পাকিস্তানের নির্বাচনের দিকে যাদের নজর ছিল, সবাই মনে করত, ইমরান খানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) ভালো করবে। এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দলটি পাবে না, তবে বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। অবশ্য তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারেনি। পর্দার আড়ালের খেলায় ইমরান হয়তো পিছিয়ে পড়বেন। কিন্তু না, সব জল্পনা-কল্পনা মিথ্যা প্রমাণ করে ইমরান খানের দল এককভাবে সরকার গঠন করতে না পারলেও এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করেছেন যে, তাকে বাদ দিয়ে অন্য কেউ প্রধানমন্ত্রী পদে দাবিদারই নেই। নওয়াজ শরিফের দল পাকিস্তান মুসলিম লিগ (পিএমএল-এন) বেশ খারাপ করেছে। তিনি কারাগারে থাকলে সহানুভূতিসূচক ভোট পাবে দল, এমন আশাও অমূলক প্রমাণিত হয়েছে। এমনকি খোদ পাঞ্জাবেও দলটি সরকার গঠন করতে পারবে কি না তা নিয়ে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। আবার নির্বাচনের আগের হবু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যাদের কল্পনা করা হয়েছিল, তাদের অন্যতম ছিলেন চৌধুরী নিসার। তিনি নির্বাচনে হেরেই গেছেন। অন্য দিকে, ভুট্টোদের পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) হয়েছে তৃতীয়। পিএমএল (এন) ও পিপিপি মিলেও সরকার গঠন করার মতো অবস্থায় নেই।

নির্বাচনের পর পিএমএল (এন) ও পিপিপি জোট গঠন করে পর্দার অন্তরালে চলা খেলা ভুণ্ডুল করে দিতে পারে বলে শঙ্কার মধ্যেই ইমরানের দল এত বেশি আসন পেয়েছে।

এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে ইমরান খানের বিপুল চ্যালেঞ্জ আর অপার সম্ভাবনা। তিনি কী করবেন? প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম কাজ কী হবে? নির্বাচনের আগে থেকেই প্রচার চলছিল, তিনি সেনাবাহিনীর পছন্দের লোক। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী নওয়াজ শরিফ ও তার দলকে যেভাবে কোণঠাসা করা হচ্ছিল, তাতে ভিন্ন কোনো ধারণা বিবেচনা করার অবকাশও ছিল না। এখন ক্ষমতায় বসে ইমরান খানকে তার বৈধতা প্রমাণ করতে হবে। তিনি যে দেশটির শক্তিশালী সেনাবাহিনীর পুতুল নন, সেটাই তাকে সব কিছুর আগে দেখাতে হবে। আবার তিনি যদি তা করতে চান, তবে তা হবে বাঘের পিঠে সওয়ার হওয়ার সামিল। তার বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ হলো তিনি নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধে টানা পাঁচ বছর ধরে বিদ্বেষপ্রসূত লড়াই করে দেশটির গণতান্ত্রিক কাঠামোকেই দুর্বল করে দিয়েছেন। অথচ ২০১৩ সালের যে নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন নওয়াজ, সেটিকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মোটামুটিভাবে অবাধ ও নিরপেক্ষ বলেই রায় দিয়েছিল। গণতান্ত্রিকব্যবস্থা অক্ষুণœ রাখতে হলে ইমরান খানকে এখন তার তছনছ করা কাঠামোকে গড়ে তুলতে হবে।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ইমরান খানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সম্ভবত পারিবারিক রাজনীতির অবসান ঘটানো। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি তার সমর্থকদের বলে আসছিলেন, পারিবারিক রাজনীতির ওপর মারণ আঘাত হেনে তিনি চাকরি সৃষ্টি ও সেবার মান বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি পূরণ করবেন। ১৯৮৮ সালে বর্তমান ধাপের গণতান্ত্রিকপ্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে পিএমএল-এন ও পিপিপি পালাবদল করে ক্ষমতায় রয়েছে। একদিকে রয়েছেন নওয়াজ শরিফ পরিবার, অন্য দিকে ভুট্টো পরিবার। ইমরানের দাবি, এসব দলের দুর্নীতিবাজ নেতারা জনসাধারণের সম্পদ চুরি করছেন। ফলে দেশ গরিবই থাকছে। তিনি দুর্নীতি ও পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে যত সোচ্চার হয়েছেন, তার বিন্দুমাত্র ধর্মীয় উগ্রবাদের প্রতি হননি। তার কাছে এটি বড় ধরনের সমস্যা মনে হয়নি।

ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিবিদ

একসময়ে পাশ্চাত্যেই তাকে বেশি দেখা যেত। অক্সফোর্ড-শিক্ষিত প্লেবয় হিসেবেই যার খ্যাতি ছিল, লন্ডনের নাইটক্লাবগুলোতে যার বিচরণ ছিল অবাধ। সচ্ছল পরিবারের সন্তান হিসেবে অনেক কিছুরই পরোয়া তার না করলেও চলত। তবে তাকে সবচেয়ে বড় খ্যাতি এনে দিয়েছিল ক্রিকেট। সর্বকালের সেরা অধিনায়কদের একজন হিসেবে তিনি পরিচিত।
তিনি ১৯৯০-এর দশকে রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন ওই ১৯৯২ সালের বিশ^কাপ জয়ের মূলধনকে পুঁজি করেই। আর ক্ষমতার সত্যিকারের দাবিদার হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে তাকে আরো দুটি দশক অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
২০১৩ সালে তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই, পাকিস্তান জাস্টিজ মুভমেন্ট) পার্টি খোলস ছেড়ে বের হয়ে পাকিস্তানের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল মুসলিম লিগ (এন) সরকার গঠন করে, সাবেক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) হয়েছিল দ্বিতীয়।
এর পাঁচ বছর পর ইমরান খান ও তার অনুসারীদের স্বপ্ন সত্যি হলো। নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার সময় তিনি সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিলেন পরিবর্তনের ওপর। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিচর্যায় উন্নতি ঘটাবেন, তরুণদের জন্য আরো চাকরির ব্যবস্থা করবেন। পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৬৪ ভাগই তরুণ। তারাই ছিল ইমরানের ভরসা। সেখান থেকেই তিনি আসল সমর্থন পেয়েছেন।

অন্য দিকে, অনেকে মনে করেন- মধ্যম মেয়াদে তিনি হয়তো সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের সাথে জোট গঠন করবেন। দুই পূর্বসূরির কাছ থেকে শিক্ষা নিয়েই তিনি তা করতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে।

বর্ষীয়ান রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ক্ষমতা গ্রহণ করার পর তার সামনে অনেক বড় চিত্র ভেসে ওঠবে। তিনি দেখতে পারবেন যে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মান উন্নয়ন, চাকরির সুযোগ সৃষ্টি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি- সবই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্র। পূর্বসূরিদের মতো তিনিও বুঝতে পারবেন, তাকে এই অঞ্চলের, বিশেষ করে ভারতের সাথে সঙ্ঘাত ও উত্তেজনা হ্রাস করতে হবে। আবার এসবের জন্য পাকিস্তানের নিরাপত্তা এস্টাবলিশমেন্টকেই অনেকাংশে দায়ী করা হয়। এই অবস্থা থেকে দেশকে বের করে নিতে হবে। ওয়াশিংটনের সাথে ইসলামাবাদের যে টানাপড়েনের সৃষ্টি হয়েছে, তার অবসান ঘটাতে হবে। চীনের সাথেও সম্পর্ক অব্যাহত রাখতে হবে। ভারতের সাথে সমস্যাগুলো মেটাতে হবে। অনেক কাজ তার সামনে। আবার দেশের ভেতরেও তার সমস্যা কম নয়। ইতোমধ্যেই পিএমএল (এন) ও পিপিপি ঘোষণা করেছে, তারা ঐক্যবদ্ধভাবে পিটিআইকে মোকাবেলা করবে। দুর্নীতি দমনের যে অভিযান চলছে, তার টার্গেট এই দুটি দলই। ফলে পিঠ বাঁচানোর জন্য হলেও দুই দলকে একই সমতলে আসতে হবে। ইমরান কি আপস করবেন?

তিনি আপস করলে পাকিস্তান আরেকটি স্বপ্নভঙ্গের মধ্যে পড়বে। আর ক্রিকেটে যেভাবে সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে পাকিস্তানকে অবিস্মরণীয় অনেক জয় এনে দিয়েছেন, এবারো যদি অদম্য বাঘের মতো লড়াই করেন, তবে জয় পেয়ে যেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে তিনি আবার পাকিস্তানের অবিসংবাদিত সম্রাটে পরিণত হবেন। কেউ তাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।


ব্যক্তিগত জীবন

পুরো নাম : ইমরান আহমদ খান নিয়াজি
জন্ম : ৫ অক্টোবর, ১৯৫২ (তবে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড ভুল করে তার পাসপোর্টে লিখেছিল ২৫ নভেম্বর) লাহোর, পাঞ্জাব
জাতি : পশতু
বংশ : বাবার নিয়াজি, মায়ের বার্কি
বাবা : ইকরামুল্লাহ খান নিয়াজি, পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার
মা : শওকত খানুম (তিনি মা-বাবার একমাত্র ছেলে)
পিরালি ধারা : তার পূর্বপুরুষরা ছিলেন পীর। দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে তাদের বেশ প্রভাব রয়েছে।

পড়াশোনা : অক্সফোর্ড, ব্রিটেন
সমাজহিতৈষী কাজ : মায়ের নামে ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা (শওকত খানুম মেমোরিয়াল হাসপাতাল ও রিসার্চ সেন্টার); নামাল কলেজ।
স্ত্রী : জেমিমা গোল্ডস্মিথ (বিবাহ ১৯৯৫, বিচ্ছেদ ২০০৪), রেহাম খান (বিবাহ ২০১৪, বিচ্ছেদ ২০১৫), বুশরা মনেকা (বিবাহ ২০১৮)।
সন্তান : ৩ (জেমিমার মাধ্যমে দুই সন্তান; তবে প্রাক-বৈবাহিক সূত্রের সিতা হোয়াইট তার এক কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছেন)।
বাসা : বনি গালা, ইসলামাবাদ

নিট সম্পদ : ৩৮ মিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি (৩৬০,০০০ ডলার)
রাজনৈতিক জীবন
দল গঠন : তেহরিক-ই-ইনসাফ (পাকিস্তান মুভমেন্ট ফর জাস্টিজ) ১৯৯৬ সাল
রাজনৈতিক দলের বৈশিষ্ট্য : মধ্যপন্থী

 

ক্রিকেট ক্যারিয়ার

দল : পাকিস্তান, লাহোর ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন, লাহোর সিটি ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন, চেস্টারশায়ার, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি, দাউদ ক্লাব, পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স, সাসেক্স, নিউ সাউথ ওয়েলস।
ব্যাটিং স্টাইল : ডান হাতে ব্যাট
বোলিং স্টাইল : ডান হাতে বোলিং

টেস্ট ডেব্যু : ইংল্যান্ডের বিপক্ষে, ৩-৮ জুন, ১৯৭১, বার্মিংহাম
শেষ টেস্ট : শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে, ২-৭ জানুয়ারি, ১৯৯২, ফয়সালাবাদ।
ওয়ান ডে অভিষেক : ইংল্যান্ডের বিপক্ষে, প্রুডেন্সিয়াল ট্রফি, নটিংহ্যাম,
৩১ আগস্ট, ১৯৭৪
শেষ ওডিআই : ইংল্যান্ডের বিপক্ষে, বিশ্বকাপ, মেলবোর্ন, ২৫ মার্চ, ১৯৯২

টেস্ট ক্যারিয়ার :
ম্যাচ ৮৮, ইনিংস ১২৬, অপ. ২৫, রান ৩৮০৭, সর্বোচ্চ ১৩৬, গড় ৩৭.৬৯, সেঞ্চুরি ৬, হাফ সেঞ্চুরি ১৮, ক্যাচ ২৮; উইকেট ৩৬২, ইনিংসে সেরা ৮/৫৮, ম্যাচে সেরা ১৪/১১৬, গড় ২২.৮১, ইকোনমি ২.৫৪, ইনিংসে ৫ উইকেট ২৩ বার, ম্যাচে ১০ উইকেট ৬ বার।
ওডিআই ক্যারিয়ার :
ম্যাচ ১৭৫, ইনিংস ১৫১, অপ. ৪০, রান ৩৭০৯, সর্বোচ্চ ১০২ (অপ.), গড় ৩৩.৪১, সেঞ্চুরি ১, হাফ সেঞ্চুরি ১৯, ক্যাচ ৩৬; উইকেট ১৮২, সেরা ৬/১৪, গড় ২৬.৬১, ইকোনমি ৩.৮৯, চার উইকেট ৩ বার, ৫ উইকেট ১ বার।
অধিনায়কত্ব :
টেস্ট : ৪৮, জয় ১৪, পরাজয় ৮, ড্র ২৮।
ওডিআই : ম্যাচ ১৩৯, জয় ৭৫, পরাজয় ৫৯, টাই ১, পরিত্যক্ত ৪।