কর্মোদ্যোগী মানুষ গোপেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী। বয়স ৭৫ বছর। এ বয়সে অবসর সময় কাটানোর কথা থাকলেও শ্রম আর মমতায় শোলা দিয়ে নানা ধরনের খেলনা আর ঘর সাজানোর জিনিসপত্র বানানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। আর এসব জিনিস বিক্রি করে থাকেন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্তৃক (বিসিক) আয়োজিত মেলায়। নিজ কর্মদক্ষতার জন্য গোপেন্দ্র নাথের মানুষের কাছে রয়েছে বিশেষ পরিচিতি। আমাদের দেশে যে ক’জন কারুশিল্পী সুনামের সাথে কাজ করছেন। এদের মধ্যে গোপেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী অন্যতম। মানুষজন তাকে শোলার দক্ষ শিল্পী হিসেবেই চেনে-জানে। বছরের বিভিন্ন সময় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মেলায় গেলেই দেখা যাবে শোলার শিল্পকর্ম নিয়ে হাজির হয়েছেন। দীর্ঘ দিন ধরে শিল্পকর্মের সাথে জড়িত থাকায় দেশের গুণী মানুষদের সাথে রয়েছে সুসম্পর্ক। ছোট-বড় সবাই দাদা বলেই সম্বোধন করে থাকেন। আর কেউ তার কুশলাদি জানতে চাইলে প্রথমেই তিনি মৃদু হেসে এর জবার দেন। খুব নরম মেজাজের মানুষ, কথাও খুব নরম স্বরে বলে থাকেন। পরিচিত মানুষ দেখলেই বলে ফেলেন কেমন আছেন দাদা। সদ্যসমাপ্ত বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী বৈশাখী মেলায় কথা হয় গোপেন্দ্র নাথ চক্রবর্তীর সাথে। তার সাথে কথা বলে জানা যায় শোলা শিল্প সম্পর্কে।
শখের বশেই আজ থেকে ৪৫ বছর আগে এ পেশার সাথে সম্পৃক্ত হন তিনি। কিন্তু নেশার কারণেই এ পেশা ছাড়তে না পারায় জীবনের দীর্ঘ সময় পার করেছেন। এখনো অতি মনোযোগের সাথে এ কাজ করছেন। জীবনের বাকি সময়গুলো এ পেশার সাথে জড়িত থাকতে চান তিনি। গোপেন্দ্র নাথ চক্রবর্তীর জন্ম ঝিনাইদহ জেলার গোস্মামী দুর্ঘাপুর উপজেলার আড়পাড়া গ্রামে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন পরিশ্রমী ও কর্র্মঠ। পূর্বপুরুষেরা বাহ্মণ পরিবারের লোক। তিনি পারিবারিক গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসেন। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে চাকরির সুবাদে ঢাকা আসেন গোপেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী। আইডিয়াল কলেজের বোটানিক্যাল রিসার্চ সেন্টারে চাকরিরত অবস্থায় অবসর সময়ে বাসায় বসে ফোম কেটে নিজে নিজেই তৈরি করতেন নানা ধরনের খেলনা। এগুলো তৈরি করে শিশুদের বিনা পয়সায় দিয়ে দিতেন। এভাবে কেটে যায় প্রায় দুই বছর।
১৯৭৪ সালের বাংলা একাডেমিতে ফোম দিয়ে একটি কুমির তৈরি করে নিয়ে যান মেলায়। তখন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের এক শিক্ষক তার কাজের নৈপুণ্য দেখে কুটিরটি সেই সময়ে ১০০ টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে যান আর গোপেন্দ্র নাথ চক্রবর্তীকে ফোম ব্যবহার না করে শোলা ব্যবহারের পরামর্শ দেন। সেখান থেকে শোলা শিল্প নিয়ে পথচলা শুরু করেন গোপেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী। সরকারি চাকরির পাশাপাশি যতটুকু সময় পান এ সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিসিক কর্তৃক আয়োজিত মেলায় অংশগ্রহণ করেন। বছরের বেশির ভাগ সময় মেলায় কাটিয়ে থাকেন।
আমাদের দেশে বর্ষাকালে বিলের মধ্যে অযতœ-অবহেলায় জন্মায় জলজ উদ্ভিদ শোলা। জ্বালানি ছাড়া আর তেমন কোনো কাজে লাগে না এই শোলা। গোপেন্দ্র নাথ বর্ষাকালে এই শোলা সংগ্রহ করে সারা বছর শৈল্পিক কাজে ব্যবহার করে থাকেন। একটি ছোট চাকু আর শোলাই এ শিল্পের প্রধান উপকরণ। শোলার ওপরে খোসা ছাড়িয়ে সাদা অংশ দিয়েই তিনি যাবতীয় কাজ করে থাকেন। শোলা দিয়ে যেসব নান্দনিক জিনিস তৈরি করে থাকেন তা চোখে না দেখলে বিশ^াস করা দুরূহ ব্যাপার। আমাদের দেশে শোলা দিয়ে যারা বিভিন্ন শিল্পকর্ম তৈরি করে থাকেন, তার মধ্যে তিনি অন্যতম।
শোলা দিয়ে তৈরি করছেন বিভিন্ন রকম ফুল, ফুলের মালা, মসজিদ, তাজমহল, মন্দির, গোড়ার গাড়ি, গরুর গাড়ি, পালকি, পাখির মধ্যে বলাকা, পায়রা, বাজ, চড়–ই, টিয়া, শালিক, ঘুঘু, ময়ূর, বক, টুনটুনি, হাঁস, মুরগি, মাছ, কুমির, হরিণ, শেয়াল, বাঘ, টমটম ঘোড়ার গাড়ি ইত্যাদি। শোলার শিল্পকর্ম এতটাই নিখুঁত যে, প্রতিটি কাজই যেন জীবন্ত মনে হবে। তা ছাড়া যেকোনো ডিজাইনের নমুনা তার কাছে এনে দিলে শোলা দিয়ে তৈরি করে দিতে পারেন বলে তিনি বলেন। শোলা দিয়ে শখের পণ্যটি বানিয়ে এরপর পছন্দমতো রঙ করে থাকেন।
তিনি জানান, দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোগে আয়োজিত মেলায় অংশ নিচ্ছি। প্লাস্টিক ও অন্যান্য শিল্পের কাছে হার মেনেছে আমাদের দেশীয় শিল্প। বাঙালি জাতিসত্তাকে উপলব্ধি করার মতো এখনো প্রয়াস জোগায় আমাদের গ্রামীণ শিল্পীরা। কিন্তু এ শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত মানুষ যদি স্বাবলম্বী না হতে পারে, তাহলে একসময় বন্ধ হয়ে যাবে পরিবেশবান্ধব শিল্প। তিনি দাবি করেন, সরকারি উদ্যোগে রাজধানীর ঢাকায় আমাদের একটি জায়গা নির্ধারণ করে সারা বছর বসার ব্যবস্থা করলে ভালো হতো, যেখানে বিদেশী পর্যটকদের পণ্য কেনার সুযোগ তৈরি করতে পারলে আমরা লাভবান হবো। এতে করে শিল্পীরা বাঁচবে অন্য দিকে দেশও লাভবান হবে।
নিখুঁতভাবে একটি পণ্য তৈরি করে দিতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করেন। স্বীকৃতি মিলেছে অনেকবার। এ পর্যন্ত শোলার তৈরী কারুকার্যের জন্য বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের (বিসিক) পক্ষ থেকে ১২টির বেশি পুরস্কার পেয়েছেন। দুই মেয়ে আর এক ছেলে তার। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। স্বামী-সংসার নিয়ে দুই মেয়ে শ^শুরবাড়িতে খেয়ে-পরে ভালো আছেন বলে জানান তিনি। আর ছেলে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে চাকরি করেন। মেলা শেষে জন্মস্থান ঝিনাইদহের আড়পার গ্রামেই সময় কাটান। তিনি জানান, জীবনের অনেক পথ পাড়ি দিয়ে এখন অন্তিম সময় পার করছি। বয়সের কারণে আগের মতো কাজ করতে পারি না। মাঝে মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়ি। আবার সুস্থ হলে কাজকর্ম করি। পেশার কারণে জীবন চলার পথে দেশ-বিদেশের অনেক মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে। সেসব মানুষের কথা মনে পড়তেই মন কেঁদে ওঠে। সবার কাছ থেকে অনেক ভালোবাসা পেয়েছি, তা বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় অবলম্বন। বাকি সময় যাতে সবার ভালোবাসা নিয়ে এ শিল্পের সাথে কাটিয়ে যেতে পারেন, এমনটাই প্রত্যাশা তার।