রকমারি শিক্ষার যুগে ফোটে কি মনুষ্যত্ব, নাকি পশুত্বের ফুল? দেশ উন্নয়নের জোয়ারে ভাসে, নাকি দুর্নীতির? পশুত্ব আর মনুষ্যত্বÑ এ দুটি শব্দ ভাবিয়ে তোলে আমাদের। পশুর মাঝেও নিয়মনীতি শৃঙ্খলা লক্ষণীয়, বর্তমানে সমাজে যা শিক্ষিত অনেকের মধ্যে অনুপস্থিত! দুর্নীতির ছোঁয়ায় উচ্চ ডিগ্রিধারীর মানবতা লোভের ক্রস ফায়ারে হয় ধরাশায়ী। প্রযুক্তির আলিঙ্গনে মাদকতার আবেগ সমুদ্রস্নান করে সময়ের ঝঙ্কারে। শিক্ষিত আর অশিক্ষিত নিয়েই ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ।
বলতে পারেন কোনো বিজ্ঞানী শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকলেও লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটিতে রসায়নশাস্ত্রে অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন? যিনি লাফিং গ্যাস আবিষ্কারের জন্য বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিত। এ গ্যাস এমন একটি নাইট্রাস অক্সাইড, যে-ই নাকে গন্ধ শুঁকবেন; তিনি আপনা আপনি খিলখিল করে হাসতে থাকবেন। এর আবিষ্কারক হামফ্রে ডেভি যিনি নিরাপদ বাতিরও আবিষ্কারক। অথচ কোনো স্কুল-কলেজে পড়ালেখা করার সুযোগ হয়নি তার।
এখন এমন এক যুগে আমরা চলমান বহমান, যা কি না প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার যুগ। পড়ালেখা ছাড়া গতি নেই, নিস্তার নেই! পড়ালেখা করার অর্থ নাকি মানুষ হওয়া। প্রশ্ন হচ্ছে, কিসের জন্য লেখাপড়া করা হয়? মানুষ হওয়ার জন্য? নাকি, রাজনীতিজীবী, দুর্নীতিবাজ বা ভালো চাকরি পাওয়ার প্রত্যাশায়? মানুষ হতে ক’জন পড়াশোনা করছেন? যারা করেন, তাদের মধ্যে যথেষ্ট মানবিক গুণাবলি কাজ করে; যা অন্যায় থেকে বিরত রাখে। অথচ এখন পড়াশোনার উদ্দেশ্য শুধু ব্যক্তি স্বার্থের দৌড়ে সফল হওয়া।
পাঠ্যপুস্তকে ভর করে চলছে শিক্ষাজীবন, সম্মান শ্রদ্ধা নীতিবোধ আদর্শ বিবেকের হাটে পুড়ে স্বার্থসাধনে তৎপর। শিক্ষিত আর মানুষ ভিন্নার্থক দুটো শব্দ। দুটো শব্দ এক অর্থে বিচার করে চলছি সবাই অহমিকার রঙে। যত উচ্চ ডিগ্রি তার তত কদর সমাজে। সত্যিই কি উচ্চ ডিগ্রিধারী প্রত্যেকে মানুষ? নাকি মানুষ নামে অন্য কিছু? যা মনুষ্যের বদলে পশুত্বের ভাব বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফুলেফেঁপে উঠে লোভাতুর চোখে কুৎসিত মন! শিক্ষিতদের মাঝেও যে পশুত্বের রূপ আছে; অশিক্ষিতদের মাঝেও যে মনুষ্যত্ব আছে, তা দেখার অবসরটুকু এখন আমাদের নেই।
কেন শিক্ষিতদের মাঝে নজিরবিহীন ঘটনা ঘটছে? দেশের শাসক, প্রশাসকদের অনেকেই এখন রক্ষক নামের ভক্ষক আর ধর্ষক। ফলে করা যায় রমরমা ক্যাসিনো ব্যবসায়। বেশ ধুমধামে অবৈধ ব্যবসায় সমাজ চক্ষুর অন্তরালে জেঁকে বসে। এ দিকে মানুষ গড়ার কারিগর ফেনী সোনাগাজী মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদৌল্লা যখন রিফাতকেও ছাড়েননি, আগুনে পুড়িয়ে মারেন! আজ এমন হাজারো শিক্ষার্থী যৌন হয়রানির শিকার খোদ শিক্ষকেরই কাছে। একজন শিক্ষক যদি যোগ্যতা ছাড়া টাকার জোরে শিক্ষকতার পদ বাগিয়ে নেন, তার কতটুকু আদর্শ থাকবে, কী নীতিবোধ থাকবে? তার ভাণ্ডে জ্ঞান না থাকলে কী শিক্ষা দেবেন শিক্ষার্থীদের? যা হওয়ার তাই হচ্ছে। অপকর্ম তো ঘটবেই। সেই সব শিক্ষক জড়িয়ে পড়ছেন খুন-ধর্ষণের মতো জঘন্য অপকর্মে। সমালোচনার ঝড় বইছে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে। বহু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুষ দুর্নীতি ছেয়ে গেছে। চলে ভর্তি জালিয়াতি।
মানুষ নামের শব্দটি যেন শিক্ষা নামের দুর্নীতির খেলাঘর হয়ে পড়েছে। তা না হলে দলে দলে বের হচ্ছে কেন শিক্ষিত অমানুষ? সব চাকরিপ্রত্যাশী দুর্নীতির আশ্রয়ে যদি চাকরি পান; সুনীতির জায়গা কোথায়? সেবা, শিক্ষা, ধর্ম, সাহিত্য রাজনীতি এমনকি দেশপ্রেমের নামেও আজ চলছে ব্যবসা। ভেজাল সবখানে। দুর্নীতি সবখানে। গরিব থেকে ধনী সবাই আজ ভেজালে পরিপূর্ণ। টাকার পাহাড় গড়তে দেশপ্রেম বিসর্জন দিয়ে, মানবসেবা ভুলে বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করার নাম আর যাই হোক মানুষ হওয়া নয়।
এ দিকে শিক্ষার নামে চার-পাঁচ বছরের শিশুর পিঠে এক গাদা বই চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে! এর শেষ কোথায়? আকাশ দেখার সময় নেই শিশুদের। সন্তানের বয়স তিন বা চার বছর হতে না হতেই স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হয়। শুরু হয় প্রাণপণ প্রতিযোগিতা। প্রথম হতে হবে। পেতে হবে বৃত্তি। ধাপে ধাপে এ প্লাস অর্জন। তীব্র প্রতিযোগিতায় শিশুরা প্রকৃতির আলিঙ্গনে আপন মনে বেড়ে উঠতে পারে না। পৃথিবীর সুষমা দু’চোখ ভরে উপভোগ করতে পরছে না। ঝরে যায় প্রতিভা শৈশবের উঠোনে। ভোর হতে রাত তাদের জগত কোচিং আর স্কুল। বেশির ভাগ বাবা-মা শিশুর হাতের ব্যাট-বল কেড়ে নিয়ে নিচ্ছেন অমানবিক চাপ। স্কুল বা কোচিং পাঠাচ্ছেনÑ দিচ্ছেন না তাদের চাওয়া পাওয়ার মূল্য। চাপের দৌড় তারুণ্যের নির্যাস শুষে খায়। এমন চাপে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটে। জীবনে যে শিক্ষার্থী ছবি আঁকেননি, অথচ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার নেশায় চারুকলায় ফরম পূরণ করেন। যিনি কখনো বিজ্ঞান ছাড়া ইতিহাস ছুঁয়েও দেখেননি তিনি ইতিহাসের ছাত্র। কারো ভীষণ শখ ছিল ক্রিকেটার হওয়া বা সায়েন্টিস্ট হওয়া, নানা সমস্যায় তা আর হয়ে ওঠা হয়নি।
বিধাতার সৃষ্টি শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ। তার কাজ সব জীবের প্রতি মমতার হাত বাড়িয়ে জগতের মঙ্গলে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা। শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে শ্রেষ্ঠ কিছু সৃষ্টি দরকার, যা দেশ ও পৃথিবীর সব মানুষের মঙ্গল বয়ে নিয়ে আসতে পারে। আর এ জন্য শুধু তথাকথিত শিক্ষা নয়, প্রয়োজন মনুষ্যত্বের আবাদ। যে মানুষ চিন্তা চেতনায় সাধনায় পৃথিবীকে আলোকিত করবে, আর অপরাধমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ে, সবার মুখে হাসি ফোটাবে, ভালোবাসার সেই তো প্রকৃত মানুষ! হ
লেখক : মানবাধিকার কর্মী
juijesmin2019@gmail.com