আমি মাঝে মাঝে ভাবি একটা সুন্দর গল্প লিখব। বর্ষা, শরৎ অথবা বসন্ত একটা কিছু নিয়ে। আমি পারি না। হৃদয়ের রক্তক্ষরণ আমার কলম দিয়ে ঝরে না। শরতের গল্প লিখতে গিয়ে আমি বারবার দিক হারিয়ে ফেলি। এটা ওটা কতকিছু মনে পড়ে আমার কিন্তু ষড়ঋতুর কথা আমার মনেই থাকে না। ঋতু আর প্রকৃতিকে নিয়ে লিখতে গেলে কল্পনা শক্তির বড় প্রয়োজন, যা আমার মোটেও নেই। তবু যা মনে আসে আপন মনে লিখে যাই। শরৎ নিয়ে লিখতে গেলে শরৎবাবুর কথা মনে চলে আসে। বাংলা সাহিত্যের বড় এক উজ্জ্বল তারকা ছিলেন। আমি তার মতো করে বলছি, নদীর কূলে বসে আমি জলকে কেবল জলই দেখি, কাশফুলকে কাশফুলই দেখি। মাঝে মাঝে রাতের বেলায় চাঁদের পানে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ দুটো ঠিকরে বের হওয়ার উপক্রম হলেও চাঁদকে চাঁদ ছাড়া অন্য কিছু দেখতে পাই না। ওটাই হয়েছে বড় দোষ। শ্রাবণীকে নিয়ে একটা গল্প লিখব বলে অনেক দিন চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি; ওটা আমায় দিয়ে হবে না। তবু দুঃখ নেই আমার। খাতা কলমে যার গল্প আমি লিখতে পারি না আমার হৃদয়ের মাঝে তাকে নিয়ে এত্তোসব গল্প সাজানো আছে যা আমি ছাড়া আর কেউ জানে না। আমি ছাড়া ওগুলো উদঘাটনের, বোঝার ক্ষমতাও কারো নেই।
শ্রাবণী এক দিন আমায় বলেছিল, ‘আচ্ছা প্লাবন বলো তো আমার চোখ কী বলতে চায়?’
আমি চোখের ভাষা বুঝি না। চোখের দিকে তাকালে নাকি চোখের পর্দায় অনেক কিছু ভাসতে দেখা যায়। চোখ যে মনের কথা বলে, এ আমি অজস্রবার আমার নশ্বর কান দ্বারাই শ্রবণ করেছি। আমি শ্রাবণীর চোখে চোখ রেখে তাকাই। সাদার ভেতর গোলাকার কালো একটা বস্তু। এই তো! আরো অনেকক্ষণ চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে ডাল্টনের পরমাণুবাদের সূত্র আবিষ্কারের মতো আবিষ্কার করলাম, ওর চোখের ভেতর আমার ছবি। আমি চিৎকার করে লাফিয়ে উঠে বললাম, ‘ শ্রাবণী তোমার চোখের ভেতর আমার ছবি দেখা যায়। তোমার চোখ দেখি আমার কথা বলে।’
‘ হ্যাঁ, প্লাবন। তুমি ঠিক ধরেছ। আমার চোখ তোমার কথাই বলে।’ শ্রাবণী উত্তর দেয়।
শ্রাবাণীর কথা শুনে আমি বিজয়ের আনন্দ পেয়েছিলাম আর বিজয়ীর হাসি হেসেছিলাম একগাল, আর কিছু বুঝতে পারিনি। ওর কথায় যে একটা মহারহস্য লুকিয়ে ছিল সেটা তখনো বুঝে উঠতে পারেনি মন।
প্রথম জাগরণ। যখন বুঝতে শিখেছি ভালোবাসা-প্রেম। যখন বুঝেছি শ্রাবণী আমায় ভালোবাসে। তখন ও আমায় ছেড়ে অনেক দূরে-তেপান্তরে। বয়সের কোনো পার্থক্য ছিল না আমার আর শ্রাবণীর। কে জানে শ্রাবণী হয়তো দু’এক বছরের বড়ই হবে আমার চেয়ে। অবুঝ বেলা একসাথে খুব করে বনে-বাদাড়ে ঘুরে-ফিরে একসময় ক্লান্ত দেহ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তাম ভৈরবের বুকে। তখন আমাদের ক্লান্ত শরীরের ক্লান্তিগুলো ভৈরবের জলের সাথে মিশে চলে যেত অনেক দূর। সে কি ছোটাছুটি-দাপাদাপি, সাঁতার কাটা আর জোয়ার ভাটায় খেলা করা। আমাদের এ আনন্দময় জীবনে বাদ সাধলেন কোথাকার অজানা অচেনা একজন লোক। শ্রাবণীকে বিয়ে করতে যাচ্ছিলেন তিনি। বিয়ের কথা শুনে শ্রাবণীর সে কি কান্না! শ্রাবণের বর্ষা হয়তো হার মেনেছিল সেদিন শ্রাবণীর কাছে। কান্না আর ব্যথার কথা শুনে ছুটে যাই আমি, ‘আরে কাঁদছিস কেন শ্রাবণী?’
‘কাঁদব না কেন তাই বল প্লাবন? আমি যাকে চিনি না জানি না তার সাথে আমার বিয়ে হবে, সারা জীবন ঘরকন্না করতে হবে; এর চেয়ে বড় ব্যথা আর কী আছে? তা ছাড়া আমার মনেরও তো একটা ব্যাপার আছে তাই না?’
‘তাতো ঠিক।’
‘ আচ্ছা প্লাবন।’ আমার দিকে তাকায় শ্রাবণী।
‘ বল।’
‘ চল না আমরা দু’জন দূরে কোথাও হারিয়ে যাই।’
‘ তুই পাগলের মতো যে কী যা তা বলিস! ওর চেয়ে বউ সেজে স্বামীর ঘরে যা।’
‘ হ্যাঁ’ ঘাড় নাড়ে শ্রাবণী। ‘প্লাবন আমি চলেই যাচ্ছি। না গিয়ে কী উপায় আছে আমার। আর বিয়ে না করেও উপায় নেই। রক্তের স্রোতের মতো প্রবহমান যে সামাজিক রীতি তা খণ্ডানোর ক্ষমতা শুধু আমার মতো অশ্রু বর্ষণ করতে আসা বাংলার শ্রাবণীদের থাকে না। ওদের মনের কদর নেই, ভালোবাসার মূল্য নেই। আমরা অবলা হিসাবেই তো স্বীকৃত। আর যারা অবলা তাদের মন থাকতে নেই, থাকতে নেই আকাক্সক্ষা।’
চলে গেল শ্রাবণী, একলা আমায় ফেলে রেখে। আমি ভৈরবের তীরে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম কাশফুলের দোলা। বিদায়ী সূর্যের।