বাংলাদেশের একেবারে দক্ষিণপূর্ব সীমান্তের জেলা পর্যটন শহরখ্যাত কক্সবাজারের পশ্চিমে সাগরবেষ্টিত পাহাড় সমৃদ্ধ একটি ছোট দ্বীপ মহেশখালী। বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ হিসেবে সবার কাছে পরিচিত এ দ্বীপটির নাম ও খ্যাতি। এ দ্বীপে রয়েছে ৪৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১২টি কিন্ডারগার্টেন, ১৭টি মাধ্যমিক, পাঁচটি নিম্ন মাধ্যমিক, ১৯টি মাদরাসা, পাঁচটি কলেজ, ১৪টি দাখিল মাদরাসা, চারটি সিনিয়র মাদরাসা, ৪৩২টি মসজিদ, ১৫টি মন্দির, আটটি বৌদ্ধবিহার। ৩৮৮.৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত এ দ্বীপে ৩১টি মৌজা, ১৫১টি গ্রাম, প্রায় তিন লাখ ২১ হাজার ২১৮ জনসংখ্যা, একটি পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়ন। শিক্ষা-দীক্ষায় অনগ্রসর এই দ্বীপাঞ্চলে শিক্ষিত মানুষ নেই বলাটা ভুল হবে। এই অনগ্রসর এলাকা থেকে উঠে এসেছেন অফিসার ইনচার্জ (ওসি), ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ সুপার, সেনা, বিজিবি, নৌঅফিসার, র‌্যাব কর্মকর্তা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও), এডিসি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পরিবেশবিজ্ঞানী, নৃবিজ্ঞানী, ডক্টর, মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ অসংখ্য পদবিধারী মানুষ। ঐতিহাসিক পটভূমির অত্যন্ত আকর্ষণীয় মৈনাক চূড়ায় আদিনাথ মন্দির। অপার সম্ভাবনাময় পর্যটনের স্বর্গভূমিখ্যাত দ্বীপ সোনাদিয়া। দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ প্রকল্প কয়লা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র, প্রকৃতির চোখ জুড়ানো মন ভোলানো দেশের দীর্ঘতম আদিনাথ জেটি, পাহাড়। সমুদ্রের অপূর্ব মিলনে যেহেতু এ দ্বীপটির সৌন্দর্য ও গুরুত্ব বাড়ায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৭ এপ্রিল ২০১৭ সালে ভিডিও কনফারেন্সে শিক্ষা-দীক্ষার মানোন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তিতে উন্নতকরণের অভিপ্রায়ে ডিজিটাল আইল্যান্ড হিসেবে মহেশখালীকে স্বীকৃতি দেন। মহেশখালী দ্বীপাঞ্চল হলেও খেলাধুলার দিক থেকে কোনো কালেই পিছিয়ে নেই। সমস্ত সংস্কৃতি যেন মহেশখালীর সমাজব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। শীত মওসুমে বিশেষ করে ফুটবল খেলার জমজমাট আসর বসে। ফাল্গুন মাসে উপমহাদেশের হিন্দুদের অন্যতম তীর্থ ক্ষেত্র আদিনাথ মন্দির প্রাঙ্গণে শিব চতুর্দশী আদিনাথ মেলা। বৈশাখ মাসে শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী বলী খেলা, যে খেলায় মাঠের চতুর্দিকে ব্যান্ডের তালে তালে বীর বেশে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় নেচে নেচে পাক দিয়ে শরীরটা গরম করে প্রতিপক্ষের বিপরীতে বসে বলীরা। তা ছাড়া বিভিন্ন আঙ্গিনায় ভলিবল, স্কুলমাঠে ক্রিকেট, বিলের ধারে হয় গ্রাম বাংলার জনপ্রিয় খেলা হা-ডু-ডু। উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েদের বিকেলবেলায় ও জোসনা রাতে হয় অঁলই খেলা, ব্যাডমিন্টন। তা ছাড়া ডাঙ্গুলি, মার্বেল খেলা, মরিচ খেলা তো আছেই। যদি সাংস্কৃতিক জগতের কথা বলতে হয় তবে বলব, সমষ্টিগত সংস্কৃতির ক্ষেত্রে মহেশখালীর মানুষ অনেকটা পেছনে। একুশে পদক পুরস্কারপ্রাপ্ত উদীচীর মতো সংগঠন থাকলেও নেই সরব কার্যকলাপ, পাশাপাশি উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি যা আছে তাও অর্ধমৃত। তবে এখানে আঞ্চলিক বা হালদা ফাড়া গান, মাইজভাণ্ডারী গান, হাইল্লা সাইর (বারোমাস্যা বা সারিগান) অঁলা বা হঁলা, কবির গান, পুঁথিপাঠ, ডাল বা স্তুতিগান (বৈদ্যর হাঁট বসানো) শোক বা মাতম বিলাপ, যাত্রাগান এখনো চলমান রয়েছে।
এ মাটি আমার মা। এই সমাজ আমার বেঁচে থাকার আবাস্থল। জন্মলগ্ন থেকে কিশোর বয়সে, যৌবন উপভোগে আদ্যোপান্ত জেনেছি মাতৃভূমির নিজ এলাকাতেই। তাই সমাজ ও দেশের প্রতি আমারো রয়েছে দায়বদ্ধতা। একজন প্রতিষ্ঠিত লোক কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য তার কোনো অবদান না থাকে, মানব কল্যাণে সুদৃঢ় পদক্ষেপ যদি তার হৃদয়ে আন্দোলিত না হয়, এমন লোকের প্রতিষ্ঠা সমাজের কোনো মঙ্গল বয়ে আনে না বরং কিছু কিছু শিক্ষিত অমানুষের পদচারণা বাধাগ্রস্ত হয় এলাকার উন্নয়নযজ্ঞ। যদি উন্নয়নযজ্ঞের কথা বলতে হয় প্রথমেই বলতে হয় দেশের সর্ববৃহৎ কয়লা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে মাতারবাড়িতে। শত শত ফসলি জমিতে গড়ে উঠছে শিল্পায়ন। প্রায় দেড় ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে সিএনজিতে চড়েই সম্ভব একবার ঘুরে আসতে। হোয়ানক কালারমারছড়ার মাঝামাঝি হয়েছে গ্যাস টার্মিনাল। মহেশখালীতে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার কথায় গভীর সমুদ্রবন্দর করতে যেমন করা হচ্ছে সমুদ্র খনন, তেমনি নির্বিচারে কাটা হচ্ছে মহেশখালী রক্ষার বেড়িবাঁধ খ্যাত পাহাড়ভূমি। যা প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও পরিবেশের অবকাঠামোগত অপূরণীয় ক্ষতি। এ এলাকার মানুষ চিরতরে হারিয়েছে ফসলি জমি। যে জমিতে চাষ হতো ধান, পান, মাছ, লবণ, চিংড়ি। মোট উৎপাদনের প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত লবণচাষি ৫৫, কৃষি ২১.১৭, পানচাষি ১৫, ব্যবসায়ী ৬.৯০, চাকরিজীবীর সংখ্যা মাত্র ০.৯৭ শতাংশ। ইতোমধ্যে মহেশখালীর প্রধান অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ছিল লবণ ও চিংড়ি ইতোমধ্যে আজীবনের জন্য শেষ হলো। মানুষের জমিগুলো নিয়ে শিল্পায়ন হলেও এ এলাকার সাধারণ মানুষের হয়নি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। শ্রেণিভিত্তিক কাজ করার মতো কাজ থাকলেও অগ্রাধিকার দেয়া হয়নি স্থানীয় জনসাধারণকে। জমিজমা বিক্রি করে এক প্রকার উদ্বাস্তু হওয়া জনসাধারণ যা টাকা পয়সা পেয়েছে তা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না থাকায় বসে বসে খেয়ে অনেকটা শেষ করে ফেলেছে। পলিটিক্যাল বিজনেস করা নেতারা অতীতের মহেশখালী, বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ মহেশখালী কী অবস্থা হবে জেনেও অর্থাৎ জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলা, অবকাঠামোগত পরিবেশের ক্ষতি এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতার কথা জেনেও কেন মেগা প্রকল্পগুলোতে হাত দিয়েছেন তা সবারই জানা। আমরা একটি নিরাপদ বাসযোগ্য মহেশখালী চেয়েছি যুগের পর যুগ কিন্তু তারা তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে অদ্যাবধি কাজ করে যাচ্ছেন স্বীয় স্বার্থের কথা চিন্তা করে। এ দায়ভার কিন্তু স্বার্থান্ধ রাজনীতিবিদদের। নিজেদের গাদ্দারি ও স্বার্থান্ধতার কারণে মহেশখালী বিক্রি হয়েছে বিদেশীদের কাছে। ফলে ক্রমে ক্রমে পরিণত হচ্ছে অবাসযোগ্য একটি মহেশখালী। রাজনৈতিক ব্যবসায়ীরা মহেশখালীতে চাইলে পারতেন খোলার মাঠ, সেন্ট্রাল একটি স্টেডিয়াম, শিশুদের বিনোদনের জন্য পার্ক, মানসম্মত কুরিয়ার সেবা, সব বয়সী মানুষের বিনোদনের জন্য পার্ক, আইসিও, নৌ-অ্যাম্বুলেন্স, ওয়াটার বাস, একটি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক হোটেল নিশ্চিত করতে। কিন্তু আজো তা স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল।