দিল আফরোজ রিমালাল সবুজের দেশ বাংলাদেশ। ধানের দেশ, গানের দেশ, প্রাণের দেশ, মায়ার দেশ আমার এই বাংলাদেশ। স্বাধীন বাংলাদেশ। হ্যাঁ, অনেক সাধনায়, অনেক মূল্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে এ দেশ। ১৯৭১ সালে এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের এ স্বাধীনতা আর স্বাধীন বাংলা। ১৯৭১ সাল ১৬ ডিসেম্বর বাংলা দেশের আকাশে উদিত হয়েছিল বিজয়ী সূর্য। আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ১৬ ডিসেম্বর। বাংলার দামাল ছেলেরা দীর্ঘ নয় মাস। সংগ্রাম করেছিল আর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটিয়ে বাংলার মাটি শত্রুমুক্ত করে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল। এ বিজয়ের গৌরব ও আনন্দ চির অম্লান হয়ে আছে, থাকবে আমাদের মনে, আমাদের জাতীয় জীবনে। তবে এ বিজয়ের পিছনে। রয়েছে ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মবলিদান, দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জত, অনেক ত্যাগ তিতিক্ষা। রক্তনদীর উজান বেয়ে আমরা যে বিজয় পেয়েছিলাম, সে বিজয় দিবস আমাদের জাতীর সামনে খুলে দিয়েছিল আমিত সম্ভাবনার স্বর্ণদোয়ার। ১৬ ডিসেম্বর আমাদের মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সাল ১৬ ডিসেম্বর প্রমাণিত হয়েছিল, আমাদের দেশ আয়তনে ছোট হলেও আমরা ছোট নই। আমরা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে ছিনিয়ে আনতে পারি স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারি দেশের সার্বভৌমত্ব। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য যথার্থই বলেছিলেন শাবাশ বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়, জ্বলে পুড়ে- ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়।
প্রায় দুই শত বছর শোষণের পর ১৯৪৭ সালে তীব্র আন্দোলনের মুখে ব্রিটিশরা এ উপমহাদেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। ১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট যথাক্রমে পাকিস্তান ও ভারত দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। মুসলমান অধ্যুষিত পাকিস্তান রাষ্ট্রটি মূলত দুটি আলাদা ভূখণ্ডে বিভক্ত হয়। একটি পশ্চিম পাকিস্তান আর একটি আমাদের বাংলাদেশ, তৎকালীন সময়ে যার নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান। শুরু থেকেই গোটা পাকিস্তান রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী। রাষ্ট্রের যাবতীয় কাজ কর্ম অফিস আদালত সবকিছু পশ্চিম পাকিস্তান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো। মোট কথা পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, কোনো ক্ষেত্রেই স্বাধীনতা দেয়নি। ফলে সঙ্গত কারণেই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের মনে পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ থেকে মুক্তি পাওয়ার আশা জাগে। ১৯৫২ সালে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা বানাতে চাইলে বাঙালির মনে স্বাধীনতার গোপন ইচ্ছাটা প্রবল আকার ধারণ করে। মূলত ৫২ এর ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই স্বাধীনতা সংগ্রামের সূত্রপাত হয়েছিল। ৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬ এর ছয় দফা এবং ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত্তি মজবুত হয়। ১৯৭০ সালের পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবুর রহমান কে বিপুল ভােটে জয়যুক্ত করে। কিন্তু বাঙালির স্বপ্ন পূরণ হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের সরকার নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে দমন পীরনের পথ বেছে নেয়। এর প্রতিবাদে বাঙালির জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সাল ৭ মার্চ, ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বাংলার আপামর জনসাধারণের উদ্দেশে মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য আহবান জানান। সারা বাংলায় শুরু হয় তুমুল আন্দোলন। শেখ মুজিবুর রহমানকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয়। ২৫ শে মার্চ গভীর রাতেই মেজর জেনারেল টিক্কা খানের নির্দেশে পাকিস্তানি বাহিনী রাজধানীর ঘুমন্ত নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগে ছাত্রাবাস, ইপিআর ও রাজাবাগ পুলিশ লাইনে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায়। পাক বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের মুখে জলে উঠে বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালে ১০ এপ্রিল তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে আনুষ্ঠানিকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের একটি প্রবাসী সরকার মুজিবনগর সরকার গঠিত করে। এই সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মুক্তিসংগ্রাম। বাঙালি কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-ছাত্রী-শিক্ষক, শিল্পী, সাহিত্যিক, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এ দেশের সাধারণ মানুষ মুক্তি যুদ্ধে অংশ নেয়। এছাড়া পুলিশ, আনসার, ইপিআর, ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে, সরকারি কর্মচারী, বুদ্ধিজীবীদের। নিয়ে গড়ে ওঠে মুক্তিবাহিনী।
১৯৭১ সাল ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। পাকবাহিনী তখন আরো মরিয়া হয়ে ওঠে এবং নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায়। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ। মুক্তি যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল আতাউল গনি ওসমানীর নেতৃত্বে। বাংলাদেশকে ১১টা সেক্টরে ভাগ করা হয়। দিন যেতে যেতে সুসংগঠিত হয় মুক্তিবাহিনী। বিশাল শত্রুবাহিনী আধুনিক অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়েও মুক্তি বাহিনীর মুকাবেলায় সক্ষম হচ্ছিল না। চলতে থাকে যুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাস ধরে চলে বাঙালির রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। বাঙালির রক্তের বিনিময়ে, প্রাণের বিনিময়ে, সম্মানের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় বাংলার স্বাধীনতা। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধে পাকিস্তানিদের অবস্থান দুর্বল হয়ে আসে। পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে তাদেও যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিন্ন হয়ে যায়। কোন উপায় খুঁজে না পেয়ে হানাদার পাকবাহিনী ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনীর কাছে নিঃশর্ত ভাবে আত্মসমর্পণ করে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকেল ৫টা ১ মিনিটে ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানে যৌথ কমান্ডের পক্ষে। লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা অনেকে এবং পাকিস্তানের পক্ষে লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজি পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ছিল বাঙালির বহু ত্যাগ তিতিক্ষা ও সাধনার ফল। সেদিন সাত কোটি মানুষের মহা উৎসবের দিন ছিল ১৬ই ডিসেম্বর। আজ প্রায় সতর কোটি মানুষের প্রাণের উৎসব ১৬ই ডিসেম্বর। সেদিন নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের দুঃসহ স্মৃতি, স্বজন হারানাের বেদনা সবকিছু ভুলে মানুষ দলে দলে নেমে এসেছিল রাজপথে। সবার হাতে ছিল স্বাধীন। বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা। দুঃস্বহ অতীতকে ভুলে মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল সম্ভাবনাময় আগামীর বাংলাদেশের। বাংলার জাতীয় জীবনে এর চেয়ে আনন্দের দিন আর নেই।
মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির জাতীয় জীবনের এক চেতনার নাম। আর বিজয় দিবস সেই চেতনাকে ছড়িয়ে দিয়েছে বাঙালির মনে প্রাণে। সমগ্র জাতি একতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে এই যুদ্ধের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। মুক্তি যুদ্ধের কারণেই জাগ্রত চেতনা ছড়িয়ে গেছে বাংলাদেশের মানুষের পরবর্তী কর্মকাণ্ডে। ব্যাক্তি স্বাধীনতা, নারী মুক্তি আন্দোলন, নারী শিক্ষা, গণশিক্ষা, সংবাদ পত্রের ব্যাপক বিকাশ, সর্বোপরি গণতান্ত্রিক অধিকার চেতনা ব্যপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করেছে সমাজে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের সাহিত্যে, বিশেষ করে কবিতা ও কথা সাহিত্যে এক নবতর সাহিত্য ধারার জন্ম দিয়েছে। আমাদের দেশাত্মবোধক গানের ক্ষেত্রে এক নতুন জোয়ার এনেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। অসংখ্য গীতিকার তাদের গানে রচনা করেছেন মুক্তিযুদ্ধের বিজয়গাথা। মুক্তিযুদ্ধের এই চেতনা প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রয়োজন দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্ঘবদ্ধ পায়াস ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে আন্তরিক পদক্ষেপ। এজন্য দুর্নীতি মুক্ত। কল্যাণমূলক শাসন ব্যবস্থা প্রয়োজন। যে আদর্শ লক্ষ চেতনা নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিকামী লক্ষ লক্ষ মানুষ। তাদের তাজা প্রাণ দিয়েছে, শত সহস্র মা বোন ইজ্জত দিয়েছে- সমাজ ও জাতীয় জীবনে মুক্তিযুদ্ধের সেই আদর্শ বা চেতনাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করাই হোক সবার লক্ষ।
এক সাগর রক্ত আর ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের সোনার বাংলাদেশ। বিজয় দিবস স্বাধীনতাকামী বাঙালির পবিত্র চেতনার ধারক। এই দিন বাঙালির চেতনা জাগরণের দিন। সেই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এগিয়ে যেতে হবে। আব্দুল লতিফের ভাষায় এবং সুরে সুর মিলিয়ে গাইতে ইচ্ছে করছে দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা কারো দানে পাওয়া নয়। আমি দাম দিছি প্রাণ লক্ষ কোটি জানা আছে জগতময়।