ফজরের নামাজ শেষ করে উঠে দাঁড়ান রেহানা পারভীন। টেবিলের কাছে গিয়ে স্ট্যানে বাঁধানো ছবিটা হাতে তুলে নেন। প্রতিদিনের মতো আজো পরম মমতায় তার কাঁপা কাঁপা হাতে শাড়ির আঁচলে মুছে নেন ছবিটা। অনিমেষ চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। রেহানা পারভীনের মনে পরে আজই সেই স্মৃতিঘেরা ১৬ ডিসেম্বর। তার দুচোখে ভেসে ওঠে সে দিনের সব কিছু। সে দিন অত্যাচারিত অপমানিত হয়ে নিজের সম্ভ্রম হারিয়ে বিজয়ের নিশান হাতে নিয়ে বীরাঙ্গনা হয়ে ফিরে এসেছিলেন রেহানা পারভীন। অনেক কিছু হারালেও ফিরিয়ে এনেছিল দেশের স্বাধীনতা আর সার্বভৌমত্ব। ১৯৭১ সাল, দেশে শুরু হয় মুক্তি সংগ্রাম। রেহানা পারভীন তখন সদ্য কলেজে পড়া তরুণী। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তার শিরায়-উপশিরায় আর স্বাধীন দেশের স্বপ্ন ছিল দুটি চোখে। তিনি দেশের জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য চেতনা জাগানিয়া কবিতা লিখতেন। একদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাড়ি থেকেই তাকে তুলে নিয়ে যায়। সীমাহীন অত্যাচারিত হয়ে যখন অসুস্থ অবস্থায় ঘরে ফেরার ভাগ্য হয়নি। বিতারিত হয়েছিল গ্রাম থেকে মা-বাবার কাছ থেকেও। সেই দিন এই ছবির মানুষটিই তাকে সম্মান দিয়ে বিয়ে করে ঘরে তুলেছিলেন। যুদ্ধের সময় মুসফিক আহাম্মেদ চার নম্বর সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন একজন বীরাঙ্গনার জীবনে কতটা কষ্টের সময় পার হয়েছে। তাই রেহানা পারভীনকে সম্মান দিয়েছেন। চিকিৎসা করিয়ে সেবা করে সারিয়ে তুলেছেন। একসময় দু’জন সুখী দম্পতি দুই ছেলে মেয়ের মা-বাবা হন। ছবিটার দিকে তাকিয়ে এত কিছু ভাবেন রেহানা পারভীন। আর ভাবেন, সে তো ভালো একজন মানুষের কাছে খুব ভালো ছিল কিন্তু আরো অনেকেই বীরাঙ্গনা হয়েছিলেন, তারা কেমন আছে। কে রেখেছে তাদের খবর। কয়জনকে সমাজ মেনে নিয়েছে। এ সমাজ বড় নিষ্ঠুর।
যে মানুষটি তাকে সম্মানের আশ্রয় দিয়েছিল সেই মানুষটি যে আজ পাশে নেই। পরম যতেœ আবারও তিনি আঁচলে ছবিটা মুছে নেন। তখন কচিকণ্ঠের ডাক শোনা যায়- দাদো আজ বিজয়। চলো পতাকা দিয়ে বাড়িটা সাজাই।