আম্মার চোখে আমার দোষ একটাই, আমি মোবাইলে ২৪ ঘণ্টা ডুবে থাকি। এই নিয়ে তার অভিযোগের শেষ নেই। ফেসবুক আমার নিত্যদিনের আনন্দ। এই আনন্দ থেকে আমি বেরিয়ে আসতে পারি না। কিন্তু আম্মাকে সে কথা বোঝাই কী করে!
একদিন সকালবেলায় আম্মাকে ফেসবুক দেখিয়ে বললাম, ‘দেখেন তো, এই লোককে চেনেন?’ আম্মা মোবাইল হাতে নিয়ে ফেসবুকের ভেতরের মানুষটার ছবি দেখে হাউমাউ করে কেঁদে বললেন, ‘এ তো ইকবাল। আমার ভাই।’ ফেসবুকে ভাইয়ের ছবি দেখে সেদিন আম্মা অঝোরে কাঁদলেন। তার পর থেকে আমার মোবাইলপ্রীতি নিয়ে আম্মার মাথাব্যথা কমতে থাকে। রাতে প্রায়ই আম্মা আমার পাশে এসে বলেন, ‘ফেসবুকে তোর মামাকে একটু দেখা তো!’ আমি ফেসবুক খুলে ইকবাল মামার ছবি বের করে আম্মাকে দেখাই। আম্মা সেসব দেখেন আর কাঁদেন। ২৪ বছর আগে আমার বাবাকে ভালোবেসে ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন আম্মা। আমার নানাজানের পরিবার এখনো সেই সম্পর্ক মেনে নেয়নি।
এক বছর আগে এক বিকেলে ইকবাল মামাকে ফেসবুকে পেয়ে যাই। মামার সাথে আমার ইনবক্সে প্রায়ই কথাবার্তা হলেও তিনি এখনো জানেন না আমি তার অবাঞ্ছিত বোনের ছেলে। আম্মাকে সবই বিস্তারিত জানালাম। ইনবক্স কী, মেসেজ আদান-প্রদান কী, মেসেঞ্জার কলÑ ভিডিও কল কী, লাইকÑ কমেন্ট কী, আম্মা এখন সবই জানেন।

২.
আজ রাতে আম্মাকে বললাম, ‘ইকবাল মামাকে অনলাইনে দেখা যাচ্ছে।’ আম্মা রিনরিনে গলায় বললেন, ‘জিজ্ঞেস কর, ও কী এখনো ফতুয়া গায়ে দেয়? এক সময় আমি ওর জন্য ফতুয়া কিনতাম আর সুই সুতা দিয়ে ফতুয়ার বুকে আঁকতাম ফুল পাখির ছবি।’ এসব বলতে গিয়ে আম্মার গলা কেঁপে উঠল।
ইকবাল মামাকে মেসেজে লিখলাম, ‘মামা, আমি শাহনাজের ছেলে।’ ওপার থেকে তিনি পাল্টা মেসেজ দিলেন, ‘কোন শাহনাজ?’ আমি ছোট্ট করে লিখলাম, ‘আপনার বড় বোন শাহনাজ।’ আম্মা এই ফাঁকে বললেন, ‘তোরা মামা-ভাগ্নে এত কী লিখছিস, আমাকে দেখা তো!’ এবার মামার মেসেজ, ‘একটু ক্লিয়ার করে বলো তো!’ আম্মার একটি ছবি ইনবক্সে মামাকে পাঠিয়ে লিখলামÑ ‘দেখেন তো, চিনতে পারেন কি না ছবির মানুষটাকে!’ কিছুক্ষণ পর ওপার থেকে মেসেজ এলো, ‘তুমি শাহনাজের ছেলে? জানা ছিল না এত দিনেও।’ আমি লিখলাম, ‘জানানোর সাহস হয়নি আসলে। আম্মা সব সময় আপনাদের গল্প বলতে বলতে ভেঙে পড়েন।’ প্রায় এক মিনিট পর লম্বা মেসেজ লিখলেন মামা, ‘ওর মতো বেঈমানের ভেঙে পড়াই উচিত। তোমার অশিক্ষিত বাবার জন্য ও আমাদেরকে পর করে দিয়ে এখন ভেঙে পড়ছে কেন? বংশে চুন-কালি মাখানো তোমার মাকে আমরা কখনো ক্ষমা করতে পারব না। তুমি কিভাবে আমার ফ্রেন্ডলিস্টে এলে জানি না। ভালো থেকো।’
মামাকে ফিরতি মেসেজ লিখতে গিয়ে দেখি আমি তার ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে ব্লক হয়ে গেলাম। মানুষ এত কঠিন! আম্মা বললেন, ‘ইকবালকে একটু প্রশ্ন কর তোÑ সে কী এখনো লাল চায়ের সাথে মুড়ি মেখে খায়?’ আম্মার এমন পাগলামি দেখে আমার বলতে ইচ্ছে করছে, ‘এত আবেগ ভালো নয়। আমরা মামাদের কখনো আপন হতে পারব না। সারাজীবন পর থেকে যাবো। আজ ফেসবুক থেকেও মামা আমাকে যে পর করে দিয়েছে।’
আমি দেখতে পাচ্ছি আম্মার চোখ থেকে টপটপ করে পানি ঝরছে। ২৪ বছর ধরে হয়তো এভাবে সবার অগোচরে চোখের পানি ঝরছে চুপি চুপি। কেউ জানে না। কিছু চোখের পানির খবর কেউ রাখে না।
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী