বাঙালির জাতীয় জীবনে পয়লা বৈশাখ এক অন্যরকম আবেদন নিয়ে হাজির হয়। সর্বশ্রেষ্ঠ মোগল সম্র্রাট আকবর খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য নতুন যে সন প্রবর্তন করেছিলেন, তা আজ আমাদের জীবনে গভীরভাবে রেখাপাত করে চলেছে। পূর্বে নতুন বছরের শুরুতে বকেয়া আদায় করার জন্য দোকানগুলোতে হালখাতার ব্যবস্থা করা হতো। এ ছাড়া কোথাও কোথাও বসত বৈশাখী মেলা। মেলাকে কেন্দ্র করে আয়োজন করা হতো বিভিন্ন গ্রামীণ খেলাধুলার। এসব অনুষ্ঠানে গ্রামের মানুষেরা ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে একসাথে আনন্দ উপভোগ করত। ধীরে ধীরে সময়ে বিবর্তনের সাথে সাথে বৈশাখী অনুষ্ঠান পালনে নতুনত্ব এসেছে। মানুষ এখন শুধু আর হালখাতা কিংবা বৈশাখী মেলায় গিয়েই সন্তুষ্ট হতে পারছে না। এর সাথে যোগ হয়েছে পান্তা-ইলিশ, মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ ভিন্নধর্মী নানা কিছু। যদিও এসব অনুষ্ঠানের সাথে বৈশাখ পালনের তেমন একটা সম্পর্ক নেই বলেই গবেষকেরা মনে করেন।
আমাদের জাতীয় জীবনের সাথে যেহেতু বৈশাখের সংযোগ অত্যন্ত গভীর, তাই আমরা এই উৎসবে অংশ নিয়ে থাকি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সবচেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছি যে সংগঠনের সাথে সেটি হলো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের শাখা পাঠচক্র। বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের সেরা বইগুলো পাঠ করার পাশাপাশি পাঠকদের কাছে আমরা এসব বই পৌঁছে দেয়ারও ব্যবস্থা করি। যেহেতু আমাদের পক্ষে সারা বছর এই কাজটি করা সম্ভব হয় না, তাই বছরের একটা নির্দিষ্ট দিনে আমরা বই উৎসবের মাধ্যমে পাঠকদের কাছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইগুলো পৌঁছে দিতে চেষ্টা করি। আর এই সময়টা হলো পয়লা বৈশাখ।
প্রতি বছর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের শাখা পাঠচক্র রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিরাজী ভবনের সামনে আয়োজন করে বই উৎসবের। এবারের পয়লা বৈশাখটাও এর ব্যতিক্রম ছিল না। গত বছর অসুস্থ থাকার কারণে এই উৎসবে থাকতে না পেরে আক্ষেপ করেছিলাম। এবার যেহেতু সুযোগটা সামনেই ছিল, তাই লুফে নিতে বিলম্ব হয়নি একটুও। বরং আমি নিজে দায়িত্ব নিয়ে এখানে কাজ করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। বই উৎসবের কিছু দিন আগেই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে বই পাঠানো হয়। সেই বইগুলো গিয়ে কুরিয়ার অফিস থেকে ছাড়িয়ে আনা, বইগুলো ঠিক আছে কিনা মিলিয়ে দেখাÑ এসব কাজ করতে অন্যরকম একটা ভালো লাগা কাজ করে। আবার শুধু যে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই দিয়েই আমাদের কাজ চলে তেমনটা নয়। বাজার থেকেও কিছু প্রচলিত বই নিয়ে আসতে হয়। একজন পাঠকও যেন বই না পেয়ে মন খারাপ করে চলে না যায়, আমাদের লক্ষ্য থাকে সেদিকে।
বই উৎসবের আনুষঙ্গিক কাজগুলো করার পাশাপাশি এবার স্টলেও বসেছিলাম বই বিক্রি করতে। কী অসাধারণ একটা অনুভূতি যে কাজ করে সেটা বলে বোঝানোর সাধ্য নেই। আমি বিশ্বাস করি, জগতে সবচেয়ে আনন্দ যদি থাকে কোনো কিছু বিক্রি করে, তাহলে সেটা হলো বই। একজন পাঠকের হাতে তার পছন্দের বই তুলে দিতে পারার চেয়ে আনন্দের আর কিছু হতে পারে না। সাধারণত পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে এমন বই উৎসব দেশের আর কোথাও তেমন একটা হয় না। আমাদের এই কাণ্ড দেখে অনেকেই মন্তব্য করেছিলেন, পয়লা বৈশাখে বই কিনবে কোন্ পাগলে? কিন্তু বিশ্বাস করুন, কিছু বইপাগল মানুষ চিরদিনই থাকেন, যারা যখনই সুযোগ পান পছন্দের বইটা কিনে ফেলেন।
পয়লা বৈশাখের দিনে বই উৎসব করার চিন্তা কেমন করে আমাদের পূর্বসূরিদের মনে প্রবেশ করেছিল, সেটা আমার জানা নেই। তবে তারা যে অসাধারণ একটা কাজের সূচনা করে গিয়েছিলেন তাতে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এই দিনে অনেকে অনেক রকম কর্ম সম্পাদন করে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে বাহারি রকমের স্টল দেখা যায়। কিন্তু বইয়ের স্টল দেয়ার চিন্তাÑ সত্যিই অভিনব! বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে দু’বার এমন উৎসবে থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আমি একটা বিষয় খেয়াল করে দেখেছি, আমাদের কাছ থেকে বই কেনার জন্য কিছু মানুষ মুখিয়ে থাকেন। অন্তত তাদের জন্য হলেও আমাদের এমন ভিন্নধর্মী আয়োজন সার্থকতা পায়। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বের সেরা বইগুলোর সাথে পাঠককে পরিচিত করিয়ে দেয়া। তাদের সাথে একাত্ম হয়ে আমরাও এ কাজটি করে চলেছি। সত্যি, এ এক অসাধারণ অনুভূতি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়