সাম্প্রতিক কয়েকটি সঙ্কটে টালমাটাল দেশ। অথচ ক্ষমতাবানেরা দায়বোধের উপলব্ধিই ভুলে গেছেন। দেশের সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যুর অধিকারটুকুও প্রায় অনুপস্থিত। ডেঙ্গুর ভয়াবহ ছোবলে বিধ্বস্ত দেশ। এতে মৃত্যুর তালিকা দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের দুর্দশা চরমে। গুম আর ক্রসফায়ারের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। খুন-ধর্ষণ ‘ডালভাত’। এ যেন এক পৈশাচিক বিকৃতি। আকছার ঘটছে এসব অনভিপ্রেত ঘটনাবলি। দেশে রোজ অপঘাতে মরছে মানুষ। দেশবাসীর জন্য নিরাপদ নয় খাদ্য, ওষুধ, সড়ক, নিরাপদ নয় কর্মস্থলও। পরিবেশও বিষাক্ত হচ্ছে। প্রতিদিন দেশের কোনো না কোনো পরিবারের কেউ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে। দুর্নীতির করাল গ্রাসে জাতি আজ জর্জরিত। ঋণের নামে ব্যাংকের টাকা লোপাট হওয়ায় ভেঙে পড়েছে দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড।
রাজধানী ঢাকায় দুই সিটি করপোরেশন ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবেলায় শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের নিন্দা সমালোচনায় ক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ। বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। কিন্তু হায়! সমস্যা যে তিমিরে ছিল এখনো সেই তিমিরেই । খুব শিগগিরই পরিত্রাণ মিলবে, তেমন ভরসা নেই। ডেঙ্গুর কারণে অনেক প্রবাসী যারা ঈদুল আজহায় দেশে আসার ভাবছিলেন করেছিলেন, তারা স্থগিত করেন তাদের দেশে আসা। একটা সময় ডেঙ্গু পরীক্ষার কিটস সঙ্কট দেখা দেয়। দাম বেড়ে যায় কীটনাশকসহ মশক নিধনের সাজ সরঞ্জামের। রাজধানী ঢাকার হাসপাতাল, ক্লিনিকে ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই’ অবস্থা ছিল। সব মিলিয়ে এখনো আতঙ্কগ্রস্ত রাজধানীবাসী।
এ দিকে গত ৩০ জুলাই জেনেভায় বাংলাদেশ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে গিয়ে নির্যাতনবিরোধী জাতিসঙ্ঘের কমিটি বলেছেÑ পুলিশের জন্য দায় মুক্তি থাকতে পারে না। একটি রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব থাকা উচিত নয়। নির্যাতন বা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন পুলিশ কমিশন থাকা প্রয়োজন। জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে নির্বাচিত ১০ জন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ নিয়ে এ কমিটি গঠিত। ওই কমিটির সভায় সরকারের অবস্থান তুলে ধরতে বাংলাদেশ থেকে ২৪ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল জেনেভা যায়। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ছিলেন দলনেতা। তিনি সেখানে দাবি করেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ক্রসফায়ারের ঘটনা কমে গেছে।
প্রথম দিনের সভায় জাতিসঙ্ঘ কমিটির চেয়ারম্যান বলেছেন, বাংলাদেশে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের অনেক অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে। নির্যাতনের জন্য নানা ধরনের অমানবিক পন্থা অবলম্বন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে লাঠিপেটা, ঝুলিয়ে রাখা, মুখে কাপড় বেঁধে পানি ঢালা, বৈদ্যুতিক শক দেয়া প্রভৃতি। চেয়ারম্যান আরো বলেছেন, কাউকে গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নিতে বিভিন্ন শর্ত পূরণে বাংলাদেশের আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু এসব নির্দেশনা আদালতের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন হয়নি। কেউ গ্রেফতারের আগে আহত হলে তার যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনভাবে তদন্তের ক্ষমতা থাকতে হবে। কমিশনের সদস্য নির্বাচন পদ্ধতিতে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। ২০১৭ সালের পর থেকে কমিশনের বাজেট বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাড়লে ও এখনো তা কাজের পরিধির তুলনায় অপ্রতুল। বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের তথ্যের জন্য এ কমিশন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যেসব চিঠি পাঠিয়েছে, তার জবাব পায়নি। তিনি বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি না থাকার কারণে অনেক সময় কারাগার পরিদর্শনে বাধা দেয়া হচ্ছে। এটি অযৌক্তিক। এ ধরনের পরিদর্শন কমিশনের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে।
জাতিসঙ্ঘের নির্যাতনবিরোধী সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য নির্যাতন বিরোধী কমিটির (কমিটি এগেইনস্ট টর্চার ক্যাট) কাছে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে একটি প্রতিবেদন দেয়া হয়। এতে সরকারের তরফে মানবাধিকার রক্ষায় নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরা হয়। বলা হয়Ñ মানবাধিকার রক্ষায় সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার আনা হয়েছে। নির্যাতনমূলক সব সহিংসতা নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি ক্যাটের কাছে বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর জোট মানবাধিকার ফোরাম একটি রিপোর্ট পেশ করে। তাতে বলা হয়Ñ ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মোট দুই হাজার ৮৮ জন মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। একই সাথে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গুম হয়েছেন ৫২৬ জন।
অন্য দিকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্দশা চরমে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বিপুলসংখ্যক মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশায় দিনাতিপাত করছেন। ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতার তাদের প্রতি জাতির মনোযোগ যতটা দেয়া উচিত ছিল, তা হয়ে ওঠেনি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে জাতিসঙ্ঘের দ্য নিডস অ্যাসেসমেন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ (এনএডবিউজি) একটি হিসাব দিয়েছে। বাংলাদেশের এবারের বন্যা জনিত ক্ষতির স্পষ্ট একটি চিত্র ফুটে উঠেছে ওই প্রতিবেদনে। সেই মূল্যায়নের হিসাব অনুসারে বন্যায় কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৮টি জেলা। প্রাণহানি ঘটেছে ১১৯ জনের। আক্রান্ত হয়েছেন ৭৬ লাখ মানুষ। গবাদিপশু ও পোলট্রির ক্ষতি ৭০৪ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরের সংখ্যা ৫ লাখ ৪৮ হাজার ৬৭১। পুরো ধ্বংস হয়ে গেছে ৩৪ হাজার ৭৩১টি বাড়ি। গৃহহীন মানুষের সংখ্যা তিন লাখ সাত হাজার ৩৯১ জন। সরকারের দায়িত্বশীলদের দায়িত্বের অভাবে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আহাজারি যেন দেখার কেউ নেই।
সব মিলিয়ে বলা চলে বর্তমান সরকার দেশের সমস্যা নিয়ে যত না পেরেশান, ব্যতিব্যস্ত নিজেদের গদি পাকাপোক্ত করতে। ফলে দেশবাসী আজ অসহায়। এমন অবস্থা থেকে কবে মুক্তি মিলবে না কেউ বলতে পারছেন না। হ