১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২ শ্রাবণ। বৃহস্পতিবার। বর্ষণসিক্ত প্রকৃতিতে আকাশের রবির সাথে শ্রাবণ মেঘের লুকোচুরি খেলা চলছে। এদিকে বাংলার কবি রবিঠাকুরের সাথে মৃত্যুর লুকোচুরি চলছে। সারা বাংলায় একটাই প্রশ্ন আবর্তিত হচ্ছেÑ বাংলার রবিঠাকুর এ যাত্রায় মৃত্যুর করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করতে পারবেন নিজেকে? ৯ দিন হলো কবির দেহে অস্ত্রোপচার হয়েছে। কিন্তু কবির শারীরিক অবস্থার যে ক্রমাবনতি হচ্ছে এ কথা বাংলা বিশেষ করে কলকাতা জানছে বেতার ও সংবাদপত্রের মাধ্যমে। সারা বাংলার জনমনে আশা-নিরাশা ও উৎকণ্ঠার পারদ ঊর্র্ধ্বমুখী।
সকালের দিকে ড. বিধানচন্দ্র রায় ড. ললিতমোহন ব্যানার্জিকে সাথে নিয়ে কবিকে দেখতে এলেন। এই ড. ললিতমোহন ব্যানার্জি অন্যান্য সহযোগীদের সাথে নিয়ে কবির দেহে অস্ত্রোপচার করেছেন। ড. বিধানচন্দ্র রায় ফিরে গেলেন সমর নিষ্ফল সেনাপতির শরীরী ভাষা নিয়ে। ড. বিধানচন্দ্র রায় কি বুঝতে পেরেছিলেন, ৮০ বছর ধরে জাজ্বল্যমান দীপশিখাটির শেষ তৈলবিন্দু আকর্ষণ করে নিভে আসার সময় একেবারে আসন্ন। কবি কি আরো একটু আগেই বুঝে গেছেন? চার মাস ২৫ দিন আগে আদরের দৌহিত্রী নন্দিতাকে উৎসর্গ করা সরস দ্রুতপাঠ্য ‘গল্পসল্প’ গ্রন্থের শেষ রচনা ‘মুক্তকুন্তলা’ গল্পের সাথে যুক্ত করা এক পদলালিত্য ঝঙ্কারে কবি লিখেছেনÑ
‘সাঙ্গ হয়ে এলো পালা
নাট্যশেষের দীপের মালা
নিভে নিভে আসছে ক্রমে ক্রমে
রঙিন ছবির দৃশ্যরেখা
ঝাঁপসা চোখে যায় না দেখা
আলোর চেয়ে ধোঁয়া উঠছে জমে।’
তাহলে কী বুঝতে পেরেছেন, আর বেশিদিন নয়? ১৩ দিন আগে ‘সব হতে আপন’ শান্তিনিকেতন থেকে চিকিৎসার জন্য কলকাতার উদ্দেশে যাত্রা শুরুর প্রাক্কালে রুমাল দিয়ে কবিকে চোখ মুছতে দেখেছেন অনেকে। বুঝে গেছেন কি যে, জীবনের ৭০টি বছরের স্মৃতি যার সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত সেই শান্তিনিকেতন তিনি চিরবিদায় জানাচ্ছেন? তাই কি বেদনাশ্রু ঝরছে কবির চোখে?
সকাল থেকেই আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে ১৫ মিনিট পরপর কবির শারীরিক অবস্থার সাম্প্রতিকতম তথ্যসম্বলিত সংবাদ পরিবেশন করছে। কিন্তু আকাশবাণীকে বেশিক্ষণ এই পরিবেশনটি করতে হলো না। দুপুর ১২টা ১০ মিনিটের অব্যবহিত পরেই আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে বাংলার বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের শোকাবেগমথিত কণ্ঠে ধ্বনিত হলো কবির প্রয়াণ বার্তা। চার মাস ২৫ দিন আগে যা বলেছিলেন ‘গল্পসল্প’ গ্রন্থের শেষ রচনায় আজ তা সত্যি হলো। কবির জীবন মঞ্চে আঁধার যবনিকা নেমে এলো। ‘কর্ম যাহার চরম হিসাব লিখা’ তিনি কবির জীবন প্রান্তে এসে দাঁড়ালেন, কবিকে নিয়ে চললেন সুদূর অজানালোকে। চলে গেলেন কবি।
দুঃসংবাদ দ্রুতগামী, গুরুত্বের যাত্রা অনুযায়ী তার দ্রুতি এবং সর্বত্রগামিতা নির্ধারিত হয়। বাংলায় আজ বাংলার মহাগুরু নিপাত। এই দুঃসংবাদের দ্রুতি এবং সর্বত্রগামিতা বলে বোঝার অপেক্ষা রাখে না। কবির মৃত্যুর সংবাদ প্রচারিত হওয়ার সাথে সাথেই কলকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজসহ প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষিত হয়ে গেল। কলকাতা মহানগরীতে পূর্বনির্ধারিত বহু সভা-সমাবেশ কবির প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনান্তে মুলতবি ঘোষিত হয়ে গেল। খেলার মাঠের প্রাত্যহিক সূচি অনুযায়ী ফুটবল ম্যাচগুলো আজকের মতো বাতিল হয়ে গেল। কলকাতার প্রতিদিনের চিত্রের অনেক কিছুই আজ উল্টাপাল্টা হয়ে গেল। বাংলা তথা কলকাতার কর্মলোকের প্রাত্যহিক নৃত্যগীত সভা মুহূর্তের মধ্যে সম্বলিত ছন্দ হলো বাংলার শ্রেষ্ঠ জীবন শিল্পের বিরহে।
কবির মৃত্যুর সংবাদ প্রচারিত হওয়ার সাথে সাথেই জোড়াসাঁকোয় ঠাকুরবাড়ির সামনে জনসমাগম শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে তা জনসমাবেশের রূপ নিচ্ছে। বড় রাস্তার ভিড় উপচে গলি রাস্তাগুলোও মানুষে মানুষে পরিপূর্ণ। ঠাকুরবাড়ির সামনে সমবেত জনতার আগ্রহ ঠাকুরবাড়ির ভেতরে ঢুকে চিরনিদ্রায় শায়িত কবিকে অন্তত একবার এবং শেষবারের মতো দেখা। তাদের এই ইচ্ছাতিশয্যে তাদেরই সম্মিলিত দেহচাপে ঠাকুরবাড়ির একটি ফটক ভেঙে পড়ল।
জনতার বাধা অতিক্রম করে কবির বহু পরিজন, প্রিয়জন, নিকটজনসহ বহু বিশিষ্টজন ঠাকুরবাড়িতে ঢুকতেই পারলেন না। ঠাকুরবাড়িতে শবদেহের দীর্ঘক্ষণ অবস্থান ঠাকুরবাড়ির পারিবারিক নিয়মবিরুদ্ধ। তাই শবানুগমন শুরু হলো উল্লেøখযোগ্য তৎপরতায়। ঠাকুরবাড়ি চত্বরসহ জোড়াসাঁকোর রাস্তায় তখন জনলহরী। অনন্তপুরের অনেকেই জানালা থেকে কবিকে শেষবারের মতো দেখতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু বিপুল জনতরঙ্গ তাদের দৃষ্টিপথ রুদ্ধ করে দিলো। ১৪ বছর বয়সে জননী সারদা দেবীর শব যখন বাড়ির সদর দরজার বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় শোকের সমস্ত ঝড় সেদিনের কিশোর রবির হৃদয়ে হাহাকার তুলেছিল বিষাদের এই ধারণা জাগিয়েÑ ‘এই বাড়ির দরজা দিয়া মা আর একদিনও তাঁহার নিজের এই চির জীবনের ঘরকন্নার মধ্যে আপনার আসনটিতে আসিয়া বসিবেন না।’ আজ কবির মৃতদেহ কবির অজান্তেই বাড়ির সদর দরজার বাইরে বেরিয়ে গেল।
জননীর মৃত্যুর পর অবশিষ্ট ৬৬ বছরের জীবনে একবার নয়, বহুবার একান্ত ব্যক্তিগত শোকের অভিঘাত কাঁপিয়ে দিয়েছে, নাড়িয়ে দিয়েছে রবীন্দ্রনাথের মহাজীবনকে। কিন্তু কোনো সময় ব্যক্তিগত আঘাত-বিয়োগের দুঃখকে সর্বজন প্রকাশ্য হতে দেননি কবি। প্রায় আট বছর আগে এক চূড়ান্ত শোক উপলক্ষে নিজের লেখনীতে বলেছেনÑ
‘সকলের নয় যে আঘাত
ধোরোনা সবার চোখে।’
আর ব্যক্তিগত শোক তো তার সৃষ্টির শত পুষ্পের বহুরূপতায় বাংলা সাহিত্য তথা বিশ্বসাহিত্যের ডালি পূর্ণ করেছে বারবার। এ কথাও সত্য এবং লক্ষণীয়, এই রবীন্দ্রনাথ মহাজীবনেই বহু ব্যক্তির বিয়োগব্যথা যা সর্বজনীন বিয়োগ ব্যথার রূপ পেয়েছিল, সেই সব উপলক্ষে তাদের জন্য তার শোককে সবার জন্য তুলে ধরেছেন সাহিত্যের স্বর্ণপাত্রে বাণী মূর্তি দিয়ে সাজিয়ে। আজ সেই মহাজীবনই ব্যক্তিগত শোকে সহিষ্ণুতা এবং সর্বজনীন শোকের রমণীয় বাণী মূর্তি রূপায়ণÑ এই দুইয়েরই বহু অতীত। আজ তারই জন্য শোক সর্বজনীন, আজ তার জন্যই শোক সাহিত্যরূপ পাবে তার উত্তরসূরিদের লেখনীতে। জনতরঙ্গে ভাসতে ভাসতে চলেছে সদ্য প্রাণ বিবর্জিত তার সুদর্শন পুরুষ দেহখানি অজানা সমুদ্রলোকে যাত্রা শুরু করার খেয়াঘাটে।
আকাশের রবি অনেকটাই স্তিমিত জ্যোতি। তার গন্তব্য পশ্চিম দিগন্ত ক্রমে নিকট হয়ে আসছে। আজকের মতো আকাশ থেকে মিলিয়ে যাবে সে আর কিছুক্ষণ পরই। যাবার আগে তার কমল কিরণ স্পর্শ করেছে চিরদিনের মতো মাটিতে মিলে যাওয়ার মাটির রবিকে। কবির শব এগিয়ে চলছে। কলকাতা এই মুহূর্তে তার নিজের পরিচিত ছবি অনেক দূরে কোথাও লুকিয়ে রেখেছে। কবির শবযাত্রা পথের দু’ধারে শুধু মানুষ। প্রতিটি বাড়ির বারান্দা এবং জানালায় শুধু মানুষ। দোকানে দোকানে রেডিও চলছে, কবির শেষযাত্রার ধারাবিবরণী শোনার জন্য দোকানের সামনে শুধু মানুষ। ১০টা-৪টার অফিস আদালত যাত্রীরা আজকের দিনের কাজ শেষে তাদের গৃহভিমুখী হতে ব্যস্ত হওয়ার অভ্যাস বিস্মৃত হয়েছে। প্রতি মুহূর্তে কবির শেষ যাত্রাপথের দু’ধারে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কবির শেষযাত্রা প্রত্যক্ষ করার জন্য।
অবশেষে নিমতলা ঘাটে কবির মৃতদেহ এসে পৌঁছাল। নিমতলা মহাশ্মশানে তিল ধারণের স্থান নেই। কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ অসুস্থতা হেতু আসতে পারেননি। মৃণালিনী দেবীর শেষকৃত্যে রথীন্দ্রনাথকে যোগ দিতে দেননি কবি নিজেই। আজ রথীন্দ্রনাথই আসতে পারেনি। কবির শেষকৃত্য করলেন কবির মেজোভাই সত্যেন্দ্রনাথের পুত্র সুবীরেন্দ্রনাথ। কবি চলেছেন ‘দিন শেষের শেষ খেয়ায়’, ফেরার পথে ফিরেও চাইবেন না আর কোনোদিন। কিন্তু যারা এই পরিশ্রান্ত প্রদোষের অবসন্ন নিস্তেজ আলোয় কবিকে খেয়া ছাড়বার আগে তীরের বিদায় স্পর্শ দিতে এসেছেন তারা বুঝতে পারছে না, বুঝতে চাইছে না নির্মম বাস্তবকে। নিমতলা মহাশ্মশানে একটি পুরেনো নির্মাণের ভাঙা আলাসেতে দাঁড়িয়ে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের পক্ষ থেকে কবির শেষকৃত্যের ধারাবিবরণী দিয়ে চলছেনÑ
‘হে কবি,
হে পুরাতন,
হে চির নতুনÑ
রাত্রির অবসান ক্ষণিক হোকÑ
আগামীকালের নবপ্রভাতে
নূতনরূপে তুমি দেখা দাওÑ
দেখা দাও আরবার হে নূতন।’
সব কিছু শেষ। ‘মৃত্যুর অগ্নিতে জ্বলি’ কবি ‘অসীমের অলঙ্কার’ হয়ে গেলেন। সবাই যে যার গন্তব্যে ফিরে গেছে। কল্লেøালিনী মহানগরীর কোলাহল প্রায় স্তিমিত। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমেছে। নীরবতা নিবিড় থেকে নিবিড়তর। সেই নীরবতায় বেতারে শোনা যাচ্ছে কবির গানÑ
‘সম্মুখে শান্তি পারাবার।
ভাসাও তরণী হে কর্ণধার।’
যে গান কবি রচনা করেছিলেন মৃত্যুর প্রায় পৌনে দুই বছর আগে এক হৈমান্তিক মধ্যাহ্নে উত্তরায়ণের ‘পুনশ্চ’ বাড়িতে বসে। গানের বাড়ি এবং সুরের হাত ধরে বাঙালি শ্রোতারা তখন যাত্রা করছেন অন্য এক বোধের ভুবনে।হ