এক সকালে ছেলেটি দৌড়ে গিয়ে তার মাকে প্রশ্ন করল, মা কোনটা আগেÑ জীবন না জীবিকা? মাও হতবাক কোনটা আগে বলবে, কারণ দুটোই তো একে অপরের পরিপূরক। তবু একটু ভেবে উত্তর দিলেন, অবশ্যই আগে জীবন কারণ জীবনের জন্যই তো জীবিকা। এত সংগ্রাম করে বেঁচে থাকা, সবার সাথে এত লড়াই করে টিকে থাকা। আমরা তো জীবিকা নির্বাহ করি জীবনকে টিকিয়ে রাখার জন্যই কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে জীবন জীবিকার জন্য প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও খেটে খাওয়া মানুষ, সাধারণ দিনমজুর সবাই ছুটে চলেছে জীবনকে বাঁচানোর নেশায়, জীবিকার খোরাক জোগাতে।
সরকারের কড়া নির্দেশ আর মৃত্যু ভয়ের দোটানায় বেশির ভাগ লোক জীবিকা হারিয়েছে। এর ফলে টিভিতে, পেপারে শিরোনামে উঠে আসছে পরিবারের অভাব অনটনে দুশ্চিন্তায় আত্মঘাতী। সত্যি এ যেন ত্রিকোণ যোগ জীবনকে বাঁচাতে জীবিকার দরজায় গিয়ে দেখে দ্বার বন্ধ তখন বেচারা পরিবারের হাহাকার আর অভাবের কথা ভেবে নিজেকে অপদার্থ বানিয়ে বেছে নেয় জীবন ধ্বংসের পথ। তখন সেই সব পরিবারগুলো দু’চার দিন টিভিতে উঠে আসে বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রাণ পায়। কিন্তু, কিছু দিন পর তারা আধুনিকতা আর বাস্তবতার স্রোতে বিলীন হয়ে যায়। এর আগেও মানুষকে প্রমাণ দিতে হয়েছে জীবন আগে না জীবিকা? ইতিহাসের পাতায় রয়েছে সেই ছিয়াত্তরের মন্বন্তর আর বাংলায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ পঞ্চাশের দুর্ভিক্ষ। তখন ইংরেজদের অধীনে আমরা ছিলাম, তাই তখন দুর্ভিক্ষের প্রকোপটা একটু বেশিই ছিল। কিন্তু বিভিন্ন অভিজাত পরিবার খাবারকে গুদামজাত করে কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করে বাজারে দাম বাড়িয়ে ছিল আকাশ ছোঁয়া তারা বাধ্য করেছিল সাধারণ মানুষকে কুকুরের সাথে খাবার ভাগ করে নিতে। কিন্তু, তবুও মানুষ তাদের জীবনকে রক্ষা করেছিল হাজার প্রতিকূলতার মধ্যেও। তবে বহু অসহায় খাবার, বাসস্থান, আর চিকিৎসার অভাবে জীবন ত্যাগ করেছিল। এসব ঘটে যাওয়ার বহুকাল পরেও আজও যেন তার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। শুধু যে সচেতনতার অভাব তা নয় সাধারণ মানুষ সচেতন হবে কিভাবে? বাইরে না হয় লকডাউন। কিন্তু, বাড়িতে তো সব স্বাভাবিক তাই পরিবারের লোককে দুটো অর্থের জন্য ছুটে যেতে হচ্ছে পাগলের মতো আর তখনই সাহেব সুবোধরা গাড়ি থেকে নেমে মাস্ক না পরার অপরাধে হাত পেতে ভিক্ষা নিচ্ছে। সে সারা দিন যতটুকু রোজগার করেছিল সবই তুলে দিতে হচ্ছে তার হাতে। নইলে ধরে নিয়ে যাবে থানায় তখন আরো টাকা লাগবে। আজ কবিগুরুর সেই লাইনটা বড়ই প্রাসঙ্গিক- ‘তুমি রাজা হাত পেতে ভিক্ষা চাইছ ভিখারি ভিক্ষুকের কাছে।’
২০২০ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে বেকারত্বের সংখ্যাটা আরো প্রকট হয়েছে। সেখান থেকে আমাদের দেশও বাদ পড়েনি। যারা নিজের জেলা থেকে অন্য জেলায় গিয়েছিল কাজের জন্য তারা গত বছর থেকে চরম দুর্ভোগে পড়েছে। নিজের বাড়ি ফেরার মতো টাকাও নেই আর। সরকারি সাহায্য হয়তো এসেছে এবং তা হয়তো কিছু লোক পেয়েছেও। কিন্তু, বেশির ভাগই পড়ে রয়েছে অন্য জেলায়। অনাহার আর চিকিৎসার অভাবে বেশ কিছু শ্রমিক সেখানেই মারা গেছে। সব থেকে বেশি বিপাকে পড়েছিল যেসব শ্রমিক তাদের পরিবার নিয়ে গিয়েছিল। অনেকে জীবন বাঁচানোর নেশায় নিজের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল সাইকেলে চড়ে। কেউ কেউ আবার হেঁটে। হাঁটতে হাঁটতে যখন ক্লান্ত হয়ে রেললাইনে, রাস্তায় একটু ঘুমিয়ে পড়েছে তখনই অজান্তে ট্রেন কিংবা অটো এসে কেড়ে নিয়েছে তাদের সংগ্রামী জীবন। বহু অমানবিক ঘটনা নজরে এসেছে গত দেড় বছরে। এক স্টেশনে এক ছোট্ট শিশু তার মায়ের কাপড় টেনে ঘুম ভাঙাচ্ছে কিন্তু, সে বুঝতে পারেনি তার মা মারা গেছে। তবে এসব করুণ চিত্র কি জীবনযুদ্ধের চিত্র নয়?
এই চলতি বছরে বেকারত্বের হার বেড়েছে বহুগুণ। এই কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষগুলো খাবে কী? তাদের সংসারইবা চলবে কিভাবে? তাদের তো বসে বসে মরা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। জীবন আর জীবিকার মাঝখানে পড়ে হয়তো অনেকে দম বন্ধ হয়ে মারাও যাবে। তবু জীবিকার পিছু ছাড়বে না মানুষ। জীবন চলে জীবিকার হাত ধরে। আর মানুষের আবিষ্কৃত জীবিকাই তো দেশকে সমৃদ্ধ করে। এই বর্তমান পরিস্থিতি মানুষকে হাতে কলমে বুঝিয়ে দিয়েছে জীবনের মূল্য কতখানি। তাই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে অবশ্যই থাকবে জীবন বনাম জীবিকা উভয়ই।হ