নারী নির্যাতন, নারীর ক্ষমতায়ন, নারী-পুরুষ সমান অধিকার এসব নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে এবং হচ্ছে। প্রতিটি বিষয়েরই বিস্তর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ নানা আঙ্গিকে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। ওই সব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ব্যক্তির পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ‘নারী নির্যাতন’ কথাটি শুনলেই কেমন একটি ধরপাকড় পরিস্থিতি মাথায় আসে। শব্দটির প্রকৃত অর্থ কেবল একজন নারীর পক্ষেই অনুধাবন করা সম্ভব। কারণ, অনাকাক্সিক্ষতভাবে আমাদের সমাজে মেয়েরা বহুমাত্রিক সমস্যার সম্মুখীন, যার কিছু দৃশ্যমান, কিছু দৃশ্যমান নয়। বর্তমানে যেকোনো নারী ঘর থেকে বের হলেই প্রতি মুহূর্তে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় থাকেন। এই নিরাত্তাহীনতা বলে বোঝানোর নয়। শরীর-মনে এমন নেতিবাচক প্রভাব সব সময় বয়ে বেড়ায় নারী।
আমাদের দেশে বাইরে নারীর সাথে ঘটে যাওয়া অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার কথা কোনো মেয়েই পারতপক্ষে বলতে চান না। পাছে চলাফেরার যে স্বাধীনতাটুকু আছে, তা-ও যদি চলে যায় এই ভয়ে। এই আশঙ্কায় ভীতসন্ত্রস্ত থাকে নারী। এমন ভয় তাকে তাড়া করে ফেরে প্রতিনিয়ত। এটিও কিন্তু এক ধরনের নির্যাতন। ঘরবন্দী হয়ে যাওয়ার ভয়ে বেশির ভাগ নারী নিজেই নিজেকে বন্দী রাখেন। আর একজন বন্দী ভাবাপন্ন মানুষ কী করে সমাজে উৎপাদনশীল কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করবেন? একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি বুঝতে সুবিধা হবে। শহরে যানবাহনে চলাচলের সময় যখন নারী-পুরুষ পাশাপাশি বসছেন, কখনো কখনো পুরুষ যাত্রী ইচ্ছাকৃতভাবে নারী যাত্রীর গা ঘেঁসে বসেন। নারীটি বুঝতে পেয়ে নড়েচড়ে বসলেও পুরুষটি তা আমলে নেন না। এ ক্ষেত্রে নারীকে নীরবে পিছিয়ে আসতে হয়। এ মনোভাব প্রত্যেক নারীর মনোজগতে ছোটবেলা থেকে আপনা থেকে কাজ করে। এটি একসময় বদ্ধমূল হয়ে যায়। তা পরবর্তী প্রজন্মেও পৌঁছে যায়। এটিই সমাজে একদল পুরুষের কাছে নির্যাতনের মওকা হিসেবে কাজ করে।
একটি মেয়ে কোন চাকরি করবেন, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন, এমনকি কোন বিষয় নিয়ে পড়বেন, তাও ঠিক করে তার পরিবার আর আত্মীয়স্বজনেরা। অনেকে আবার বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেয়েকে এখনো প্রাথমিক শিক্ষকের বাইরে ভাবতে পারেন না। এমন চাকরি মেয়েটির জন্য নিরাপদ মনে করেন তারা। কখনো বা মেয়েটি নিজেও এমনটি ভাবেন। এগুলোও এক ধরনের নির্যাতন। অনেক মেয়ে এখনো নিজের সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে নিতে পারেন না। তাহলে কী করে নারীসমাজ দেশের উৎপাদনশীলতায় অংশ নেবে?
২০১৮ সালে ব্র্যাকের এক প্রতিবেদন থেকে জানানো হয়, ৯৪ শতাংশ নারী পরিবহন বা বিভিন্ন যানবাহনে যৌন নিপীড়নের শিকার। তা ছাড়া কাজের জায়গায় নারীর প্রতি যৌন নির্যাতনের বিষয়টি প্রায় সব সময় থাকে উপেক্ষিত। একটি অনলাইন পত্রিকা থেকে জানা যায়, ধর্ষণের সংজ্ঞা ১৬০ বছর ধরে একই রয়ে গেছে। তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। আমরা অপরাধ দমনে কতটুকু বদ্ধপরিকর? এগুলো সংবিধান প্রদত্ত অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বেশির ভাগ ঘটনা আদালতে যাওয়ার আগে ধামাচাপা দেয়া হয় বা ঘটনা বিকৃত করে উপস্থাপন করা হয়।
সমাজে অপরাধের সুযোগগুলো খোলা রেখে নারীর ক্ষমতায়নের হাজার ব্যবস্থা করা হলেও আদৌ কি তার সুফল পাওয়া সম্ভব? নারীদের এ অদৃশ্য দুর্দশা থেকে বাঁচানোর জন্য এমন একটি আইন প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি, যা সমাজে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াতে সহায়ক হবে। কমিয়ে আনতে পারে নারীর প্রতি সহিংসতা। যাতে অপরাধীরা থাকে ভীতসন্ত্রস্ত।
আমরা সমান অধিকারের কথা বলি, যেটি বহুল আলোচিত একটি বিষয়। বিষয়টি ‘সমান দৃষ্টিভঙ্গির’ হওয়া উচিত। নারীর ঘরকন্নার কাজ সমাজিক উৎপাদনশীলতার অংশ। এটি গুরুত্বের সাথে নেয়া উচিত। তবে আমাদের দেশে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের ফলাফল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ক’জন মেয়ে আছেন ছেলেদের তুলনায়। সময় এসেছে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর, সাহস জোগানোর, সুযোগের সমতা আনার। তা হতে পারে লক্ষ্যমাত্রা, কৌশল আর সঠিক পথ উন্মুক্ত করার মাধ্যমে। ‘ছেলে মানুষ’, ‘মেয়ে মানুষ’ নয়, বরং মানুষ হিসেবে কিভাবে নিজের সন্তানকে গড়ে তোলা যায় তাই যেন আমরা জোরালোভাবে ভাবতে শিখি। ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদেরও দৃঢ় আর শক্ত মনোবল দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। ছেলে আর মেয়েকে সমানভাবে উৎপাদনশীলতার দিকেই এগিয়ে নিতে হবে। আমাদের একে অন্যের প্রতি মানুষ হিসেবে সহানুভূতিশীল হতে হবে। কান্না নয়, মানুষ হিসেবে ভালো থাকাই হয়ে উঠুক সব নারীর স্বাভাবিক প্রয়াস। নারী-পুরুষের মিলিত প্রচেষ্টাতেই বিনির্মিত হয় একটি কেটসই সমাজব্যবস্থা। হ
লেখক : শিক্ষার্থী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
নারী নির্যাতন, নারীর ক্ষমতায়ন, নারী-পুরুষ সমান অধিকার এসব নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে এবং হচ্ছে। প্রতিটি বিষয়েরই বিস্তর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ নানা আঙ্গিকে দেয়ার চেষ্টা করা হয়।...
