শুভ্রতার ঋতু শরৎ। স্নিগ্ধ-শীতল বাতাসের পরশ বুলিয়ে যাপিত জীবনের ব্যস্ততার কোন অগোচরে চলে এলো! আহা কে রে আজ নীলাকাশের বুকে অসংখ্য পেঁজাতুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে খেলছে শুভ্র খেলা। আকাশের বুকে চোখ পড়তেই খণ্ড খণ্ড শুভ্র মেঘের ভেলা দেখে চনমনে হয়ে বলে ওঠে বেখেয়ালি মন। মন ভাবে আবার, কোনো মায়ের শুকোতে দেয়া পেঁজাতুলো সব শরতের সিক্ত কোমল বাতাসের সাথে মিতালি করে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে আকাশের বুক। নিশ্চয়ই পেঁজাতুলো পাহারাওয়ালা কিশোরী মেয়েটি তার মায়ের আদেশ অমান্য করে স্বভাব দূরন্তে খেলতে গেছে গোল্লাছুট। আর এরই ফাঁকে পেঁজাতুলো সব উড়ে উড়ে ঢেকে নিলো আকাশের নীল। উফ! কি বকুনিটাই মেয়েটি আজ খাবে মায়ের। আকাশের বুকে সাদা মেঘের ভেলার উড়োউড়ি তাকিয়ে দেখতে দেখতে শুভ্র মেঘের মতো সাদা মনে কত কথাই না ভাবি। এমনিভাবে প্রকৃতি আমাদের মনে জাগিয়ে দেয়, শরৎ এলো বাংলাদেশে। তার শুভ্রতা ছড়িয়ে পড়েছে আকাশে, বাতাসে, মন অরণ্যে, সবুজ প্রকৃতিতে। সবখানে আজ শুভ্রতার ঢেউ। মনটাও তাই ফুরফুরে মেজাজে মেঘের মতো ভাসছে আকাশে আকাশে। আর আকাশে প্রতিনিয়ত চলে ‘এই রৌদ্র এই মেঘ’ লুকোচুরি খেলা।
এর মাঝে হুট করে আসা একপশলা বৃষ্টিতে দৌড়ে পালায় জীবের দল। যা ছাগল তাড়ানো বৃষ্টি নামে পরিচিত। হুটহাট আসে হুটহাট চলেও যায়। আকাশের বুক থেকে চোখ নামিয়ে রাখলে নদীর ধারে, আরেক শুভ্রতা ধব ধব করে জ্বলে দোলে দোলে যায় বাতাসের শরীরে। এই শুভ্র দৃশ্যটা আর কোনো কিছুর নয়; কাশফুলের। কাশফুল দেখার জন্য, কাশবনে লুকিয়ে গিয়ে কাশফুলের নরম কোমল স্পর্শ নেয়ার আকুল আনন্দে নেচে ওঠেনি মন প্রাণ এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দায়। বাঁধহীন এমন আবেগ-উচ্ছ্বাস কিছুতেই দমিয়ে রাখা যায় না আর। এক মুহূর্ত বিলম্ব হওয়ার অপরাধবোধ জেগে ওঠে মনে। মনে হয় আর কখনো দেখতে পাবো না এমন অপরূপ শোভা। হয়তো বাতাসে কাশফুলের দোলা বুঝি এটিই শেষ। যা আর দেখা যাবে না কখনো। অথচ এ দোলা দুলতে থাকবে বাতাসে টানা প্রায় দু’মাস। কী এক অবদমিত আবেগে আচ্ছন্ন হয় যাই নিজেই বুঝতে পারি না। আবেগের খোলা দরজা দিয়ে ছুটতে থাকি কাশবনে। এই তো এই নদীর ধারে সবুজের প্রান্তরে কি অপরূপ শোভায় ফুটে আছে কাশফুল। কী মায়াময় সাদা। সাদা রঙও যে হৃদয়কে আলোড়িত করে কাশফুল না দেখলে হয়তো সাদা রঙের গভীর নান্দনিক সৌন্দর্য উপলব্ধ হতো না কখনো। এই শুভ্রতা দেখে দেখে শুভ্র হয়ে উঠি আমার ভেতর আমি। শুভ্রতার এক সাগরে ডুবে যাই ক্রমশ। পাপড়ির গহিন থেকে মৌমাছির মতো লুটাই শুভ্র মধু। শুভ্র তৃপ্তি। এত নরম, এত তুলতুলে হয় কাশফুল! হৃদয়ের বাহু বাড়িয়ে স্পর্শ না করলে মমতাহীন হয়ে পড়ে সমস্ত জীবনের অনুভূতি। শরতের কাশফুল শুধু কাশফুল নয়, এ যেন হ্যালির ধূমকেতু, ৭৫ বছর পর জেগে ওঠার নিয়ম ভাঙা অনিয়ম নিয়ে এসে শুভ্রতার মিছিল করছে কাশবনে। তারই ঢেউ আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে বলে কালো মেঘেরাও পালিয়ে গেল ঈশান কোণে! বাতাস তাই বাহন হয়ে আকাশে জমিনে ছড়াচ্ছে শরৎ শুভ্রতার আলো। পুরো ভাদ্র-আশ্বিন মাস আকাশে ও জমিনে চলে শুভ্রতার রাজত্ব। ঘাস প্রজাতির এই ছন উদ্ভিদ কোথাও কেউ রোপণ করেনি। আল্লাহর ইশারায় জেগে ওঠে গাঁয়ের নদী, ঝোপ-ঝাড়, রাস্তার আনাচে কানাচে এবং প্রভৃতি স্থানে। শরতের কাশফুল প্রকৃতিতে শুভ্রতা ছড়ানোর পাশাপাশি ছন গোত্রীয় উদ্ভিদ হওয়ায় মানুষের ব্যবহার্য উপাদান হয়ে উঠেছে। ভিটে বাড়ির চাল, বেড়া, মাদুর, ঝাড়ু, হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে প্রাচীনকাল থেকে। ঋতু হিসেবে এই শরতের শুভ্রতাই জীবনের অবসর কাটানোর প্রাণবন্ত সময়। কেননা, এ ঋতুতে কোনো ফসল ফলা বা তোলার কোনো ব্যস্ততা নেই মানুষের। নির্মল প্রকৃতি, সিক্ত বাতাস, বিকেলের সোনা রোদ, আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, কাশফুলের নরম স্পর্শে জীবনকে ঘুচিয়ে নেয়ার আরেকটি ঋতু কোথায় আছে আমার শরৎ ছাড়া।