Ñভাইয়া, পাঞ্জাবিটা নিয়ে যান, লাস্ট দাম ৫০০ রাখব।
হকার ছেলেটি পেছন থেকে জোরে চিৎকার করে ডেকে বলল।
চলে যেতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়ল তন্ময়। এত সুন্দর পাঞ্জাবিটা ছেড়ে দিতে মন চাইছে না তার।
‘পাঞ্জাবিটায় আব্বুকে দারুণ মানাবে। তা ছাড়া পাঞ্জাবির কালারও আব্বুর প্রিয় রঙের।’
এই ভেবে তন্ময় এক পা-দুই পা করে আবার পেছনে ফিরে এসে বলল,
Ñআমি তো বললামই, ৪০০ টাকা দেবো। পাঞ্জাবিটা আমার পছন্দ হয়েছে বলে আরো ৫০ টাকা বাড়িয়ে ৪৫০ টাকা বলছি। আর কোনো কথা না বাড়িয়ে দিলে দিয়ে দাও।
হকার ছেলেটি আগ্রহের গলায় বলল,
Ñঠিক আছে, ভাই। আপনার কথা মানলাম। আমাকে আর ২০টা টাকা বেশি দিয়েন। আপনার কথাও থাক, আমার কথাও থাক। দেখবেন, পাঞ্জাবিটা আঙ্কেলের খুব পছন্দ হবে।
আর কোনো কথা না বাড়িয়ে তন্ময় হাসতে হাসতে বলে ওঠল,
Ñঠিক আছে, দিয়ে দাও।
হকার ছেলেটি সুন্দর ভাঁজ করে একটি প্যাকেটে পাঞ্জাবিটা ভরে তন্ময়ের হাতে তুলে দেয়।
এরপর তন্ময় হকার ছেলেটিকে তার পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে নিউমার্কেটের দিকে এগোতে থাকে।
তন্ময়ের বাবা নিউমার্কেট এলাকায় দোকান করেন।
গত কয়েক বছর আগে নদীভাঙনের কবলে পড়ে প্রথমে জমিজমা তারপর বাড়িঘর সব হারিয়েছেন। অনেক কষ্টে ভেতরের দিকে সামান্য জমি কিনে তাতে ঘর তুলে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছিলেন। বেঁচে থাকবার একমাত্র অবলম্বন ছিল নদীকূলের ঝুপড়ি দোকানটি। তাও মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে নদীতে বিলীন হলো। সংসার খরচ আর তন্ময় ও তার তিন বোনের পড়াশোনার খরচ চালাতে গিয়ে তিনি রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছিলেন। শেষে পাশের বাড়ির এমরান সওদাগরের সাথে শহরে চলে আসেন। শহরে এসে বেশ কিছু দিন এমরান সওদাগরের ব্যাগের দোকানে সহকারীর কাজ করেন। তারপর তিনি নিজে একটি ব্যাগের দোকান দেন। দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করতে থাকেন।
একা দোকান করতে হয় বলে বাড়িতে যাওয়ার তেমন সুযোগ হয় না তার। অবশ্য প্রতি এক-দুই দিন পরপর বাড়িতে কথা বলেন। একে একে পরিবারের সবার সাথে কথা বলেন। গত তিন-চার মাস ধরে তার মন খারাপ যাচ্ছিল।
তন্ময়টা এইচএসসি পাস করে শহরে এসেছে। ও ভার্সিটির পাশে একটি ব্যাচেলর রুমে উঠেছে। সেখানে এলাকার আরো কয়েকজন ছেলে থাকে। তন্ময়ের বাবা সেখানে যাবে যাবে করে আর যেতে পারেনি। যাবেই বা কেমন করে। দোকানে যেকোনো সহকারী নেই। রকমারি ব্যাগ নিয়ে প্রতিদিন সকালে বসেন। সারাক্ষণ দৌড়ের ওপরে থাকতে হয়। কখন যে পুলিশ এসে পিটিয়ে উঠিয়ে দেয়।
তন্ময়ের বাবা সব হারিয়ে শহরে এসে কাজ পেয়েছেন। নিজে একটি দোকানের মালিক হয়েছেন। যা প্রতিবার ঈদে বাড়ি ফিরলে নিজের ছেলেমেয়েদের কাছে গর্ব করে বলতেন।
পরিবারের বড় সন্তান বলে তন্ময় জানে, নদীভাঙনের কবলে পড়ার আগের বাবাকে ওরা হারিয়েছে। ও বাবাকে কাছ থেকে দেখেছে, বাবা আর আগের মতো হাসেন না। সংসারের হাল ধরতে বাবাকে দিন-রাত খাটুনি করতে হয়।
দিনে দিনে বাবার চেহারাটাও ঝলসে যাচ্ছে। দেখে মনে হয় কড়া রোদের মধ্যে একটানা কাজ করেন।
বাড়িতে থাকাকালীন তন্ময় যেন বাবাকে চোখে চোখে রাখত। সারাদিন বাবার সাথে আঠার মতো লেগে থাকত। বাবার পাশে থাকতে পারলে ওর খুব ভালো লাগত। তন্ময়ের মা তো প্রায়ই বলতেন, ‘বাপ পাগল ছেলে খুব কম দেখেছি। তাও তোমার মতো কাউকে দেখিনি।’
মায়ের কথায় তন্ময় মৃদু হেসে বলত,
‘কেন, মা? আমি তো তোমাকেও ভালোবাসি। তবে বাবাকে একটু বেশি। কেন জানো?’
মা হা করে তন্ময়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। তন্ময় গর্বের সাথে বলতে থাকে,
‘কারণ আমার বাবা তার বাবা-মাকে খুব ভালোবাসতেন। আমার দাদা-দাদীকে একটুও কষ্ট করতে দিতেন না। তোমার মনে আছে, মা? দাদা মারা যাওয়ার আগে বাবার সেই নির্ঘুম রাতগুলোর কথা! এমন বাবাকে কী ভোলা যায়!’
তন্ময়ের মা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে আবেগে কেঁদে ওঠেন।
তন্ময়ের বাবা নিজে শত কষ্টের মধ্যে থেকেও তন্ময়দের হাসাতে চান। ওদের সুন্দর জীবনের জন্য পরিবার-পরিজনদের ছেড়ে দূরে একাকী পড়ে থাকেন।
খেয়ে, না খেয়ে সন্তানদের পড়াশোনার কথা ভাবেন।
এত কষ্ট বুকে নিয়েও তিনি ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার হাল ছাড়েননি।
বাবার কাছে পড়াশোনার খরচ চাইতে তন্ময়েরও খুব কষ্ট হতো।
এইচএসসি পাস করেই উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য শহরে চলে আসে সে। নিজের এলাকার বড় ভাইদের সাহায্যে এসেই দুটো টিউশনি পেয়ে গেছে সে। সেই টাকাতেই আজ পয়লা বৈশাখের বাজার করতে এসেছে।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ প্যান্টের পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে দেখে নিলো। বাবার পাঞ্জাবি কেনার পরও হাজার খানেক টাকা আছে।
এরপর মায়ের জন্য একখানা শাড়ি আর কেয়া, মিলি ও সাদিয়ার জন্য কিছু বাজার করল সে। হঠাৎ নিজের পায়ের দিকে চোখ পড়ে তার।
আহা! জুতা জোড়া তো কয়েক জায়গায় ছিঁড়ে গেছে।
এবার তার নিজের একজোড়া জুতা কিনলেই কেনাকাটা শেষ হবে।
এই ভেবে বড় বড় পায়ে নিউমার্কেটের একেবারে সম্মুখ দিকে প্রধান সড়কের পাশের ফুটপাথে বিছিয়ে রাখা জুতোর দোকানের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে।
রাস্তায় গাড়ি ও মানুষের ভিড়। ফুটপাথেও মানুষের জন্য হাঁটা যায় না। এমন পরিস্থিতি। তবু তন্ময় ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে আসে।
জুতোর দোকানটার সামনে পৌঁছেই হতভম্ব হয়ে গেল। সে একি দেখছে! একটু দূরেই তার বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। বাবার কাঁধে, হাতে, সামনে এমনকি গলাতেও অনেকগুলো ব্যাগ ঝুলছে। পাশের অন্যান্য দোকানিদের মতো তার বাবাও চিৎকার করছে-
‘ব্যাগ কিনুন! ব্যাগ কিনুন! খুব সুন্দর ব্যাগ!’
তন্ময় নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। বাবা এখানে! এভাবে! তবে যে বাবা বলেছিল...।
ভিড়ের মধ্য থেকে ছিটকে সরে এলো তন্ময়। বাবাকে এ অবস্থায় দেখে কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে তার। ইচ্ছে করছে ছুটে গিয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করতেÑ তুমি এমন করলে কেন, বাবা? আমাদের একটু সুখে রাখতে নিজেকে এভাবে তিলে তিলে নিঃশেষ করে দিচ্ছ কেন?
কয়েক কদম এগিয়েও ফিরে আসে সে। কিছুপর ভিড়ের মধ্যে নিজেকে মিশিয়ে দিয়ে আনমনে ভাবছেÑ
না, বাবার এই সত্য বাবার কাছেই গোপনে রয়ে যাক। আমাদের ঘিরে বাবা তার বুকের ভেতরে যে স্বপ্ন লালন করে চলেছেন, তা ভেঙে দেয়ার কোনো অধিকার নেই আমার। বাবার সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে আজ থেকে নতুন করে আমার জীবন শুরু হবে।
হাতিয়া, নোয়াখালী।
Ñভাইয়া, পাঞ্জাবিটা নিয়ে যান, লাস্ট দাম ৫০০ রাখব।হকার ছেলেটি পেছন থেকে জোরে চিৎকার করে ডেকে বলল।চলে যেতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়ল তন্ময়। এত সুন্দর পাঞ্জাবিটা ছেড়ে...
