কোটি কোটি ফুটবল ভক্ত-অনুরাগী মাতাতে, আনন্দে ভাসাতে শুরু হয়েছে রাশিয়া বিশ^কাপ ২০১৮-এর জমজমাট আসর। ফুটবল-জ্বরে কাঁপছে দুনিয়া, পিছিয়ে নেই আমাদের দেশও। ফুটবল দুনিয়ায় কে ফেবারিট দল আর কে হবে চ্যাম্পিয়ন এ নিয়ে চলছে চুলচেড়া বিশ্লেষণ। হিসাব মেলাতে আমাদের দেশের ফুটবলের সমর্থকেরা দিন-রাত একাকার করে ফেলেছেন। চায়ের স্টল থেকে শুরু করে মাঠঘাট, লঞ্চ, বাস ও ট্রেন কোথায় নেই ফুটবলের আলোচনা কিংবা সমালোচনা। প্রতি চার বছর পরপর বিশ^কাপের আয়োজনকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশে চলে ব্যাপক প্রস্তুতি। এ বছরও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বিশ^কাপ শুরুর অন্তত এক মাস আগে থেকেই প্রিয় দলের পতাকা উড়ানো, জার্সি কেনা আর প্রিয় তারকার ছবিসংবলিত ব্যানার-ফেস্টুন বানানোর প্রতিযোগিতা। দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রজেক্টরের মাধ্যমে বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন বাড়তি নজর কাড়ছে সবার। প্রত্যেক পাড়া-মহল্লায় গড়ে উঠেছে শীর্ষে থাকা দলগুলোর গ্রুপ। একটি গ্রুপে ২০-৩০ জনের দল নিয়ে চলছে দলের পক্ষে প্রচার-প্রচারণা। কে কতজন নিয়ে সমর্থন তৈরি করতে পারে এ নিয়েও চলছে তোড়জোড়। দোহার উপজেলার ইউসুফপুর খাড়াকান্দা এলাকার ব্রাজিল সমর্থকদের নিয়ে একটি গ্রুপ করা হয়েছে। বিশ^কাপে প্রতিটি খেলা একসাথে দেখে এবং হইহুল্লোড়ে মেতে ওঠে। এমন দৃশ্য অন্য পক্ষের সমর্থদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে।
আপনি ব্রাজিল না আর্জেন্টিনা দলের সমর্থক এ প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে বারবার। এমন কোনো রাস্তাঘাট কিংবা অলিগলি বাদ নেই যেখানে চোখে পড়ে না বিদেশী ফুটবল দলের পতাকা। নির্মাণ করা হচ্ছে তোরণ। বাড়ির ছাদ, যানবাহন, বাস-লঞ্চ টার্মিনাল ও অফিস পাড়ায় কোথায় নেই পতাকা।
একদলের সমর্থকেরা প্রতিপক্ষের সমর্থকদের ঘায়েল করার জন্য রীতিমতো অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমেছে। কেউ কাউকে তিল পরিমাণ ছাড় দিচ্ছে না। একই ছাদের নিচে বসবাস করেও কেউ ব্রাজিল দলের সমর্থক আবার কেউ আর্জেন্টিনা দলের সমর্থক। দাদা করছে একদল আর নাতি করছে অন্য দল এমনও অসংখ্য পরিবার রয়েছে। বিশ^কাপ ফুটবলে আটটি গ্রুপে মোট ৩২টি দল অংশ নিলেও এক কথায় একচেটিয়া সমর্থক রয়েছে ল্যাটিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনার। নারী সমর্থকসহ সব পেশায় কমবেশি আর্জেন্টিনার সমর্থক রয়েছে। এরপরই রয়েছে কিংবদন্তি ফুটবলার কালো মানিক খ্যাত ফুটবলের রাজা পেলের দেশ ব্রাজিল। পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের সমর্থকেরা দলের স্ট্রাইকার নেইমার বলতে বলতে গলা ফাটিয়ে ফেলছেন। অন্য দিকে, আর্জেন্টাইন স্ট্র্র্রাইকার কয়েক বছর ধরে ভালো খেলার সুবাদে লিওনেল মেসিকে নিয়ে চলছে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের মধ্যে টানটান উত্তেজনা। এবারের বিশ^কাপে বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশ অংশগ্রহণ করায় দলগুলোর প্রতি নৈতিক সমর্থন রয়েছে এবারের বিশ^কাপ ফুটবলে। রয়েছে এশিয়ার দলগুলোর প্রতি বাড়তি নজর। এশিয়ার দলগুলো বিশ^কাপে ভালো করতে পারলে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার অন্ধভক্ততা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে বলে অনেকেই মনে করেন।
বিশ^কাপ ফুটবলের আসরকে কেন্দ্র করে এক মাস আগে থেকেই ক্রীড়াসামগ্রীর দোকানগুলোতে বেচাবিক্রি বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন দোকানিরা। বিশেষ করে, পতুগাল, জার্মানি, স্পেন, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সি বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি ফুটবল ও পতাকা বিক্রি হচ্ছে ধুমছে। যা বছরের অন্য সময়ের তুলনায় বিক্রি বেশি বলে জানান বিক্রেতারা। রাজধানীর গুলিস্তানে মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামে ক্রীড়াসামগ্রীর দোকানগুলোতে বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সারা বছর কমবেশি বিক্রি হলেও ফুটবল বিশ^কাপকে সামনে রেখে ভালো বেচাকেনা হচ্ছে। কেবল রাজধানীই নয়, প্রিয় ফুটবল দলের পতাকা আর জার্সি পৌঁছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। ভ্রাম্যমাণ ফেরিওয়ালা ঘুরে ঘুরে বিক্রি করছেন জার্সি, পতাকা, স্টিকারসহ নানা উপকরণ। মওসুমি ব্যবসা করে অনেকে ভালো আছেন। দেশের কোটি কোটি ফুটবলভক্ত উন্মাদনায় মাতোয়ারা। খেলছে ৩২টি দল, কিন্তু কোটি কোটি ভক্ত-সমর্থক নেচে-গেয়ে আনন্দ প্রকাশ করছেন। সারা দেশের ফুটবলপ্রেমীরা প্রিয় দলের পতাকা গাছের ডালে, রাস্তায় আড়াআড়ি ও বাড়ির ছাদে উড়িয়েছেন। বিশ্ব ফুটবলে বাংলাদেশ পেছনের সারিতে থাকলেও সমর্থকদের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান সামনের কাতারে। ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোর তুলনায় তৃতীয় বিশ্বের এই বাংলাদেশে বিশ্বকাপ উত্তেজনা বেশিই বলা চলে। ২১১টি দেশের মধ্যে ফিফা র্যাংকিংয়ে মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৯৭তম। তবুও বাংলাদেশে বিশ্বকাপ ফুটবলের উত্তেজনা তুঙ্গে। গত বিশ^কাপে জার্মানির এক সমর্থক নিজের কৃষি জমি বিক্রি করে সবচেয়ে বড় পতাকা বানিয়ে আলোচনার শীর্ষে উঠেছেন। এবারে তিনি জার্মানির সবচেয়ে বড় পতাকা বানিয়েছেন। এমনিভাবে দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় ১০০-১৫০ গজ কাপড়ের পতাকা উড়ছে।
এ বছর বিশ^কাপে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় জয়নাল আবেদিন টুটুল নিজের ছয় তলা বাড়ি পুরোটাই ব্রাজিলের পতাকার রঙে রঙ করিয়েছেন। এ ঘটনা সারা দেশের মানুষের নজর কেড়েছে। অন্য দিকে, বরিশাল সিটির জামাল মিয়ার বাড়ি আর্জেন্টিনা বাড়ি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। কারণ, বাড়িটি আর্জেন্টিনার পতাকার আদলে রঙ করা হয়েছে। এমন হাজারো অদ্ভুত অদ্ভুত ঘটনা বা পাগলামি ঘটছে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা নিয়ে। টাঙ্গাইল উপজেলার সখীপুর উপজেলায় ব্রাজিলের এক সমর্থক পতাকা টানাতে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে মৃত্যুবরণ করেছে। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলায় রোববার বিশ^কাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত আটজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গত কয়েকটি বিশ^কাপ আসরকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশে একাধিক ভক্ত-সমর্থক প্রাণ হারিয়েছে।
প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। প্রথমে তর্ক, একপর্যায়ে জড়িয়ে যাচ্ছেন মামামারিতে। খেলা নিয়ে সারা দেশে চলছে জমজমাট জুয়া। জুয়া খেলার টাকা নিয়ে হচ্ছে সংঘর্ষ এমন সংবাদপত্র পত্রিকায় উঠে আসছে। এ ধরনের ঘটনা কাম্য নয়, তবুও ঘটছে অনাকাক্সিক্ষত এসব ঘটনা।
তবে আসল কথা হলোÑ পৃথিবীর যেকোনো দেশের সমর্থকদের চেয়ে আমাদের দেশে কৌতূহল একটু বেশি। বিশ^কাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে কী না হয় আমাদের দেশে। প্রিয় তারকার ছবিসংবলিত ফেস্টুন-ব্যানার আর বিদেশী পতাকায় ছেয়ে যায় আকাশ। বিশ^কাপ ফুটবলের প্রথম আসর ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে শুরু হলেও নব্বইয়ের দশকের পর থেকেই আমাদের দেশের সমর্থকেরা প্রিয় দলের পতাকা ও প্রিয় তারকার ছবি এঁকে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন। প্রযুক্তির পরির্বতনের সাথে সাথে বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে চলছে বিশ^কাপ ফুটবল নিয়ে নানা ধরনের প্রচার-প্রচারণা, সেই সাথে মন্তব্য তো থাকছেই।
প্রায় ১৬ হাজার কিলোমিটার দূরের দেশ ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সমর্থনে বাংলাদেশের ফুটবল দর্শকদের উন্মাদনাকে নিছক পাপলামি ছাড়া কিছুই দেখছেন না অনেকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রিকেটের মতো যদি বাংলাদেশ বিশ^কাপ ফুটবলে অংশ নিতে পারত, তাহলে নিজের দেশকে নিয়ে মাতোয়ারা থাকত সবাই। তার পরও এশিয়ার কোনো দেশ খেলার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলে বড় একটি সমর্থক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ ফুটবলক যাতে আগামীতে এগিয়ে যেতে পারে সেজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ফুটবল দর্শকদের কথা বিবেচনা করে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের ফুটবল উন্নয়নে আরো মনোযোগী হওয়া দরকার।