আমাদের নাসির উদ্দিন চাচা ছিলেন অমায়িক মনের মানুষ। চাচাকে আমি এভাবে চিনতাম; একজন নরম মন ও শক্তসমর্থ মানুষ। এলাকার সবাই তাকে সমীহ করত। সম্মান করত। আমরা ছোটরা তাকে আদর করে ডাকতাম, কেবলা হুজুর।
গ্রীষ্মের গা-জ্বলা গরম দুপুরে চাচা মাদরাসার বারান্দায় এসে শুয়ে পড়লে আমরা চাচার সাথে জুড়ে দিতাম মজার মজার গালগল্প। চাচার স্বাস্থ্যবান শরীরে গরম সইতে পারতেন না বিলকুল। মাদরাসার উত্তর পাশে ছিল একটা জলভরা পুকুর। সেই পুকুরে রোদ ছিল না তেমন। বড় বড় তালগাছ আর বাঁশঝাড় দীর্ঘ ছায়া ফেলত পুকুরের পুরনো সবুজ জলরাশির ওপর। একটা ঝুঁকে পড়া গাছের অদ্ভুত আঁকাবাঁকা ডাল সেই সবুজ জলের ভেতর খানিক ডুবে ছিল বহুদিন। সেখানে উড়ন্ত নীল আকাশ আর সাদা মেঘের ছায়া পড়লে মনে হতো এসব যেন জলের ওপর নীল ময়ূরের নাচ। আলস্যভাব নিয়ে খুব ধীরে ধীরে সেই জলে হেঁটে যেত আকাশ অথবা নীল ময়ূর। পুকুরের ডান পাশে হিজল গাছের ছায়া পড়ে একটা মোলায়েম হাওয়া পুকুরের জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলে যেত দক্ষিণ দিকে। সে জন্য মাদরাসা সবসময় তুলনামূলক ঠাণ্ডা এবং আরামদায়ক থাকত। তাই প্রচণ্ডরকম গরমে চাচা চলে আসতেন এখানে।
সেইবার চাচার অসুখ করল। চাচার খুব কষ্ট হচ্ছে। খেতে পারেন না ঠিকমতো। উঠতে পারেন না, বসতে পারেন না। দেশের সর্বোচ্চ চিকিৎসা করার পরও কোনো সমাধান দিতে পারলেন না ডাক্তাররা। বাকি রইল বৈদেশিক চিকিৎসা। অল্প কদিনের মধ্যে কাগজপত্র ঠিক করা হলো খুব দ্রুত। তারপর একদিন রাতে সাদা প্রাইভেটকারে চাচাকে বাড়িতে নিয়ে আসা হলো। মাঝে ঈদ। ঈদের পরই চাচাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হবে বিদেশ।
ঈদের দিন ফজরের পর খুব ভোরে আমাদের গোরস্থানে মুরব্বিদের নিয়ে মুনাজাত শেষ করার পর জানতে পারলাম; চাচা আর নেইÑ আমাদের ছেড়ে তিনি চলে গেলেন প্রভুর কাছে। চাচার চলে যাওয়া আমাদের জীবনেও খুব দুঃখ নামিয়েছিল সেদিন। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি নামিয়ে কেঁদে উঠেছিল আকাশ। বাতাসে বইছিল বিষাদের সুর। আমি চিৎকার করে কাঁদতে পারিনি সেদিনÑ কপোল বেয়ে গড়িয়ে পড়েছিল টপটপ চোখের পানি।
আমাদের বড় চাচাকে আমি কোনোদিন কাঁদতে দেখিনি। সেদিন মিকাইল ফেরেশতা নাসির উদ্দিন চাচার জানাজা নামাজের আগে এক পলশা বৃষ্টি নামিয়ে ভিজিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের বিষণœ দুপুর। তবু চাচার জানাজায় লোকে লোকারণ্য ছিল সব। বিশাল বাহির বাড়ি ভরে গিয়ে মসজিদ মাদরাসা এবং মাদরাসার সামনের বিশাল মাঠও ভরে গিয়েছিলÑ চারদিকে শুধু মানুষ আর মানুষ। আজ অবধি কোনো জানাজায় এত মানুষের আগমন দেখিনি। সেই জানাজায় ইমাম ছিলেন আমাদের বড় চাচা। ছোট ভাইয়ের জানাজা পড়াচ্ছেন বড় ভাইÑ তাকবির দিতে গিয়ে বড় চাচা হু হু করে কেঁদে উঠেছিলেন বারবার। যেন বুকের উপর রেখে দিয়েছে অস্বাভাবিক ওজনের পাথর। সেই ভার সইতে না পেরে অসহ্য যন্ত্রণায় লাল দাড়িওয়ালা মানুষটাও শিশুর মতো কেঁদে উঠছেন উচ্চস্বরে। আমিও কাঁদি। নীরবে বেরিয়ে আসে দুচোখের পানি-ভিজে উঠে কোমল পরশেরা। শতবর্ষী পুরনো কাঁঠাল গাছের নিচে পাতা হলো চাচার মাটির বিছানা।
চাচার মৃত্যুর পর আমাদের বড় ফুফা চাচাকে স্বপ্নে দেখতেন ঘনঘন। চাচা ফুফাকে স্বপ্নের ভেতর ডাকেন ‘দুলাভাই আমার কাছে আইসা পড়েন, এখানে অনেক সুখ।’ ফুফা এসব স্বপ্নের কথা বর্ণনা করতেন বাড়ির মুরব্বিদের সাথে। কেউ কেউ বলত ‘এরপর ফুফার সিরিয়াল’। আমার শিশুমনে এসব তখন ঘোর রহস্য ছিল কেবল।
তারপর অনেকদিন ফুফার দরাজ গলার মধুর আজান শুনে ফজরে আমার ঘুম ভেঙেছে। চাচার সেই শান্তির দুনিয়ার কথা আমরা ভুলে গিয়েছিলাম এতদিনে। তাই বুঝি বড় ফুফা আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেলেন চাচার সেই শান্তির দুনিয়ায়। আমাদের মনে ঢেলে দিয়ে শোকের ছায়া। ফুফার মৃত্যুতে মগজে দৌড়ে বেড়াচ্ছে চাচার সেই স্বপ্নের কথা, ‘দুলাভাই আমার কাছে আইসা পড়েন, এখানে অনেক সুখ।’ কথাগুলো যেভাবে নামাজের প্রথম রাকাতে ‘কুলহুয়াল্লøাহু আহাদ’ এই ছোট সূরাটি দৌড়ে বেড়ায় আমার মগজের ভেতর। যেন এ ছাড়া আর কোনো সূরা আমি মুখস্থ করিনি কোনো কালে।হ