একটানা কাজ করে ধপাস করে বসে পড়েছিলাম চেয়ারে।এখন আর শরীরে কুলোয় না এত কাজ একা হাতে করতে।একটু দম নিতে হয়।করোনার এ সময়টাতে কাজের লোক পাওয়াই যেন দুঃসাধ্য হয়ে পড়ল।প্রথম দিকে তো স্বেচ্ছায় স্ববেতনে ছুটি দিয়ে বিদায় করেছিলাম।আর এখন! এখন চেয়েও পাওয়া যাচ্ছে না।গৃহপরিচারিকারাও শহর ছেড়েছে। দুই-একজন যাও দেখা মেলে, সে কি গিয়ার! ‘চার বাসায় কাজ করি , আমার সময় নাই!’
প্রায় দু’মাস ধরে সংসারে কত ঘটনা ঘটে যাচ্ছে।করোনার স্রোতে ভেসে গেল কত প্রিয়জন।কতজন হাবুডুবু খেয়ে উঠল।সারাক্ষণ কি এক অশনিসঙ্কেতে মনটা এমনিতেই ভারাক্রান্ত হয়ে থাকে তার ওপর ঘরে ছোটখাটো দুর্ঘটনা লেগেই আছে।এই যেমন আজো পুড়ে গেল গরম পানির ছিটা এসে আমার গলার নিচটা।টুথপেস্ট লাগিয়ে দায় সেরেছিলাম মাত্র।এমনতরো নানান ভাবনাতে মনটা কেমন জানি অন্যমনস্ক হয়েছিল, কিন্তু কলিং বেলের শব্দ শুনে নিজেই উঠে গেলাম দরজা খুলতে।যথারীতি লুকিং গ্লাসে পরখ করলাম একনজরে। দু’দিন ধরে দারোয়ান রহিম মিয়াকে তোষামোদ করে যাচ্ছি একটা বুয়া খুঁজে দিতে।সেই-ই এলো নাকি! যেহেতু একজন মহিলাকেই দেখা গেল দরজার ওপাশে। দরজা খুলতেই মহিলাটি হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল।সাথে আরেকজন মেয়ে বয়সী মুখোশে ঢাকা দু’হাতে দুটি ব্যাগ নিয়ে অনুগামী হলো।কিছু বুঝে উঠার আগেই ভেতরে প্রবেশ করতে করতে কুশলাদি জিজ্ঞেস করছে মহিলাটি খুব আপনজনের মতো।
একটু যেন ভড়কে গেলাম।আবার ভাবলাম কোনো সুহৃদ হয়তো কাজের লোকসমেত কোনো পরিচিতজনকে পাঠিয়ে দিয়েছেন, যে নাকি আমাদের চেনেন হয়তো আমিই চিনতে পারছি না।যাই হোক, হৃদয়ের বিস্ময়তা হৃদয়েই চেপে রেখে তাড়াতাড়ি আলো জ্বালিয়ে, ফ্যান ছেড়ে দিয়ে ড্রইং রুমেই বসতে বললাম সৌজন্যতা দেখিয়ে।কিন্তু মহিলা ভেতরে প্রবেশে উদ্যত হয়ে বললেন; কেন ভেতরে বসি!
আমি দ্রুতে পথ আগলে বললাম, না, ভেতরে পুরুষ লোক আছে।পর্দানশিন মহিলা দেখে ভেবেছিলাম ওই কথাতে দমিয়ে দিতে পারব, কিন্তু না তিনি একপ্রকার ঠেলেই ঢুকতে চাইলেন।চেনা নেই জানা নেই এ কি সর্বনাশ! আবার এই করোনাকালে এমন বিভ্রাট!
সাথের সঙ্গীটির দিকে আরেকবার তাকালাম।চোখ পড়ল হাতে ধরা ব্যাগগুলোর দিকেও।রূপালি ইলিশ ঝকঝক করছে।একটা বাটিভরা কিছু একটা ভেতরে আরো কিছু হবে হয়তো; যেহেতু ব্যাগগুলো নিচে নামিয়ে রেখে ধরে রাখার কষ্ট লাঘব করছিল মেয়েটি।
কি বিড়ম্বনা! এসব বাজার সদাই নিয়ে এরা কারা?
ততক্ষণে মহিলা আরো অবাক কাণ্ড ঘটিয়ে দিলেন।তিনি ভেতরে ঢুকলেন না সত্যি, কিন্তু আমার প্রায় মূর্ছা যাওয়ার অবস্থা দেখে তৎক্ষণাৎ মুখের মুখোশটি সরিয়ে ফেললেন শুধু। আমি থ হয়ে গেলাম।চোখে যেন ধাঁ ধাঁ দেখছি।কানে বাজল, কি চিনতে পারছ না? এবার তো ভেতরে বসা যায়! বর্ষার ইলিশ পাঠাতে এবার দেরি হয়ে গেল।লকডাউনে বন্দী হয়ে কত দিন দেখিনি তোমাদের! আজ তাই অফিসে যাওয়ার পথে আগেই চলে এলাম তোমাদের কাছে।
আমি লজ্জায়, অপমানে একসার হয়ে গেলাম।নিজকে নিজে ধিক্কার দিতে লাগলামÑ ছি ছি, এ কেমন আমি? মুখোশের আড়ালে চেহারা তো দূরে থাক কণ্ঠস্বরও বুঝলাম না! এত শিগগিরই আপনজনকে ভুল করে ফেললাম?
করোনাকালীন এ সময়টাতে দীর্ঘ দিনের বিরতির পর আজ ও এলো! বরাবরের মতোই হাত বোঝাই বাজার নিয়েÑ নিশ্চয়ই পাশেই থাকা আমার ছোট ভাইটার জন্যই দ্বিতীয় ব্যাগটা! বর্ষার ইলিশ, বাড়ির তাল, নারকেলি কচু, শাপলা। বুঝতে আর বাকি থাকল না।বিস্ময়ের ওপর বিস্ময়! আত্মজা প্রতিম এ সংসারের প্রথম ভাগ্নি যাকে আমরা মায়ের আসনে বসাতেও দ্বিধা করি নাÑ তাকেই কি না আমি চিনতে পারলাম না! ‘মমতা’ বলে চিৎকার করে জড়িয়ে ধরলাম আর সম্বিত ফিরে পাওয়ার মতো বলতে থাকলামÑ তবে কি মুখোশের আড়ালে এভাবেই ঢাকা পড়বে আপন অবয়ব!
‘ওর কণ্ঠ বাজল আবারো; কত দিন দেখিনি তোমাদের! লকডাউনে বন্দী থেকে চেহারাটা তো দূরে থাক কণ্ঠস্বরটাও ভুলে গেলে?
একদিন মুখোশের আড়ালে এভাবেই অচেনা হয়ে যাবে কি সব প্রিয়জন, আর কত দিন! হ
একটানা কাজ করে ধপাস করে বসে পড়েছিলাম চেয়ারে।এখন আর শরীরে কুলোয় না এত কাজ একা হাতে করতে।একটু দম নিতে হয়।করোনার এ সময়টাতে কাজের লোক পাওয়াই...
