(গত সংখ্যার পর )
অর্থাৎ সে যেনতেন তরিকায় সম্পদ আহরণ করতে পারে না। প্রাচীনকালে যখন সমাজ এবং রাষ্ট্র ছিল না, তখনো মানুষের দায়বদ্ধতা ছিল গোত্র, পরিবার ও আপন বিবেকের কাছে। তাহলে এ পর্যন্ত আমরা পশুর সাথে মানুষের দুটো মৌলিক তফাৎ পেলাম। প্রথমত, ‘অসীম চাহিদা’ এবং দ্বিতীয়ত, ‘দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা’। তৃতীয় যে বৈশিষ্ট্য মানুষের মর্যাদাকে পশুর চেয়ে যোজন যোজন উপরে তুলে ধরে সেটা হলো- মানুষ বিচার-বিবেচনাসম্পন্ন প্রাণী। দু’জন মানুষের মধ্যে ঝগড়াঝাটি ও মারামারি হলে তৃতীয় জন বুদ্ধি-বিবেচনা ও ন্যায়নীতির ভিত্তিতে বিচার ফয়সালা করে দিতে পারে। পক্ষান্তরে পশুর এই যোগ্যতা নেই। এই তিনটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য মানুষ ও পশুর মাঝে যে বিভাজনের দেয়াল তুলেছে সে দেয়াল বিবর্তনবাদের হাত ধরে ক্রমে ক্রমে কিভাবে টপকানো যায়, তা আমার জানা নেই। মানুষ হিসেবে আমাদের চাহিদা যেমন সীমাহীন তেমনি বিজ্ঞানী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কাছে আমাদের আছে অশেষ অশেষ ঋণ। আগুন, চাকা, বিদ্যুৎ, গাড়ি, উড়োজাহাজ, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, পেনিসিলিন, অ্যানেস্থেশিয়া, এমআরআই, মহাশূন্য যান, উপগ্রহ প্রযুক্তি ইত্যাদি সবই বিজ্ঞানের অবদান। এগুলো আমাদের জীবন, জীবনযাত্রা ও চিন্তাভাবনার খোলনলচে পাল্টে দিয়েছে। বৈজ্ঞানিক উপকরণ ছাড়া আজকাল আমরা এক মুহূর্তের কথাও ভাবতে পারি না। এ সব কিছু মেনে নেয়ার পরও আমি আমার বিজ্ঞানপ্রেমী বন্ধুদের একটি বিষয় ভেবে দেখতে বলব। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষের জীবনের জন্য যত কিছু তৈরি করেছে তার কোনোটিই কিন্তু নির্ভেজাল ও নিখুঁত আশীর্বাদ নয়। কম হোক বেশি হোক, বিজ্ঞানজাত এমন কোনো উপাদান উপকরণ নেই যার কোনো নেতিবাচক অভিঘাত মানুষের জীবন ও প্রকৃতির ওপর পড়ছে না। তাই বলে আমি এ কথা বলছি না যে, আজই আমি গাড়ি চড়া, ইন্টারনেট ব্যবহার কিংবা ডাক্তারের কাছে যাওয়া বন্ধ করে দেবো। আমি যা বলতে চাচ্ছি তা হলো, এক দিকে বিজ্ঞানের সম্ভাবনা যেমন অপরিসীম, অন্য দিকে তেমনি আবার প্রতিটি ক্ষেত্রে তার সীমাবদ্ধতাও তর্কাতীতভাবে প্রমাণিত। উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি, এক দিকে কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের উপকারিতার শেষ নেই, অন্য দিকে এর অসংখ্য নেতিবাচক ও ক্ষতিকারক অভিঘাতের কথা আমরা সবাই জানি, এটি ব্যাখ্যা করারও দরকার পড়ে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের কথা যদি বলি, ক্যান্সারের ওষুধের যেমন রয়েছে মারাত্মক নেতিবাচক পাশর্^প্রতিক্রিয়া, সামান্য হলেও তেমনি খারাপ পাশর্^প্রতিক্রিয়া রয়েছে মাথাব্যথায় সেবন করা একটি মামুলি ‘টাইলেনল’ বড়িতে।
এখন বস্তুজগতের একটি অভিনব রহস্যের কথা বলতে চাই। আমাদের এই বিশ^ব্রহ্মাণ্ডে চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র যা কিছু আছে তার সবই সীমিত সংখ্যক মৌলিক পদার্থের সমন্বয়ে গঠিত। যেকোনো পদার্থকে যদি আমরা ক্রমাগত ভাঙতে থাকি, তাহলে ভাঙতে ভাঙতে একসময় চলে যাবো অণু-পরমাণু পর্যায়ে। পরমাণুর ভেতরে কী আছে? আছে প্রোটন, নিউট্রন ও ইলেকট্রন। এগুলো তিন ধরনের কণা, যাদের চোখে দেখা যায় না- এমনকি সবচেয়ে তীক্ষè অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে নয়, তবে গবেষণাগারে পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে কেবল অনুভব করা যায়, অনুভব করা যায় যে, ওই পর্যায়ে বস্তু তার আপন বৈশিষ্ট্য ও অস্তিত্ব হারিয়ে বিলীন হয়ে গেছে এক জাতীয় সম্ভাবনাপ্রসূত তরঙ্গ ফাংশন অথবা আলোর কণায়। অন্য ভাষায় বলতে গেলে বলা যায়, বস্তুর মূলে গেলে আর বস্তু পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় অ্যানার্জি বা শক্তি।
সব শেষে, সৃষ্টি রহস্য নিয়ে কৌতূহলী মানুষের চূড়ান্ত প্রশ্নে বিজ্ঞানের অবস্থান নিয়ে সংক্ষেপে কয়েকটি কথা বলে আজকের লেখাটির ইতি টানব। অবিজ্ঞানী সাধারণ মানুষের পক্ষে আলোচ্য বিষয়টি সমঝে নেয়া একেবারে সহজ না হলেও কঠিন নয়। এবার দেখা যাক মহাবিশে^র মহাসৃষ্টি কেন ও কিভাবে হয়েছিল? এ প্রশ্নে বিজ্ঞান কী উত্তর দেয়। বিজ্ঞানের মতে, সৃষ্টির সূচনা হয়েছে ‘বিগ ব্যাং সিঙ্গুলারিটি’-তে। ওই পর্যায়ে মহাবিশে^র যাবতীয় বস্তু ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র, সীমাহীন ক্ষুদ্র একটি বিন্দুতে জমাট বাঁধা ছিল। ওই বিন্দুর ঘনত্ব ছিল অসীম, বক্রতাও ছিল অসীম এবং তার আকার ছিল এতই ছোট যেন শূন্যেরই নামান্তর। দশ থেকে বিশ বিলিয়ন বছর আগে, ওই জমাট বাঁধা বিন্দুতে ‘বিগ ব্যাং’ বিস্ফোরণ ঘটে, যার মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয় স্থান (স্পেস) ও তার নিরন্তর সম্প্রসারণ প্রক্রিয়া এবং কাল (টাইম) ও তার নিরন্তর পথ চলা। বিগত ১০০ বছরে বিজ্ঞানী ও মহাবিজ্ঞানীরা অনেক জটিল ও কঠিন তত্ত্ব ও সূত্র আবিষ্কার করেছেন যা দিয়ে মহাবিশে^র যে কোনো সময়ের অবস্থা পর্যালোচনা করে আগামীতে কী হতে পারে সেই মর্মে ভবিষ্যৎবাণী করছেন এবং সেগুলো মোটামুটি সঠিকই হচ্ছে, কিন্তু সৃষ্টির ‘বিগ ব্যাং’ রহস্য উন্মোচনের জন্য ওইসব তত্ত্বজাত সমীকরণগুলোকে যখন অসীম ঘনত্ব ও বক্রতাসম্পন্ন এবং অসীম ক্ষুদ্রকায় ওই জমাট বাঁধা বিন্দুতে নিয়ে প্রয়োগ করা হয় তখন গোটা তত্ত্ব ভেঙে খান খান হয়ে ধসে পড়ে। সসীমে যা কাজ করে, অসীমে তা অচল! তাই সৃষ্টি রহস্যের মূল প্রশ্নে (জমাট বাঁধা বিন্দুটি কেন বিস্ফোরিত হলো?) মহাবিজ্ঞানীরা অনাথ শিশুর মতো অসহায়!
বি: দ্র: এই লেখায় যদি কোনো কৃতিত্ব থেকে থাকে তবে তার দাবিদার জাকির মাহদিন এবং মাহবুুবুর রহমান চৌধুরী। ভুল-ভ্রান্তি যা আছে তার দায়ভার আমার, একান্তই আমার। (শেষ)
(গত সংখ্যার পর )অর্থাৎ সে যেনতেন তরিকায় সম্পদ আহরণ করতে পারে না। প্রাচীনকালে যখন সমাজ এবং রাষ্ট্র ছিল না, তখনো মানুষের দায়বদ্ধতা ছিল গোত্র, পরিবার...
