রেল থেকে নেমে ধীর গতিতে সামনে এগোলাম। চারদিক অন্ধকার। নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ। ভোর হতে তখনো ঘণ্টাখানেক বাকি। অস্পষ্টভাবে নজরে পড়ল বড় এক নামলিপি। লেখা ‘স্বাগতম জম্মু-কাশ্মির’। জম্মু, কাশ্মির উপত্যকা ও লাদাখ অঞ্চল নিয়ে কাশ্মিররাজ্য। শীতকালীন রাজধানী জম্মু, গ্রীষ্মকালীন শ্রীনগর। গন্তব্য আমাদের শ্রীনগর। টিকিট কেটে গাড়িতে চেপে বসলাম ধীরে ধীরে সূর্য্যমিামা উঁকি দিলো পূর্ব দিগন্তে বরফে ঢাকা পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য চোখে পড়তে লাগল। সবুজে ভরা আশপাশ। অনিন্দ্য পরিবেশ। গাড়ি এগোচ্ছে শ্রীনগরে। শ্রীনগর কাশ্মিরে একটি অন্যতম শহর। শ্রীনগরের জনবসতি লাখ দশেকের বেশি। শহরটি ঝিলাম নদীর তীরে কাশ্মির উপত্যকায়। চারপাশে রয়েছে হ্রদ, বরফে ঢাকা পাহাড়, সুজলা সুফলা তেপান্তর ‘উইলো গাছে পূর্ণ অরণ্য পর্যকটদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান। এতে তৈরি হয় কার্পেট, রেশম ও পশমের বস্ত্র, কাঠ ও চামড়ার বিভিন্ন জিনিসপত্র। কথাগুলো বেশ আগ্রহভরে জানালেন স্থানীয় এক লোক। পরিচয় হলো বেড়াতে এসে। গাড়িটা দাঁড়িয়ে পড়ল হঠাৎ, লক্ষ করলাম চেকপোস্ট। কিছুটা ভড়কে গেলাম যেন। প্রতিটা পয়েন্টে রয়েছে এমন শত চেকপোস্ট। কাশ্মির ভূস্বর্গ হলেও যুদ্ধকবলিত একটি রাজ্য। হাজী বশির চাচা নিয়ে এলেন তার বাসায়। রাত তখন ৮টা। শীতে কম্বল জড়ালাম গায়ে। চা-বিস্কুটের ব্যবস্থা করলেন তিনি। কাশ্মিরের লোকজনের স্বভাবও বেশ গল্প করার মতো। হাজী সাহেবের আপ্যায়নে তেমনটাই বুঝতে পারলাম।
পরদিন ভোরে নাশতা সারলাম তড়িঘড়ি, এরপর ছুটলাম গুলমার্গ। কাশ্মিরের মূল পর্যটন কেন্দ্র যেটি। শীতকালে বরফে ঢাকা থাকে রাস্তাঘাট, গাছপালা, মাঠঘাট। তখন গুলমার্গের সৌন্দর্য বেডে যায় দ্বিগুণ। বরফের ওপর স্কিয়িং ছাড়াও গুলমার্গের অন্যতম আকর্ষণ নানা ধরনের ফুল ও সবুজে ঢাকা পরিবেশ। শ্রীনগর থেকে প্রায় ৫৮ কিলোমিটার দূরে জম্মু-কাশ্মিরের বারামুল্লা জেলায় অবস্থিত। উচ্চতা দুই হাজার ৭৩০ মিটার। দেড় ঘণ্টা বাদে পৌঁছলাম। বরফে ঢাকা চারপাশ। মাখামাখি করে গড়লাম বহু সময় বাঁয়ে পড়ল প্রিমিয়াম ক্লিনিক। বেড়াতে আসা কেউ অসুস্থ হলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। এর ঠিক কুড়ি মিটার দূরত্বে গুলমার্গ জামে মসজিদ। ভেতরে নামাজের সুন্দর পরিবেশ তুষারপাতের দৃশ্য উপভোগ করতে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারিজুড়ে এখানে ব্যবহৃত হয় স্কিয়ার ভারী ঠাণ্ডা হলেও আনন্দে কমতি রইল না। আশপাশের সবার মধ্যেই এক ধরনের উল্লাসের ছাপ দেখতে পেলাম। প্রকৃতির এমন সৌন্দর্য অন্য কোথাও বিরল। ‘ভূস্বর্গ কাশ্মির’-এর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এই গুলমার্গ।
দ্বিতীয় দিন চললাম কাশ্মিরের অন্যতম পর্যটক কেন্দ্র নিশাত বাগ। চতুর্দিক নানান ফুলে ভরপুর। নয়নাভিরাম সৌন্দর্যময় দৃশ্যে মুগ্ধ হচ্ছি বারবার। টিকিট কেটে ভেতরে গেলাম আমরা পাঁচজন। প্রথমেই নজরে পড়ে ঝর্ণাধারা। হাত দিয়ে ছোঁতেই ভয় পেয়ে গেলাম। ঠাণ্ডাভাব পুরো শরীর ছেয়ে গেল। পাশেই ছিলেন বশির চাচা। বললেন, ‘এত তেমন ঠাণ্ডা না। দু’মাস আগে এর দ্বিগুণ ছিল।’ তার কথা শুনে অবাক হয়ে বললাম, ‘আপনারা থাকেন কিভাবে?’
Ñএভাবেই। অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। আমরা অন্যত্র এক সপ্তাহও থাকতে পারব না।
Ñকেন?
Ñকারণ, গরম সহ্য করার ক্ষমতা আমাদের কারোর নেই।
Ñওহ
হাঁটছিলাম আর কথা বলছিলাম বশির চাচার সাথে। এদিকে দর্শকদের আনাগোনা ধীরে ধীরে বেড়েই চলছে। কেউ ছবি তোলায় ব্যস্ত, আবার কেউ সঙ্গীদের নিয়ে আনন্দে মগ্ন। বিভিন্ন রাষ্ট্র থেকে ঘুরতে আসা পর্যটকদের দেখে মনের ভেতর আনন্দ ভরে ওঠল। তবে বাংলাদেশ থেকে ছিলাম কেবল আমরা পাঁচজন। বলছিলাম নিশাত বাগের কথা। শ্রীনগরের মোগল বাগানগুলোর মধ্যে সর্বাপেক্ষা সুন্দর হচ্ছে নিশাত বাগ। মোগল সম্রাট শাহজাহানের শ্বশুর এবং সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের বড় ভাই আসিফ খান ১৬৩৩ সালে এই বাগানটি তৈরি করেন। প্রাকৃতিক একটি ঝর্ণাকে কৃত্রিমভাবে বিভিন্ন ভঙ্গিতে প্রবাহিত করা হয়েছে এবং এই কৃত্রিম ঝর্ণাটিতে আছে শত শত কৃত্রিম ফোয়ারা। নীল পাহাড়ের কোলে দাঁড়িয়ে থাকা এই নিশাত বাগ গড়ে ওঠেছে ৪৬ একর জায়গাজুড়ে। বাগানটিতে মোট ১২টি সোপান আছে, অর্থাৎ বাগানটি ধাপে ধাপে ১২ তলা পর্যন্ত উঠে গেছে। উপরের ধাপটি মোগল হেরেমের জন্য সংরক্ষিত ছিল। এই বাগানটিও পারস্য বাগানের রীতিতে গড়ে উঠেছে, যেখানে ইসলামী স্থাপত্য নকশা প্রাধান্য পেয়েছে। দ্বাদশ সোপান থেকে পাহাড়ের প্রাকৃতিক ঝর্ণার পানি কৃত্রিম নহরের মাধ্যমে বিভিন্ন ফোয়ারার সাহায্যে নেমে এসেছে এবং সবশেষে এটি ডাল লেকে গিয়ে পড়েছে। এই নহরের পাশে রয়েছে হাজার হাজার ফুলের গাছ এবং চিনার গাছ। ঘণ্টাখানেক ঘুরে বেরিয়ে এলাম নিশাত বাগ থেকে।
সাদি আর মাসুদকে বললাম, চলো এবার পরীমহলে। পরীমহলকে ঘিরে জড়িয়ে আছে অনেক ইতিহাস। বশির চাচাকে বলতেই রাজি হয়ে গেলেন। গাড়িতে চেপে বসলাম সবাই। চালাচ্ছেন চাচা নিজেই। এক ঘণ্টার মধ্যে চলে এলাম পরীমহলে। বাইরে থেকে নান্দনিক দৃশ্য দেখে ভেতরে প্রবেশে অনেকটা তাড়াহুড়া করছিলাম। ভেতর দৃশ্যগুলো বারবার আমাদের মুগ্ধ করছিল। ভূস্বর্গ কাশ্মির সত্যিই অসাধারণ। আপনাকে আসতে হবে তাতে, জানতে হলে ভূস্বর্গ কাশ্মির সম্পর্কে। ১৬৫০ সালে মোগল সম্রাট শাহজাহানের বড় ছেলে দারাশিকো এই পরীমহল গড়ে তোলেন। সুপ্রশস্ত বাগান ঘেরা এই মোগল স্থাপনাটি মোট সাত তলা। এটি মোগল সাম্রাজ্যের ইসলামী স্থাপনার একটি অনন্য নিদর্শন। যুবরাজ দারাশিকো এখানে লাইব্রেরি গড়ে তোলেন এবং এটিকে কেন্দ্র করেই এই বাগান। তবে শ্রীনগরের অন্যান্য মোগল বাগানগুলোর মতো এখানে দৃশ্যমান কোনো পানির নহর বা ফোয়ারা নেই, কিন্তু পানি সংরক্ষণের জন্য জলাশয় আছে। সাত তলার এই স্থাপনার একটি তলা কবুতরের জন্য বরাদ্দ ছিল। এই পরীমহলে যুবরাজ দারাশিকো জ্যোতিষ শাস্ত্রের জন্য অ্যাস্ট্রলজিকাল স্কুল গড়ে তুলেছিলেন। যদিও শ্রীনগরের অন্যান্য মোগল স্থাপনার মতো এটি অতটা যতেœ সংরক্ষিত নয়, তবুও এখানে এলে মুগ্ধ হতেই হয়। বিশেষ করে এটি এত উঁচু পাহাড়ে অবস্থিত যে, পরীমহলের সামনের অংশে দাঁড়ালে পুরো ডাল লেক পাখির চোখে দেখা যায়।
শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা।
রেল থেকে নেমে ধীর গতিতে সামনে এগোলাম। চারদিক অন্ধকার। নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ। ভোর হতে তখনো ঘণ্টাখানেক বাকি। অস্পষ্টভাবে নজরে পড়ল বড় এক নামলিপি। লেখা...
