‘তোমাদের যা বলার ছিল বলবে কি বাংলাদেশ?’
শুরুতেই সত্য স্বীকারোক্তি দিয়ে শুরু করছি। কারণ এই প্রশ্নটি অবশ্যই আমার নয়। প্রশ্নটি করেছিলেন আজ থেকে কয়েক দশক আগে কবি আসাদ চৌধুরী তার লেখা ‘শহীদদের প্রতি’ কবিতায়।
তবে পাঠক মনে এখন যে প্রশ্নের পর্দা পড়ল সেটা সরাতে বলতে হয়, দেখতে দেখতে বিজয়ের ৫০ বর্ষ ছুঁয়ে ফেলেছে বাংলাদেশ! একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর সমগ্র বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়ে এ দেশের সর্বস্তরের জনগণ ছিনিয়ে এনেছিল মহান বিজয় দিবস। রক্ত, লাশ এবং ধর্ষণ কয়েকটি শব্দই ছিল সেই পাঠের মহানায়ক। আরো খোলাসা করে বলতে হয়-
৩০ লাখ শহীদ এবং দুই লাক মা-বোনের সম্ভ্রমে এসেছিল এ দেশের বিজয়। আর যেই সংগ্রামের সূচনার পেরেকটি এ বাঙালির বুকে পুঁতে দেয়া হয়েছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দালনের সময়। সেই পেরেকটিই জাতি উপড়ে ফেলে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর। দীর্ঘ সংগ্রামের বলতে অর্জিত এই বিজয়ের ঘাঁটিতে মৌমাছি হয়ে আজ যারা স্বাধীনতার মধুর স্বাদ গ্রহণ করছে। তাদের তো কবির সেই প্রশ্নটা স্মরণ করানো যেতেই পারে। আর এই মনে করানোটাও যে অযৌক্তিক নয় সেটা কিন্তু বোঝা যায় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের মহান উক্তিটি পড়ে, ‘আমরা বর্তমানকে নিয়ে বাঁচলেও কিছু কিছু অতীত তার কালো সিল শক্ত করে বসিয়ে দেয়, কিছুতেই যা তুলে ফেলা যায় না’ (তথ্য : নিশীথিনী, হুমায়ূন আহমেদ)। তেমনি একাত্তরের বিজয় ইতিহাস এ দেশের বুকে যে সিল মেরেছে তা কখনো মন থেকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। তবে আজ এই প্রশ্ন মনে করিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্য কাউকে দায়ী করা নয়, বরং বিজয়ের পঞ্চাশের শুভ ক্ষণটাকে আরো নতুন উদ্যমে এগিয়ে নেয়ার জন্যই একটু ঝালাই।
যেহেতু স্বাধীনতা নিয়েই আলোচনার ইস্যু তাহলে স্বাধীনতাটি কী এ প্রসঙ্গের ঝুলিতে একটু ঝারা দেয়া যেতেই পারে। সাধারণভাবে স্বাধীনতা বলতে নিজের ইচ্ছেমতো কাজ করার অবাধ অধিকারকে বোঝায়। স্বাধীনতাকে মনীষীরা ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছেন। এ ক্ষেত্রে বিখ্যাত প্রাবন্ধিক ইসমাইল হোসেন সিরাজির কথাটি বলা যেতেই পারে, ‘আলোক ব্যতীত যেমন পৃথিবী জাগে না, স্বাধীনতা ব্যতীত তেমনি জাতি কখনো বাঁচতে পারে না।’ মন খুলে যদি বলতে হয় যেমন এ দেশের কৃষকদের দিয়েই বলা যায়। এখন যে ফসল উৎপাদন করা হয় তার রাজস্ব আয় অন্য দেশের কোষাগারে জমা হয় না। সেটা ব্যবহার করা হয় বাংলাদেশের উন্নয়ন কাজে। কিন্তু ওই সময় বেশির ভাগ ব্যবহার হতো পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে। আবার এ দেশের লোক সেই সময় ক্ষুধার সাথেও যুদ্ধ করেছে। দুঃশাসন ও অপশাসনের অধ্যায় পরিবর্তন করাই হয়েছিল একাত্তরের সংগ্রামের মাধ্যমে। তবে এই আনন্দঘন মুহূর্তের ফাঁকে আরো একটি বিখ্যাত সতর্কবার্তা মনে না করিয়ে দিয়ে পারলাম না। ‘স্বাধীনতা অর্জনের চাইতে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন’। আর এই প্রসঙ্গটি মনে রেখে অবশ্যই স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রস্তুতি নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে নিচের কাজগুলো করা যেতে পারে-
১. স্বাধীনতা যুদ্ধের ধারাবাহিকতার সঠিক বীভৎস ইতিহাস বা ঘটনা অবশ্যই সবাইকে জানাতে হবে। ইতিহাস অনভিজ্ঞ কোনো ব্যক্তি কখনোই স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এগিয়ে আসতে পারে না। ইতিহাসটা কেমন বীভৎস ছিল তা জানার জন্য একটু কান পাততে পারি কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লøাহর কবিতার কথায় , ‘বাতাসে লাশের গন্ধ ভাসে,
স্ত্রীর তন্দ্রার ভিতর আমি শুনি ধর্ষিতার করুণ চিৎকার!
নদীতে পানার মতো ভেসে থাকা মানুষের পচা লাশ’ (কবিতা : বাতাসে লাশের গন্ধ, রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লøাহ)!
দেশপ্রেমের সঠিক চর্চাটাও চালিয়ে যেতে হবে প্রত্যেকটি কাজে। মনে হতে পারে, এখন তো যুদ্ধ নেই তাহলে কিভাবে দেশকে ভালোবাসা যায়।
নারীর সঠিক মর্যাদা ফিরিয়ে আনতেই হবে। আর যে কথাটি বলেছেন স্বয়ং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম নিজে। ‘বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর’। আর কবির কথার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলেছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। যেখানে দুই লাখ মা-বোন তারা জীবন ও সম্ভ্রমের বিনিময়েও ছিনিয়ে এনেছেন স্বাধীনতা। কোনো অংশেই নারীর ভূমিকা কম ছিল না।
কবি-সাহিত্যিকদের অবশ্যই দেশপ্রেম জাগ্রত করার জন্য বেশি বেশি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক লেখা উপহার দিতে হবে। যে কাজটি করেছিলেন ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির সময় সাহসী কবি কবি ইকবাল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় কবি আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান প্রমুখসহ আরো গুণী কবিরা। তবে এ ক্ষেত্রে কবিদের একাত্তরের যুদ্ধে ভূমিকার একটি সঠিক ধারণা পাওয়া যায় লোকান্তরের কবি আল মাহমুদের রচিত ‘উপমহাদেশ’ নামক উপন্যাসে। সেখানে মিতু নামের মেয়েটি বড় আনন্দের সাথে কবি হাদী মীরকে উদ্দেশ করে বলেছিল ‘মামা লিখবে আর আমরা গাইব, মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি’। ঠিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে পত্রিকাসহ অনলাইনের মাধ্যমে দেশের বর্তমান প্রজন্মের কবি-লেখকদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
বিজয় অর্জনের যে মূল উদ্দেশ্য ছিল সেটা যুদ্ধপরবর্তী সময় জাতি হিসেবে আমরা যতটুকু পালন করেছি তার মধ্যে কিছু হতাশার নানা দিক অবশ্যই আমাদের বুকে পীড়া দেয়। যেহেতু প্রথমেই বলেছিলাম কাউকে এর জন্য দায়ী করব না। সেই আলোকেই বলব, আসুন আমরা পেছনের সব হিসাব বাদ দিয়ে বিজয়ের পঞ্চাশে নতুনভাবে সঙ্কল্পবদ্ধ হই। আর তা না হলে কী ভয়াবহ কাণ্ড ঘটতে পারে তার একটি ইঙ্গিত অনেক আগেই দিয়ে গেছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘মনুষ্য সমাজ একটা জটিল ভ্রমের জাল, ঠিক সময়ে ঠিক কাজ করিতে কাহারো মনে পড়ে না, তাহার পরে বেঠিক সময়ে বেঠিক বাসনা লইয়া অস্থির হইয়া মরে’ (একরাত্রি- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। সুবর্ণজয়ন্তী হোক আমাদের স্বাধীনতার। সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করার নতুন চ্যালেঞ্জ।
‘তোমাদের যা বলার ছিল বলবে কি বাংলাদেশ?’ শুরুতেই সত্য স্বীকারোক্তি দিয়ে শুরু করছি। কারণ এই প্রশ্নটি অবশ্যই আমার নয়। প্রশ্নটি করেছিলেন আজ থেকে কয়েক দশক...
