গুমোট আকাশের নিচে কোলাহলপূর্ণ ঢাকা শহর যেন বেশ থমথমে। এই আলো, এই অন্ধকার। আচমকা আকাশ ভেঙে বৃষ্টি যে নামবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এসবের মধ্যেই বেরিয়ে পড়ল আজাদ। চন্দ্রিমা উদ্যানে ঢুকে খুঁজে নিলো একটুখানি আশ্রয়। হাতের মধ্যে গুঁজে থাকা দীর্ঘ পরিচিত হাতটা জোড়াবদ্ধ করে বসে গেল বেঞ্চিতে। আহা, সেই হাত! যে হাতের তালুতে তার জন্ম, বেড়ে ওঠা, তার মানুষ হওয়া।
হাতটা কি পুরনো, খসখসে হয়ে গেছে? হয়তোবা তাই। হয়তোবা অন্য নতুন হাতের উষ্ণতা পুড়িয়ে দিয়েছে এক জীবনের এই জন্মদাগ। যা এখন কেবলই ছাই আর ধূসর। হয়তোবা চলতে চলতে হাঁপিয়ে গেছে আজাদ ও তার মা দু’জনই। বেঞ্চিতে বসতে বসতে মা বললেন, কোথায় নেয়ার কথা আর কোথায় এনেছিস আমায়। আমি একটু পানি খাবোরে বাবা।
আজাদ এ সুযোগটাই খুঁজছিল। পানির খোঁজে চন্দ্রিমা উদ্যান পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলো ফার্মগেট। আকাশ তখনো গুমোট, অন্ধকার। আজাদও কী কম কলুষিত? হুড়মুড় করে নেমে এলো বৃষ্টি। বস্তির পাশের এক ছাউনিতে গিয়ে দাঁড়াল সে। মা কি বৃষ্টিতে ভিজছে? ভিজুক। এ যন্ত্রণা আর সহ্য হয় না।
বস্তির ছেলেরা বৃষ্টির ভেতরে ফুটবল নিয়ে বেরিয়ে এসেছে রাস্তায়। এক মায়ের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছেÑ ঘরে আয় পুত, বৃষ্টিতে ভিজিস না। কে শোনে কার কথা! ছেলেরা খেলেই চলেছে। বৃষ্টি মাথায় করে মা নিজেই উপস্থিত হলো ফুটবল দলের সামনে। ছেলেকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে নিয়ে গেল বাড়ি। এমন মায়াময় দৃশ্য দেখে আজাদ নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। গ্রামে ছোটবেলায় মা-ও তো এভাবে রোদ-বৃষ্টি থেকে বাঁচিয়েছে তাকে। কত স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে তার। জাগতিক চাপে যা ঢাকা ছিল এত দিন। সেসব স্মৃতি ভাবতে ভাবতে তার চোখ বেয়ে টপটপ করে পড়তে লাগল দু’চোখের অশ্রুফোয়ারা।
বৃষ্টির তীব্রতা দেখে মা অস্থির হয়ে গেলেন। বেঞ্চির ওপর টিনশেড ছিল বলে ভিজছেন না। কিন্তুর ছেলের চিন্তায় তার মন আকুলি-বিকুলি করছে। দূরে আগমনের পথপানে চেয়ে ভাবছেনÑ আমার ছেলেটা ভিজে যাচ্ছে না তো! ওর তো আবার ঠাণ্ডা লাগলেই অসুখ হয়ে যায়।
এদিকে তৃষ্ণায় তার গলা শুকিয়ে কাঠ। টিনশেড বেয়ে গড়িয়ে পড়া পানি পান করবেন বলে মনস্থির করলেন। কিন্তু তিনি এতটাই বৃদ্ধ যে, একা একা দু’কদম হাঁটবেন সে শক্তি নেই। তবু অনেক কষ্টে অনেক সময় নিয়ে টিনশেডের মাথায় গেলেন। কুঁচকে যাওয়া চামড়ার হাত দু’খানা বাড়িয়ে নিলেন এক আঁজলা পানি। মুখের কাছে আনতেই ছেলের কথা মনে পড়ে গেল। ছেলে তার জন্য পানি আনতে গিয়েছে। ছেলের হাতের পানি খাবে ভেবে আবার অনেক কষ্টে অনেক সময় নিয়ে বেঞ্চিতে ফিরে এলেন। দুশ্চিন্তা করছেন, এই বৃষ্টির মধ্যে ছেলেটা ভিজছে না তো!
ভিজতে ভিজতে আজাদ মায়ের সামনে এসে দাঁড়াল। হাতে পানির বোতল। এসেই মায়ের পায়ে জাবরে ধরল সে। ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমাকে ক্ষমা করে দাও মা, আমাকে ক্ষমা করে দাও। এমন সময় তার মুঠোফোনটি ক্রিং ক্রিং করে বেজে উঠল। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে বউয়ের কর্কশ গলা- কাজ হয়েছে?
জঙ্গলবাড়ি, করিমগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ
