালতে জোরপূর্বক দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর কবি দারিন তাতোর ইসরাইলের একটি সংবাদপত্রকে বলেন, ‘‘আমার বিচার ইসরাইলের মুখোশ খুলে দিয়েছে। সারা বিশ্ব এখন এ কাহিনী জানবে। তারা জানবে ইসরাইলের গণতন্ত্র আসলে কী! এটি কেবল ইহুদিদের গণতন্ত্র। এখানে আরবরাই শুধু জেলে যায়। আদালত বলেছেন- আমি সন্ত্রাসবাদের দোষে দোষী। যদি এটা সন্ত্রাসবাদ হয়, গোটা দুনিয়াকে আমার ‘সন্ত্রাসবাদী ভালোবাসা’ জানাই।’’
কয়েক দিন আগে আমাদের দেশে বরিশালে গ্রেফতার করা হয় কবি হেনরী স্বপনকে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি স্বধর্মের একজন ফাদারকে অপমান করে ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। স্বপন শ্রীলঙ্কায় অমানবিক হামলার সময় বরিশালের একটি গির্জায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রতিবাদ করে পোস্ট দিয়েছিলেন। এভাবে দেশে দেশে খড়গ নেমে আসছে কবিদের কলমের গর্দানে। তবুও থেমে নেই সাহিত্যকর্মীদের লেখনী। যেন ফিলিস্তিনি কবি দারিন তাতোরের চূড়ান্ত রায়ের মুহূর্তে তার জবান হতে বের হয়ে আসা কথাগুলো জীবন্ত, ‘লেখা অব্যাহত থাকবে। এমন কোনো আইন মেনে নেয়া যায় না, যা বলে দেবে আমি লেখায় কী শব্দ ব্যবহার করব, কী করব না। নিশ্চয় আমিই প্রথম বন্দী নই, আর শেষ বন্দীও নই।’
বাংলাভাষী সাহিত্যকর্মীরা নিজেদের সাহিত্যকর্ম সোশ্যাল মিডিয়াÑ বিশেষ করে ফেসবুকে প্রকাশ করা শুরু করেছেন। এখানে পাঠকসংখ্যাও অনেক। ছাপার বইয়ের চেয়ে সহজলভ্য হওয়ায় ক্ষেত্রবিশেষে তুমুল পাঠকপ্রিয়তা পাচ্ছে ফেসবুকের সাহিত্যকর্ম। এমনকি, এ সাহিত্যকর্ম সূত্রে পরিচয়ের সুবাদে গড়ে উঠছে সাহিত্য সংগঠন। এসব সংগঠন মূলধারার সংগঠনগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এমন ইতিবাচক কর্মকাণ্ড অদূরভবিষ্যতে একটি নতুন সাহিত্যবিপ্লবের সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে, যা হবে মানবতাবাদী। হ
লেখক : উপদেষ্টা সম্পাদক, ত্রৈমাসিক শব্দবাজ
একসময় লেখকসমাজের সব আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতা এবং লিটলম্যাগ। সময়ের পরিক্রমায় সোশ্যাল মিডিয়া সেই অবস্থায় পরিবর্তন এনেছে। আগে লেখকসমাজের প্রতিবাদী অংশ লেখালেখি করে...
