ডায়েরিটা খুব পুরোনো। ধূসর রঙে ঢাকা পড়েছে এর পুরোটা গাত্র। তবুও ভেতরের দু’চারটে পাতা মাঝেমধ্যে আমায় খুব করে ডাকে। ইচ্ছে জাগে সব ফেলে তখনই ছুটি ওদের পিছু পিছু। কিন্তু সময় সুযোগ হয়ে ওঠে না আর। আজকাল গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায়। স্মৃতিরা ওবেলায় খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ে আমাকে নিতে। আমি অবুঝ শিশুর মতো শূন্যে ওড়া এতটুকু স্মৃতি ঘুড়ির পেছনে ছুটি; যদিও অবশেষে দু’ফোঁটা অশ্রু নিয়েই ফিরে আসি।
সেই স্মৃতিগুলো আজো আমাকে কুরে কুরে খায়। স্কন্ধের মতো আঘাত দিয়ে যায় ইচ্ছেমতো। বাধা দেই না আমিও। স্মৃতিচাপা, পাথর আঁকা প্রচ্ছদটা সরিয়ে ভেতরের দুটো পাতা আজ তোমাদের সম্মুখে খুলে দিলাম। যদি কারো চোখে পরে পড়ে নিও। সাবানের শেষ রমজানের শুরুমাত্র। কদিন পরই মাদরাসা ছুটি হবে। হাতের আঙুলে দিন গুনছিল শাওন। দেখতে দেখতে চলে এলো মাগফিরাতের বিদায়ের পালা; ২০ রমজান। রাতেই সব কিছু গুছিয়ে নিচ্ছিল সবাই। এত আনন্দঘন গহনেও একফোঁটা আনন্দ আমাকে স্পষ্ট করেনি সেদিন। মাদরাসা থেকে আমার বাড়ি মাত্র ১০ মিনিটের পথ। ছুটি হলেই দু’জনে দিতাম ভোঁদৌড়। ঘুড়ির পিছে দৌড়ানো, পাখির বাসার ডিম চুরি। বৃষ্টিতে ভেঁজা, সাতার কাটা, পানিডুবি খেলা আর আম্মুর মিষ্ট বকা শুনাই ছিল শাওন আমার ও বেলার রুটিন।
আসর নামাজ পড়ে বের হতেই এক মুরব্বি বলাবলি করছিলেন ‘গজারিয়া বাজারে একটা গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। শুনলাম মাদরাসার এক ছাত্রের অবস্থা খুবই গুরুতর’। কথাটা শুনে চমকে গেলাম আমি! একটু এগিয়ে জানতে চাইলাম কার কী হয়েছে জানেন? মুরব্বি আর বেশি কিছুই বলতে পারলেন না। মাদরাসায় গিয়ে যে জানব, মাদরাসাও ফাঁকা। থাকলেও হাতে গোনা দু’চারজন। তবুও এতটুকু ভরসা নিয়েই মাদরাসায় গেলাম। তাদের কাছে জানলাম না জানা কথাগুলো।
হঠাৎ যেন বিকেলটা ঢাকা পড়ে গেল নিষ্ঠুর নিয়তির পায়ে। কারো চিত্তে তখনো আঁকেনি এতটুকু সাঁঝবাতি। ঠিক এমনই সময় হাঁটতে হাঁটতে শাওনদের বাড়ির কাছে গিয়ে পৌঁছালাম। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল বাড়িভর্তি লোকের ভিড়। ভেতরটা তখনই নাড়া দিয়ে উঠল; আর একটু সামনে এগুতেই কান্নার আওয়াজ আর মুয়াজ্জিনের আজান ভেসে এলো; দুঃখের নোনাজলে সারা হলো ইফতারি।
আমাকে দেখেই শাওনের ছোট্ট বোন মায়া দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে চিৎকার শুরু করল। সন্তান হারা মা আর ভাই হারা বোনের হৃদয়ফাঁটা কান্না দেখে আমিও চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। গভীর অতলে তলিয়ে গেল সান্ত্বনার সব শব্দ। চোখের পানি মুছতে মুছতে মায়াকে নিয়ে নতুন কবরটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া