সেলিব্রেটি কাদের বলে! যারা পাবলিকের বড় একটি অংশের কাছে কোনোভাবে পরিচিত, পাবলিকের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। কি কাজে পরিচিত, তার চেয়ে সাধারণ জনগণের কতটা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছেন কেউ, তার ওপরই নির্ভর করে সেলিব্রেটি তকমা পাওয়া। অন্যরকম করে বললে আগের রাজপরিবারের সদস্য, যুদ্ধজয়ী সেনাপতি বা সেনা অথবা সামাজিক সাধু সন্ন্যাসীরা যে ধরনের সামাজিক মনোযোগ পেত, তারই আধুনিক সংস্করণ হলো সেলিব্রেটি কালচার। তবে দেশ-কাল-পাত্র ভেদে কিছু পার্থক্য আছে। পশ্চিমা সভ্যতায় মুভি স্টার, মিডিয়া স্টার, স্পোর্টস প্লেয়ার কিংবা মিউজিক স্টার, এদের সেলিব্রেটি ধরা হয়। আবার আগের সভ্যতা-সংস্কৃতিতে দেখা যায়- রাজনৈতিক নেতা, ধর্মীয় গুরু, সরকারি ক্ষমতার উচ্চ আসনের লোকেরাও মিডিয়ার পারসোনালিটিদের মতো সেলিব্রেটি তকমা পায়। মানুষের স্বভাব হলো যেখানে যত সহজে মনোযোগ দেয়, পছন্দ করে, সেখানে ততটাই বিপরীত অপছন্দ কিংবা মুখ ফিরিয়ে নেয়া কাজ করে। লাইকের আড়ালে ডিজলাইকের একটি বৃত্তও তৈরি হতে থাকে। এ ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশের মজার অনুভূতি কাজ করে। সেটি হলো- সেলিব্রেটিদের একদিকে গসিপের জন্য বিনোদনমূলক এবং মুখরোচক যেমন ভাবে, তেমনি নৈতিকভাবে তাদের নৈতিকতার মানদণ্ডকে বেশ নিচু ভাবে।
সমাজে সফল বিফলের মাপকাঠি মাপতে লোকে মোরাল স্ট্যান্ডার্ডটিকে মনে মনে উঁচু আসনে বসায়। একসাথে সেলিব্রেটিদের ভালো কাজগুলো প্রশংসা এবং মনোযোগ যেমন পায়, তেমনি তাদের মন্দ কাজের প্রচারটাও সহজে প্রচার পায়। সেলিব্রেটি একটি আইডেন্টিটি। একটু বললে ফলস আইডেন্টিটি। পরিচয়ের খোলস মাত্র, কখনোই আসল ব্যক্তিত্ব নয়। সেলিব্রেটি একটি পণ্য। মিডিয়া তার মাধ্যম, পাবলিক হলো ভোক্তা, আকর্ষণ তার ফুয়েল। মিডিয়া সেলিব্রেটি তৈরি করে, মানুষ সেই তৈরি খোলসের পেছনে ছুটে অথবা ছুটতে প্ররোচিত হয়।
ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবের মতো সোস্যাল মিডিয়া এখন সেলিব্রেটিদের স্বর্গ, ভোক্তা ধরার বাজার। খেলোয়াড়, মিডিয়া তারকা, রাজনৈতিক কিংবা অর্থবানরা সেলিব্রেটির আড়ালে নিজেদের ব্র্যান্ড প্রচার এবং বিপণনে এখন সোস্যাল মিডিয়া টুলস সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে। কিন্তু মানুষ কেন সেলিব্রেটিদের পেছনে ঘুরে, সেলিব্রেটিদের খবরগুলোকে কতটুকু বিশ্বাস করে, সেলিব্রেটিদের কী চোখে দেখে, সোস্যাল মিডিয়ায় তাদের সত্যিকার প্রভাব কতটুকু, কিংবা কেন তাদের খবরগুলো ভাইরাল হয়, এ নিয়ে YouGov নামের ব্রিটিশ একটি পাবলিক ওপেনিয়ন ডাটা কোম্পানি সম্প্রতি একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে পার্লামেন্টের সোস্যাল মিডিয়া রিলেটেড এক সেমিনারে।
ণড়ঁএড়া ২০০০ সাল থেকে অনলাইন জরিপের মাধ্যমে পাবলিক ইস্যুগুলো নিয়ে কাজ করে। পাবলিক ওপেনিয়ন পোল এবং সার্ভে নিয়ে কাজ করা বিশ্বের সেরা Ipsos, ICM, Morris, Gallup-এর পাশে YouGov অন্যতম। পশ্চিমে তাদের সার্ভেগুলো নির্বাচন, জনমত এবং পলিসি মেকিং এ যথেষ্ট প্রভাব ফেলে। জরিপে তারা দেখেছে, ব্যবহারকারী সাধারণ মানুষ সোস্যাল মিডিয়ায় সবচেয়ে বেশি Dishonest ভাবে সেলিব্রেটিদের। প্রায় ৩৩ শতাংশ লোক ভাবেন সেলিব্রেটিরা তাদের নিউজ-ফিডে যা কিছু লিখে, নিজেদের প্রচার করতে যা ছবি দেখায়, তার বেশির ভাগই তাদের রিয়েলিটি না। সেলিব্রেটিরা নিজেদের প্রোপাগান্ডা বাড়াতেই মিথ্যা বলে সবচেয়ে বেশি। মাত্র ১২ শতাংশ ভাবে সেলিব্রেটিরা যা বলে, দাবি করে, কিংবা দেখায়, তা সত্যিকার বিশ্বাসযোগ্য। মজার হলো- সেলিব্রেটিদের চেয়ে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য ভাবে নিজেদের পরিবারের লোকদের, এটি প্রায় ৬৬ শতাংশ। তিন ভাগের একভাগ লোক সেলিব্রেটিদের তুলে ধরা গ্লামারাইজড জীবনকে তাদের আসল জীবন ভাবে না। তাদের লেখা, কথা, আচরণ, খবরকে মিথ্যার রঙঢঙ ভাবলেও কেন তারা তাদের ফলোয়ার হয়, খবরগুলো উৎসুক হয়ে পড়ে, এক কলসি থেকে আরেক কলসিতে একই নর্দমার জল ঢালার মতো শেয়ার করে- ভাইরাল করে, তার উত্তর জানতে গিয়ে দেখল যে, প্রায় ১০ শতাংশ লোক তাদের ফলো করে একটি প্রধান কারণে- escapism। মানুষগুলো নিজের কাছ থেকে নিজেই পালাতে আশ্রয় নেয় আরেকটি মিথ্যার খোলসে। মিথ্যাকে মিথ্যা জেনেও তারা বাস্তবের কষাঘাত থেকে পালাতে তথাকথিত পপুলার মানুষগুলোর পেছনে ছুটে।
অন্য জরিপে দেখা গেছে, অনলাইনে সবচেয়ে বেশি মিথ্যা বলে ধনী এবং জনপ্রিয় সেলিব্রেটিরা। কারণ তারা নিজেদের যে ব্র্যান্ড তৈরি করে, তা অফলাইনের মতো নয় বলে তাকে প্রতিনিয়ত এডিট করে প্রচার করতে হয় ব্র্যান্ড ধরে রাখতে। মধ্যম সারির সেলিব্রেটিরা প্রথম সারির সেলিব্রেটি হতে পয়সা খরচ করে ফেক ফলোয়ার কিনে। মজার কিছু পর্যবেক্ষণ এবং টুইস্ট আছে জরিপে। যেমন- পাবলিকভাবে যে, অনলাইনে সেলিব্রেটিরা সবচেয়ে বেশি মিথ্যা বলে, আর ভাবে যে অনলাইনে সবচেয়ে কম মিথ্যা বলে পরিবারের লোকেরা। কিন্তু কম সত্য আশা করে সবচেয়ে বেশি পরিবারের লোকদের কাছে, যা ৩৪ শতাংশ। ২৮ শতাংশ লোক চেনা বন্ধুদের কাছ থেকে আশা করে সত্য। মাত্র ২২ শতাংশের কম সত্য আশা করে সেলিব্রেটিদের কাছে। মজার টুইস্টটির কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখল- পরিবারের লোকেরা যেহেতু সবচেয়ে কাছের, সবসময় দেখছে, বাস্তবে তাদের সবচেয়ে বেশি সত্য বলতে হয় পরস্পরকে বা বলে, তখন পরিবার বা বন্ধুদের কাছে কম স্বচ্ছতার আশা করে কিংবা তারা সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে কিছু একটা বললেও তা ক্ষমার চোখে দেখে। কিন্তু সেলিব্রেটিদের কাছে একদিকে স্বচ্ছতা আশা করে বেশি, আবার বুঝে যে তারা মোটা দাগে অস্বচ্ছ, তাই ভাবে যে, সেলিব্রেটিরা অস্বচ্ছ হলেও তেমন কোনো আপত্তি নেই তাদের, ক্ষমাও করে না, আবার অসত্য আপত্তিও করে না। গা ছেড়ে গা বাঁচিয়ে চলা। তখন গল্পকে গল্প ভেবেই আরো গল্পের মোহে ফলোয়ার হয়, কিছু বিনোদন কুড়ায়, খবরগুলোতে মাথা খুঁড়ে। মূল কথা হলো- প্রতিনিয়ত নিজেরা বাস্তবের সাক্ষী হয়ে মিডিয়ার পপুলার সেলিব্রেটিগুলোর অবাস্তব অতিরঞ্জনকে অনুসরণ করলেও মনে মনে ঠিকই তাদের অসত্য ভাবে।